পশ্চিমবঙ্গের যে প্রকৌশলী ফারাক্কা বাঁধের বিরোধিতা করেছিলেন

আজ ১৬ মে। ১৯৭৫ সালের এই দিনে মওলানা ভাসানির নেতৃত্বে লক্ষ লক্ষ মানুষ ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে ‘লং মার্চ’ শুরু করেছিলেন। সেদিন বাংলাদেশের মানুষ পদ্মার জলের দাবিতে সীমান্তের দিকে এগিয়েছিলে। তার পরে পদ্মা-মেঘনা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে, কিন্তু ভারত বাংলাদেশের অভিন্ন নদীগুলির জলবণ্টন নিয়ে সমস্যা এখনও মেটেনি।

দীপাবলিকে কারও মনে আছে?

বাংলা ভাষার খ্যাতনামা সাহিত্যকার সমরেশ মজুমদারের সাতকাহন উপন্যাসের নায়িকা সেই দীপাবলি, যাকে উত্তরবঙ্গের চা-বাগান থেকে বহুবার সকরিকলি, মনিহারি ঘাট হয়ে স্টিমারে গঙ্গা পেরিয়ে কলকাতা আসতে হতো?

কলকাতা থেকে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলে যেতে গেলে তখন অর্ধেক পথ ট্রেনে, তারপরে স্টিমারে গঙ্গা পেরিয়ে আবারও অন্যদিকে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেন ধরতে হতো।

উপন্যাসকার সমরেশ মজুমদার নিজেই উত্তরবঙ্গের চা-বাগান অঞ্চলের মানুষ, তাই তারও প্রথমবার বাবা-মায়ের সঙ্গে চার বছর বয়সে আর দ্বিতীয়বার বন্ধুদের সঙ্গে ১৬ বছর বয়সে কলকাতায় আসা ওই নর্থ বেঙ্গল এক্সপ্রেস ধরে অর্ধেক পথ এসে তারপরে স্টিমারে গঙ্গা পেরিয়ে আবারও বাকি অর্ধেক পথ ট্রেনে চেপে আসা। সেকথা তিনি বেশ কয়েকটি একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেছেন।

মজুমদার যখন কিশোর বয়সে দ্বিতীয়বার গঙ্গা পেরিয়েছিলেন কলকাতায় আসার জন্য, ততদিনে অবশ্য ফারাক্কা বাঁধের পরিকল্পনা শুরু হয়ে গেছে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সেচ দপ্তরের এক সুপারিন্টেডিং ইঞ্জিনিয়ার কপিল ভট্টাচার্য নিজের উদ্যোগে তৈরি করে ফেলেছেন একটি গ্রাউন্ড রিপোর্ট যে কেন ওই ফারাক্কা বাঁধ ক্ষতিকারক হবে।

তার সেই রিপোর্ট সংকলিত হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের নদ-নদী নিয়ে তার আকর গ্রন্থ বলে স্বীকৃত ‘বাংলাদেশের নদ-নদী ও পরিকল্পনা’-তে।

মালদা জেলার নদী ভাঙনের কারণে যে হাজার হাজার মানুষকে বাস্তুচ্যুত, জীবিকাচ্যুত হতে হয়েছে, তাদের আন্দোলনের নেতা তরিকুল ইসলাম একবার বলেছিলেন, ‘ফারাক্কা বাঁধ চালু হওয়ার পর থেকে আমাদের অঞ্চলে যখন ভাঙন শুরু হল, তখন তো আমরা কপিল ভট্টাচার্য স্যারের নামও জানতাম না, তার ওই বিখ্যাত বইটাও দেখিনি।  কিন্তু বহু বছর পরে যখন তার বই আমাদের হাতে আসে, তখন দেখি যে ফারাক্কায় বাঁধ দিলে কী কী ক্ষতি হতে পারে বলে তিনি যা যা ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন সেই পঞ্চাশের দশকে, প্রায় তিন-চার দশক পরে আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সেসব একদম মিলে গেছে।’

ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে বিরোধিতার কারণে ভট্টাচার্যকে পাকিস্তানের চর বলতেও দ্বিধা করেননি সরকার আর বাংলা সংবাদমাধ্যম। চাপে পড়ে তাকে সরকারি চাকরি ছাড়তে হয়েছিল। তবে তার অ্যাক্টিভিজম থেমে থাকেনি।

