কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রবাদ পুরুষ রনো

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) উপদেষ্টা হায়দার আকবর খান রনো মারা গেছেন। শুক্রবার (১০ মে) দিবাগত রাত ২টা ৫ মিনিটে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

হায়দার আকবর খান রনো বাংলাদেশের বিশিষ্ট বামপন্থী নেতা এবং কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রবাদ পুরুষ। তিনি একাধারে তাত্ত্বিক, বুদ্ধিজীবী এবং বহু গ্রন্থের লেখক। তিনি বাংলা একাডেমির কাছ থেকে ২০২২ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।

হায়দার আকবর খান রনো ১৯৪২ সালের ৩১ আগস্ট ব্রিটিশ ভারতের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। রনোর পৈতৃক নিবাস নড়াইলের বরাশুলা গ্রামে। তার মা কানিজ ফাতেমা মোহসীনা বেগম রোকেয়া প্রতিষ্ঠিত সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার বাবা হাতেম আলী খান ছিলেন সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী। তার ছোট ভাই প্রয়াত হায়দার আনোয়ার খান জুনো ছিলেন বামপন্থী রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযোদ্ধা এবং বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি। তিনি আরও ছিলেন গণসংস্কৃতি ফ্রন্টের সভাপতি এবং বাংলাদেশ-কিউবা মৈত্রি সমিতির সভাপতি। প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ সৈয়দ নওশের আলী তার নানা।

রনো যশোর জিলা স্কুল, রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল ও সেন্টগ্রেগরী স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। ১৯৫৮ সালে সেন্টগ্রেগরি স্কুল হতে ম্যট্রিক এবং ১৯৬০ সালে নটরডেম কলেজ হতে আইএসসি পাশ করেন। ১৯৬০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু কারাবাস ও অন্যান্য কারণে এই বিষয়ে পাঠ সম্পন্ন করতে পারেননি। পরে কারাগারে অবস্থানকালে আইনশাস্ত্রে ব্যাচেলর ডিগ্রী লাভ করেন। হাইকোর্টের সনদও লাভ করেছিলেন। কিন্তু পরে ওকালতি পেশা গ্রহণ করেননি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র থাকা কালীন তিনি গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সংশ্লিষ্ট হন। ১৯৬২ সালের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে তার সক্রিয় রাজনীতি শুরু। তিনি ১৯৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। ১৯৭০ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের রণাঙ্গনের সৈনিক এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও নেতা। ১৯৭২ সালে তিনি অন্যান্য রাজননৈতিক সহকর্মীদের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (লেনিনবাদী) গঠন করেন। ১৯৭৯ সালে দলের নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি নামকরণ করা হয়। ১৯৭৯-৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি ১৯৮২-১৯৯০ এর সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন ও ১৯৯০ এর গণ অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক ও নেতা ছিলেন। রাজনৈতিক কারণে তাকে চারবার কারারুদ্ধ হতে হয়েছিল এবং সাতবার আত্মগোপনে যেতে হয়েছিল।

২০০৬ সালে রনো ১৪১১ বঙ্গাব্দের প্রথম আলো বর্ষসেরা বই পুরস্কার পান। তিনি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। ২০১২ সালে তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য হন।

রাজনীতিকের পরিচয়ের বাইরে তিনি তাত্ত্বিক ও লেখক। তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১৩। তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে- শতাব্দী পেরিয়ে (২০০৫ সালে বর্ষসেরা বই হিসেবে প্রথম আলোর পুরস্কার লাভ করে), ফরাসী বিপ্লব থেকে অক্টোবর বিপ্লব, পুঁজিবাদের মৃত্যুঘণ্টা, সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের সত্তর বছর, মার্কসবাদের প্রথম পাঠ, মার্কসীয় অর্থনীতি, গ্রাম-শহরের গরীব মানুষ জোট বাঁধো, মার্কসবাদ ও সশস্ত্র সংগ্রাম, কোয়ান্টাম জগৎ- কিছু বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক প্রশ্ন (বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত), রবীন্দ্রনাথ শ্রেণী দৃষ্টিকোণ থেকে, মানুষের কবি রবীন্দ্রনাথ (বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত), বাংলা সাহিত্যে প্রগতির ধারা (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড), পলাশী থেকে মুক্তিযুদ্ধ (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড), স্তালিন প্রসঙ্গে (পুস্তিকা), অক্টোবর বিপ্লবের তাৎপর্য ও বর্তমান প্রেক্ষাপট (পুস্তিকা)। এ ছাড়া তিনি কয়েকটি বই সম্পাদনা করেছেন। তার মধ্যে অন্যতম মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থীরা, নারী ও নারীমুক্তি।