দেশের অধিকাংশ সরকারি নার্সদের পদোন্নতি হয় না। চাকরিবিধিতে পদোন্নতির জন্য গ্রেড ও পদ নির্ধারণ করা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। একজন নার্স যে পদে চাকরিতে ঢুকছেন, সেই পদেই অবসরে যাচ্ছেন। মাঝখানে এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে বদলি করা হয়। কিন্তু পদ ও বেতন বাড়ে না। অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে বেতন পান মূল পদ সিনিয়র স্টাফ নার্সের। সবাই একই গ্রেডের হওয়ায় থাকছে না চেইন অব কমান্ড। দেখা দিচ্ছে বিশৃঙ্খলা।
নার্সিং কলেজ ও ইনস্টিটিউট চলছে সিনিয়র স্টাফ নার্স দিয়ে। অধ্যক্ষ ও অধ্যাপক থেকে প্রভাষক পর্যন্ত সংযুক্তি হিসেবে মূল বেতনে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন সিনিয়র স্টাফ নার্সরা। গত বছর প্রভাষক পদে কিছু নার্সকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এখন সিনিয়র স্টাফ নার্সের পাশাপাশি এসব কলেজ ও ইনস্টিটিউট চলছে প্রভাষক দিয়ে।
৯০ শতাংশ নার্সের আবাসন ব্যবস্থা নেই। এখনো চালু হয়নি ঝুঁকি ভাতা। ২৫ বছর আগের ইউনিফর্ম ভাতা এখনো রয়ে গেছে। ধোলাই ভাতা হিসেবে মাসে পাচ্ছেন মাত্র ২১৯ টাকা।
এমনকি নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরে মহাপরিচালক ও পরিচালকসহ পদের ৯১ শতাংশ পদেই নিয়োগ পাচ্ছেন প্রশাসন ক্যাডারসহ নার্সিং পেশার বাইরের লোকজন। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান নার্সিং কাউন্সিলও দখলে প্রশাসন ক্যাডারের। নার্সদের পেশাগত দিক দেখভালের পরিবর্তে তারা পেশাগত সনদ দিচ্ছেন। নিবন্ধন দিচ্ছেন বেসরকারি নার্সিং কলেজ ও ইনস্টিটিউটের। এসব অনুমোদনে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল, নার্সদের সংগঠন ও বিভিন্ন পর্যায়ের নার্সদের সঙ্গে কথা বলে দেশের নার্সিং খাতের এই চিত্র পাওয়া গেছে।
এমন প্রেক্ষাপটেই আজ রবিবার পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নার্স দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা আয়োজন রয়েছে। এবার দিবসের প্রতিপাদ্য : ‘আমাদের নার্স। আমাদের ভবিষ্যৎ। সেবাই অর্থনৈতিক শক্তি’।
দেশের নার্সিং খাতের পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক মনে করছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্বাস্থ্যসেবা একটি টিমওয়ার্ক। সেখানে নার্সের গুরুত্ব অপরিসীম। কোনো পেশায় পদোন্নতি না থাকলে হতাশা তৈরি হয়। নার্সরা পদোন্নতিপ্রাপ্ত পদগুলোতে যেতে পারলে পেশাগত উন্নয়ন হবে। তিনি বলেন, প্রয়োজনে সার্ভিস রুল পরিবর্তন করতে হবে।
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, নার্সিং অধিদপ্তরের মতো পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, হেলথ ইকোনমিক ইউনিট, সিএমএসডি ও কমিউনিটি ক্লিনিক ট্রাস্টেও প্রশাসনিক ক্যাডার। এসব প্রশাসন ক্যাডারদের বিভাগ বুঝতে বুঝতেই সময় চলে যায়, অবদান রাখতে পারেন না।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি খান মো. গোলাম মোর্শেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সরকারি নার্সদের ৯০ শতাংশেরই পদোন্নতি হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরও পদবিন্যাস হয়নি, যা খুবই দুঃখজনক। একজন নার্স দ্বিতীয় শ্রেণির পদমর্যদায় দশম গ্রেডে সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে সরকারি চাকরিতে ঢুকছেন। অবসরও নিচ্ছেন সেই একই গ্রেড ও পদে। পদোন্নতি না হওয়ায় তাদের বেতনও বাড়ছে না।
এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ও নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) নাসির উদ্দিন (উপসচিব) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিছু কিছু সমস্যা তো আছেই। সেটা সমাধানের জন্য চেষ্টা করছি।’
পদ আছে, পদোন্নতি নেই : নার্সেস অ্যাসোসিয়েশন নেতাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নার্সদের সাত ধরনের পদ। এর মধ্যে হাসপাতালে চারটি পদে পদোন্নতি আছে। সেগুলো হলো একজন করে নবম গ্রেডে ডেপুটি নার্সিং সুপারিনটেনডেন্ট ও নার্সিং সুপারিনটেনডেন্ট, সাত বিভাগে সাতজন বিভাগীয় সহকারী পরিচালক ও জেলায় একজন করে জেলা পাবলিক হেলথ নার্স। নার্সিং সুপারভাইজার পদে কাজ করছেন নিজ বেতনে সিনিয়র স্টাফ নার্স। বাকি দুটি পদ হলো সিনিয়র স্টাফ নার্স ও মিডওয়াইফ। অর্থাৎ হাসপাতালে ১০ জন নার্স পদোন্নতি পাচ্ছেন। বাকি ৯০ শতাংশের কোনো পদোন্নতি নেই।