যে কারণে ফারাক্কা বাঁধের বিরোধিতা

কপিল ভট্টাচার্য লিখেছিলেন, ‘ফারাক্কা ব্যারেজের আংশিক মূল্য ধরা হচ্ছে ৪০ কোটি টাকা, এত টাকা অপব্যয় করবার কোনোই প্রয়োজন দেখছি না আমরা। তার লেখায় ‘ফরাক্কা’ই লিখেছিলেন ভট্টাচার্য।
এই ডিজাইনে রাজমহলের কাছে গঙ্গার সর্বোচ্চ বন্যা ২৭ লাখ কিউসেক ধরা হয়েছে, এ সংখ্যা অত্যন্ত সন্দেহজনক।

তার সন্দেহ ছিল, ‘ব্যারেজ ডিজাইনে মাত্র ২৭ লক্ষ কিউসেক ধরা হয়েছে, ব্যারেজের এবং দুপাশের বাঁধের জন্য ব্যয় কম দেখাবার জন্য। বাস্তবক্ষেত্রে বন্যার ফলে বাঁধ ধ্বংস হবে। বামকূলের বাঁধ ঘুরে গঙ্গা মনিহারী, কাটিহার, মালদহ প্রভৃতি ধ্বংস করে দিতে পারে।’ প্রকৃতপক্ষে সেটাই হয়েছে। মালদা জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল নদীগর্ভে চলে গেছে, যেটা প্রত্যক্ষ করেছেন তরিকুল ইসলামের মতো স্থানীয় মানুষরা। আবার কলকাতা বন্দরের নাব্যতা বৃদ্ধি হবে বলে যে যুক্তি দেওয়া হতো ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণের পক্ষে, তাও নাকচ করে দিয়েছিলেন কপিল ভট্টাচার্য।

তিনি সেই পঞ্চাশের দশকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, ফারাক্কায় ব্যারেজ বেঁধে ও ভাগীরথীকে গঙ্গার সঙ্গে একটা নতুন খালের সাহায্যে সংযুক্ত করে দিয়েই ভাগীরথীর স্বাভাবিক মজে যাওয়া দীর্ঘকাল ধরে নিবারণ করা যাবে কেন? এ প্রশ্নের কোনও উত্তর নেই। যেসব স্বাভাবিক কারণে ভাগীরথীর উৎস মজে গিয়েছে ও গঙ্গার সঙ্গে তার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে, সেই সব স্বাভাবিক কারণের কোনোও প্রতিকারই ফরাক্কা ব্যারেজ করতে পারবে না। সুতরাং এ পন্থায় ভাগীরথীর নাব্যতা পুনরুজ্জীবিত করে কিছুদিন পর্যন্তও স্থায়ী করা যায় না।

কপিল ভট্টাচার্য তিস্তা প্রভৃতি যে সব নদী উত্তর-পূর্ব হিমালয় থেকে নেমে এসেছে, সে ব্যাপারেও লিখেছিলেন ফারাক্কা ব্যারেজের বিরোধিতা করতে গিয়ে।

তিনি লিখেছেন, ‘ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে অর্থাৎ উত্তর বিহার ও আসামের হিমালয়-নির্গত নদীগুলো অত্যন্ত দুর্দান্ত। কুশী, মহানন্দা, তিস্তা প্রভৃতি নদী কোন বছরের বন্যায় কত জল বহন করে এতে কোন খাত দিয়ে নামবে বলা দুঃসাধ্য। হিমালয়ের এ অংশে কখনও কখনও ২-৪ ঘণ্টার মধ্যে এত অধিক বৃষ্টিপাত হয় যে তা চিন্তারও অতীত। এই সব নদী দিয়ে অকস্মাৎ সেই পানি নেমে এসে প্লাবনের বিপর্যয় ঘটায়।

সুতরাং এইসব নদীগুলো সম্যক পর্যবেক্ষণ করে তাদের নিয়ন্ত্রণ না হওয়া পর্যন্ত ফরাক্কায় গঙ্গা-ব্যারেজ নির্মাণে বিপুল অর্থব্যয় অত্যন্ত অবিমৃশ্যকারিতার পরিচায়ক হবে, এটাই ছিল তার ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে জোরালো যুক্তি।

অতিবৃষ্টির কারণে তিস্তা নদীর লোনক হ্রদ ভেঙ্গে যে হঠাৎ বন্যা এসেছিল ২০২৩ সালের অক্টোবরে, সে ঘটনাও বিশেষজ্ঞদের মনে করিয়ে দিয়েছিল কপিল ভট্টাচার্যের লেখা।

আবার কলকাতা বন্দরের নাব্যতা বৃদ্ধির যে যুক্তি ভট্টাচার্য খণ্ডন করেছিলেন, সেটাও যে সত্য তা প্রমাণিত হতে বেশি দেরি হয়নি। তাই কলকাতা বন্দরে এখনও বড় জাহাজ আসতে পারে না। হলদিয়াতে গড়তে হয়েছিল আরেকটি বন্দর।

সূত্র: বিবিসি বাংলা