আজ ১৫ মে, মজলুম ফিলিস্তিনিদের ৭৬তম নাকবা দিবস বা মহাবিপর্যয়ের দিন। ফিলিস্তিনিদের কাছে দিবসটি জন্মভূমি হারানো বেদনার দিন। অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ব্রিটিশদের দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূমিতে এই দিনে শুরু হয় ইসরায়েলি নতুন আগ্রাসন। ইহুদিদের এই আগ্রাসন হঠাৎ করে ছিল না বরং ছিল সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। ১৮৮২ সালে রাশিয়ায় ইহুদিদের জায়ন আন্দোলন এবং ১৮৯৭ সালে ‘জায়নিস্ট’ নামক সংগঠন গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তারা ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনে পাড়ি জমাতে শুরু করে। ১৯৪৮ সালের ১৫ মে ইউরোপ ও রাশিয়া থেকে আসা এসব ইহুদিরা উচ্ছেদ করে ফিলিস্তিনিদের। সেদিনই শরণার্থী হতে হয় সাড়ে সাত লাখ ফিলিস্তিনিকে। মাত্র দেড় লাখ ফিলিস্তিনি থেকে যেতে পেরেছিল নিজভূমে। এ বছর যখন ফিলিস্তিনিরা নাকবা দিবস পালন করতে যাচ্ছে তখন গাজায় গত ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া ইসরায়েলি গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা পার হয়েছে ৩৫ হাজার। তবে ঘটনার শুরু ১৯৪৮ সালের ১৫ মে থেকে। সে থেকে আজ পর্যন্ত ফিলিস্তিনের ওপর হামলা, গণহত্যা, গ্রেপ্তার, টার্গেট কিলিং এবং অনবরত মানবাধিকার লঙ্ঘন করে যাচ্ছে ইসরায়েল। বরং ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা প্রমাণ করেছে ইসরায়েল নামক পেপার টাইগার পশ্চিমাদের পুঁজিবাদি, যুদ্ধবাজ দেশগুলোর প্রক্সি একটি রাষ্ট্র হিসেবে আরব বিশ্বে টিকে আছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, হাজার হাজার ফিলিস্তিনের মৃত্যু ছাড়া ৭ অক্টোবরের অর্জন কী! জবাব হচ্ছে অর্জন অনেক। পশ্চিমাদের মানবতাবাদের মুখোশের আড়ালে গণহত্যা ও শিশুহত্যার আসল চরিত্র আরেকবার বিশ্বের সামনে উন্মোচিত করেছে সাম্প্রতিক ঘটনাটি।
ইসরায়েলের কথিত নিরাপত্তার স্বার্থের কথা বলে পশ্চিমারা গাজায় গণহত্যাকে সমর্থন করছে। চার মাস ধরে নির্বিচার বোমা মেরেও যখন হামাসের প্রতিরোধ দুর্বল করা যাচ্ছে না, তখন ২০ লক্ষাধিক ফিলিস্তিনিকে খাদ্য, পানিসহ সব রকম মানবিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত করতে জাতিসংঘের ত্রাণ তহবিলে ফিলিস্তিনিদের জন্য অর্থ সহায়তা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েল অভিযানে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউর সদস্যদের জড়িত থাকার ভিত্তিহীন অভিযোগে এ সংস্থায় অর্থ সহায়তা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ পশ্চিমা ৯টি দেশ। যে সময়ে ফিলিস্তিনিদের বাঁচাতে আরও বেশি সহায়তা প্রয়োজন সে সময়ে তারা সহায়তা বন্ধের ঘোষণা দিয়ে তাদের আসল চেহারাটা দেখিয়ে দিল। গাজার পুরো জনগোষ্ঠীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার যে বর্বরতা ইসরায়েলিরা দেখাচ্ছে, তার নজির প্রাচীন বা মধ্যযুগেও বিরল। অথচ আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব এই গণহত্যার নিন্দা জানানোর প্রয়োজন পর্যন্ত বোধ করেনি। তাদের অবস্থান বরং দুর্বৃত্ত দেশ ইসরায়েলের পক্ষে। ইসরায়েল যে গণহত্যা চালাচ্ছে তার আর্থিক ও সামরিক সহযোগিতা আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের বুলি শেখাচ্ছে, সে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলে গণহত্যার পৃষ্ঠপোষক। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধকালীন আইন ও মানবাধিকার নিয়ে বেশ সোচ্চার দেখা গেল। ইসরায়েল যখন ২ মিলিয়ন গাজাবাসীর ওপর অবরোধ আরোপ করে চারদিক থেকে সীমান্ত বন্ধ করে দিয়ে হাজার হাজার বোমা ফেলে ‘কালেক্টিভ পানিশমেন্ট’ করছে তা যুদ্ধকালীন আইনের মারাত্মক লঙ্ঘন এবং স্পষ্টত যুদ্ধপরাধ। কিন্তু তা নিয়ে মার্কিনিরা কোনো কথা বলেনি। তবে তাদের আদর্শবাদিতা শুধু নিজের পছন্দের লোকের জন্য এবং সে আদর্শের প্রচার যে রাজনৈতিক তা গাজাবাসী বিশ্বকে দেখিয়ে দিল।
তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড আজ নতুন নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের সমস্ত যুদ্ধ কোরীয় যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ইরাক-ইরান যুদ্ধ, ইরাক-কুয়েত যুদ্ধ, আফগানিস্তান ও ইরাক দখল, সিরিয়া, লিবিয়া ও ইয়েমেন যুদ্ধসহ সব যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হাত রয়েছে। এমনকি যুদ্ধের একটি পক্ষকে ফান্ড করে যুদ্ধকে জিইয়ে রেখে অস্ত্রের রমরমা ব্যবসা করে গেছে দেশটি। এসব যুদ্ধকে জাস্টিফাই করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যেসব আলোচনা তৈরি করেছে, যেসব দলিল প্রকাশ করে পরবর্তী সময় তা ভুয়া বলেই প্রমাণিত হয়েছে। ফলে দিনকে দিন পশ্চিমাদের সামরিক আগ্রাসনকে জাস্টিফাই করার দলিল ও অন্যদিকে মানবাধিকারের বার্তার প্রতি সারা বিশ্বের মানবতাবাদী মানুষের সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। এই সন্দেহ ও অবিশ্বাস থেকে সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকা ও ইউরোপের প্রতিটি শহরে ফিলিস্তিনে গণহত্যা বন্ধ, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার সমর্থনে হাজার হাজার মানুষকে রাজপথে নামতে দেখা যাচ্ছে।
ফলে গাজা শুধু পশ্চিমাদের মুখোশ খুলে দেয়নি, বিশ্ববাসীর চেতনার জাগরণও ঘটিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সারা বিশ্বের পাশাপাশি ফিলিস্তিনে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা এবং ইসরায়েলের দখলদারত্বের অবসান দাবি করে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অভূতপূর্ব ছাত্র বিক্ষোভের জন্ম হয়েছে। ছাত্র আন্দোলনের এই ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে আমেরিকার মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় কলাম্বিয়া, ব্রাউন, ইয়েল, হার্ভার্ড, ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিন, ইউসিএলএ-সহ আরও বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিক্ষার্থীরা দাবি করেছে, যেসব কোম্পানি ইসরায়েলি দখলদারি ও গাজায় চলমান গণহত্যায় ইসরায়েলকে ফান্ড করছে, তাদের কাছ থেকে তহবিল নেওয়া বন্ধ করতে হবে। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটি ‘ছাত্র ইন্তিফাদার’ জন্ম হয়েছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে দমনমূলক অচরণ করেছে পুলিশ ও প্রশাসন। তাদের পুলিশি দমন ও নিপীড়নের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে এমনকি অনেক শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব বাতিল করা হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ফলে ইসরায়েলের ও জায়ানবাদীদের সমালোচনা থামাতে যুক্তরাষ্ট্রের আসল পরিচয় প্রকাশ পায়। সারা বিশ্বে আজ যুক্তরাষ্ট্রে মতো প্রকাশের স্বাধীনতা ও বিক্ষোভের পরিসর প্রশ্নবৃদ্ধ হয়ে পড়েছে।
কিন্তু আশার কথা হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রজন্ম তাদের পূর্বসূরিদের মতো অন্ধভাবে ইসরায়েলকে সমর্থন করছে না। তারা ফিলিস্তিনে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার পক্ষে এবং ইসরায়েলি দখলদারি ও গাজা যুদ্ধের বিপক্ষে। তারা যে চেতনার ফুল ফুটিয়েছে সে চেতনা সংক্রমিত হয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে একদিন। বিশ্বজুড়ে পৃথিবীর সংগ্রামী মানুষের কাফেলা হতে থাকবে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। যে চেতনার বলে একদিন ফিলিস্তিনে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা হবে। জেরুজালেমের আল আকসায় উড়বে স্বাধীন ফিলিস্তিনের পতাকা। সম্প্রতি ভারত, পাকিস্তানের ভাইরাল হওয়া একটি শায়রি দিয়ে শেষ করতে চাই, ‘তু কন নেহি দেগা আজাদি, তেরা বাপবি দেগা আজাদি’। মুকুল হয়ে সে আজাদি ফুটুক ফিলিস্তিনে। এটা হোক এবারের নাকবা দিবসের প্রেরণা।
লেখক : কলামিস্ট ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক
shahadatju44@gmail.com