অধিদপ্তরের জনবল তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হাসপাতালে পদোন্নতির জন্য ৫টি পদে ১৪৫৩ জন জনবল অনুমোদন করা আছে। সেখানে এখন শূন্য রয়েছে ৩২৯ জন। অর্থাৎ ২৩ শতাংশ পদই ফাঁকা।
অন্যদিকে, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের ২২টি পদের মধ্যে শুধু প্রভাষক (নার্সিং) পদে গত বছর নবম গ্রেডে পদোন্নতি দিয়েছে সরকার। যাদের নেওয়া হয়েছে তাদের চাকরির সময়ও শেষপর্যায়ে বলে জানিয়েছেন নার্সরা। তারা জানিয়েছেন, এই প্রভাষকদের মধ্য থেকে কাউকে কাউকে নার্সিং কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব দিয়ে সংযুক্তিতে পাঠানো হচ্ছে। তবে অধিকাংশ কলেজের অধ্যক্ষ সিনিয়র স্টাফ নার্স। যেমন রাজশাহী নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন একজন সিনিয়র স্টাফ নার্স।
নিয়োগবিধি অনুযায়ী, শিক্ষকতার পেশায় জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নার্সরা পদোন্নতি পেয়ে সিনিয়র স্টাফ নার্স থেকে প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক হবেন। কিন্তু সরকারি ৩৬টি নার্সিং কলেজের ৩৬ জন অধ্যক্ষই সিনিয়র স্টাফ নার্স। তারা নিজ পদের বেতনের বিপরীতে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এই পদে কাজ করছেন। এই ৩৬ কলেজে উপ-অধ্যক্ষ পদে একজনও নেই। এসব কলেজে শিক্ষকতার কাজ করানো হচ্ছে সিনিয়র স্টাফ নার্সদের দিয়ে, নার্সিং ইন্সট্রাক্টর নাম দিয়ে।
আবাসিক সুবিধা নেই ৯০% নার্সের : জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত আছেন ৩১ নার্স। তাদের মধ্যে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন ২৩ জন। নার্সদের থাকার জন্য এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুটি কোয়ার্টার আছে। তার মধ্যে একটি পরিত্যক্ত। বাকি একটি কোয়ার্টারে চারটি ফ্ল্যাটে থাকছেন চারজন নার্স। বাকি ১৯ জন নার্স থাকছেন কমপ্লেক্সের বাইরে বাড়ি ভাড়া নিয়ে।
এ ছাড়া জামালপুর জেলা সদর হাসপাতালে নার্স আছেন ১২০ জন। কোয়ার্টারে থাকতে পারছেন মাত্র ১৫ জন। বাকি ১০৫ জনই থাকছেন হাসপাতালের বাইরে বাড়ি ভাড়া নিয়ে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নার্স আছেন ১ হাজার ১৬০ জন। তাদের মধ্যে শুধু ৪০ জন আবাসন পেয়েছেন।
এ ব্যাপারে খান মো. গোলাম মোর্শেদ বলেন, ঢাকার বাইরে যত নার্স আছে, তাদের মাত্র ১০ শতাংশ আবাসিক সুবিধা পান।
অধিদপ্তর ও কাউন্সিল প্রশাসন ক্যাডারের দখলে : অধিদপ্তরের জনবল কাঠামো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর হয় ২০১৬ সালে। এর আগে নার্সিং সেবা পরিদপ্তর ছিল। সেই পরিদপ্তরের ৪৮ বছরের ইতিহাসে প্রথম দুজন পরিচালক পূর্ণাঙ্গ পদে, অর্থাৎ চতুর্থ গ্রেডে নিয়োগ পেয়েছিলেন। এরপর সব পরিচালকই নিয়োগ পেয়েছেন দশম গ্রেডের সিনিয়র স্টাফ নার্স চলতি দায়িত্ব হিসেবে। সেবা পরিদপ্তর নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরে রূপান্তর হলেও এখন পর্যন্ত এই অধিদপ্তরে মহাপরিচালক ও পরিচালক পদে নিয়োগ পাচ্ছেন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা। অতিরিক্ত মহাপরিচালক পদে কখনোই নার্সিংয়ের কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালক পদে সংযুক্তিতে পদায়ন করা হয়েছে সিনিয়র স্টাফ নার্সদের।
এমনকি অর্গানোগ্রামে পদ না থাকলেও পরিচালক (শৃঙ্খলা) ও পরিচালক (অর্থ বাজেট) দুটি পদ তৈরি করে প্রশাসন ক্যাডারের লোকজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের ক্যাডারের এসব লোকজন তাদের কাজের সুবিধার জন্য হাসপাতাল থেকে ৫০ জনের বেশি নার্সকে সংযুক্তিতে নিজ বেতনে এনে রেখেছেন অধিদপ্তরে।
এ ছাড়া নার্সিং কাউন্সিলেও প্রধান পদ রেজিস্ট্রার একজন প্রশাসন ক্যাডারের লোক। বাকি দুটি পদ ডেপুটি রেজিস্ট্রার ও সিনিয়র রেজিস্ট্রার পদে সিনিয়র স্টাফ নার্সদের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে সংযুক্তিতে রাখা হয়েছে।