দেশের নির্দিষ্ট একটি শ্রেণির মানুষের খাবারের তালিকার শীর্ষে থাকে আলু, পটোল, লাউ, বেগুন, চিচিঙ্গাসহ কম দামি সবজিগুলো। গেল কয়েক বছরে এসব সবজির দাম কয়েকগুণ বেড়েছে। কিন্তু নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর উপার্জনক্ষম ব্যক্তির আয় না বাড়ায় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। তেমনি একজন বেসরকারি চাকরিজীবী সাইফুর রহমান। মাসিক আয় ৩০ হাজার টাকা। জিনিসপত্রের অতিরিক্ত দামের চাপে মাসজুড়েই চিন্তিত থাকতে হয় তাকে।
সাইফুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে একই স্কেলে বেতন পাচ্ছি। কিন্তু খরচের খাতা দিনকে দিন লম্বা হচ্ছে। ওষুধ থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। কোনো কোনো পণ্য তো তিনগুণ দামেও কিনতে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের মতো মধ্যবিত্তরা কম দামের সবজি সব সময় কিনে থাকি। কিন্তু এখন কম দামের সবজিও কিনতে পারছি না। কয়েক বছর আগেও বাজারে প্রতি কেজি আলু কেনা যেত ২০ থেকে ২৫ টাকায়। তা এখন তিন ডাবল দামে বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকায়। প্রতি কেজি পটোল কিনেছি মাত্র ৩০ টাকায়। তা এখন ৬০ টাকার নিচে কেনাই যাচ্ছে না। খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে বাড়তে এমন পরিস্থিতি হয়েছে যে, কম দামের সবজিও এখন আমাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
গত রোজার ঈদের পর থেকেই বাজারে সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম লাগামহীনভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে ডিম, মুরগি ও সবজির মতো খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তি। সব থেকে বেশি বেড়েছে সবজির দাম। বিশ্বে মাছ উৎপাদনে দ্বিতীয়, আলুতে ৭ম ও সবজিতে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু গত এক মাসে সবজির দাম ৪০ শতাংশ ও আলুর দাম ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের বাজারদরের তালিকা অনুযায়ী গত এক মাসে অধিকাংশ সবজির দাম ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। কিছু কিছু সবজির দাম ১০০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। পেঁপে ও বেগুন রেকর্ড দামে বিক্রি হচ্ছে।
গত মাসের শুরুতে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হওয়া বেগুন কেজিতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১১০ টাকায়। কাঁচা মরিচ কেজিতে ৫০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকায়। মসলাজাত পণ্যের মধ্যে কেজিতে ১৫ টাকা বেড়ে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৭৫ টাকা ও আলু ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়। বাজারে অধিকাংশ সবজিই ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কয়েক বছর ধরেই খাদ্যে মূল্যস্ফীতির প্রভাবে ভোগ্যপণ্যের দাম আকাশছোঁয়া। অন্যদিকে ডলারের বিপরীতে ক্রমাগত টাকার অবমূল্যায়নে অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছেই। গত সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে দেশের নতুন মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের বেশি বলে জানায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বুরো (বিবিএস)।
মূল্যস্ফীতির প্রভাব মাছ-মাংসের বাজারে পড়েছে। গত এক মাসে ডিম ও ব্রয়লার-সোনালি মুরগির দাম সব থেকে বেশি বেড়েছে।
সরকারি বিপণন কর্তৃপক্ষ টিসিবির তথ্য অনুযায়ী গত এক মাসে গড়ে ডিম ও মুরগির দাম বেড়েছে ২১ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত। ডিমের ২৯ শতাংশ ও ব্রয়লারের কেজিতে ২১ শতাংশ দাম বেড়েছে।
টিসিবির তথ্য অনুযায়ী গত মাসের শুরুর দিকে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৯০ থেকে ২০০ টাকা বিক্রি হলেও কেজিতে ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেড়ে বর্তমানে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২৩০ থেকে ২৪০ টাকা। সোনালি মুরগি কেজিতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা বেড়ে ৪০০ থেকে ৪১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
লাল ডিমে ২৯ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়ে প্রতি ডজন (লাল) মুরগির ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকায়। সাদা ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকায়।
কেবল ডিম, মুরগির দামই বেশি না। বাজারে সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। মাছের বাজারেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। গত এক মাসের ব্যবধানে অধিকাংশ মাছের কেজিতে দাম অন্তত ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি পাঙাশ মাছ বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। রুই মাছ ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা, তেলাপিয়া ২২০ থেকে ২৪০ টাকা, শিং মাছ ৩৫০ থেকে ৮৫০, কই মাছ ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা, পোয়া ৪০০ থেকে ৬৫০, টেংরা ৮০০, পাবদা ৫০০ ও প্রতি কেজি বাইলা মাছ বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায়।