ইউক্রেনের শহরগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছে রাশিয়ার গ্লাইড বোমা

যুক্তরাষ্ট্র থেকে যথেষ্ট অস্ত্র হাতে পাওয়ার আগেই ইউক্রেনের দুর্বলতার সুযোগের সদ্ব্যবহার করার চেষ্টা করছে রাশিয়া। এখন পর্যন্ত ইউক্রেনের দক্ষিণ ও পূর্ব প্রান্তে সামরিক তৎপরতা চালানোর পর মস্কো এবার নতুন জায়গায় হামলা শুরু করেছে। গত ১০ মে থেকে খারকিভসহ ইউক্রেনের উত্তর–পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত এলাকায় জোরালো হামলা চালাচ্ছে রাশিয়া। যার ফলে দেড় বছরের মধ্যে ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক এলাকা দখল করে নিয়েছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব হামলায় রাশিয়া গ্লাইড বোমা ব্যবহার করছে। সস্তা কিন্তু অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক এই অস্ত্র ইউক্রেনের ক্ষত আরও বাড়িয়ে তুলছে। 

ইউক্রেনে হামলার উদ্দেশে সোভিয়েত যুগের এই অস্ত্রকে গ্লাইডিং বোমায় রূপান্তর করেছে দেশটি। দেড় টনের 'ফ্যাব ওয়ান ফাইভ জিরো জিরো' বোমা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরকে পরিপূর্ণ। বোমাটি ফাইটার জেটের সাহায্যে ৬০-৭০ কিলোমিটার উচ্চতা থেকে নিক্ষেপ করা হয়।

এ বোমা ১৫ মিটার প্রশস্ত গর্ত তৈরি করতে সক্ষম। আকাশ থেকে নিক্ষেপ করা রাশিয়ার এ নতুন বোমা ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষ করে তাদের ফ্রন্টলাইনে বড় ধরনের ক্ষতি করছে।

ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আওতার বাইরে থেকে এ বোমা দেশটিতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। সোভিয়েত আমলের ডাম্ব বোমাগুলোর মধ্যে এটি অনেক শক্তিশালী একটি বোমা। বলা যায়, ক্ষেপণাস্ত্রের সস্তা একটি সংস্করণ।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, এক সপ্তাহের মধ্যে ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চলীয় শহর ভোভচানস্কে ২০০টিরও বেশি গ্লাইড বোমা ফেলা হয়েছে। এছাড়া শুধু মার্চেই এমন ৩ হাজার বোমা ফেলা হয়েছে।

খারকিভের উত্তরের শহর আক্রমণ করতে রাশিয়ার বাহিনী এখন গ্লাইড বোমা ব্যবহার করছে। ইউক্রেন এখন পর্যন্ত তাদের এই অস্ত্রের মোকাবেলা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ভোভচানস্কের পুলিশ প্রধান ওলেক্সি খারকিভস্কি গ্লাইড বোমার প্রভাব কাছাকাছি থেকে দেখেছেন। তিনি খারকিভ অঞ্চলের সামনের দিকের সীমান্ত গ্রামগুলো সরিয়ে নিতে সাহায্য করছেন। কারণ রাশিয়ান বাহিনী এখন এই অঞ্চলটিতে অগ্রসর হচ্ছে।

তিনি বলেন, রাশিয়ার আক্রমণের মাত্রা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। গত ছয় মাসে আমাদের ওপর প্রতি সপ্তাহে ৫ থেকে ১০টি গ্লাইড বোমা দিয়ে আক্রমণ করা হয়েছে। কিন্তু এই মাসে আমরা আগের চেয়ে অনেক বেশি আক্রমণের শিকার হয়েছি। রাশিয়া প্রচুর পরিমাণে গ্লাইড বোমা মজুত করতে সক্ষম কারণ তারা সেগুলো খুব সহজেই তৈরি করতে পারে।

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (রুসি) বিমানশক্তি এবং সামরিক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জাস্টিন ব্রঙ্ক বলেছেন, বিস্ফোরক অংশটি মূলত একটি প্রচলিত ফ্রিফল আয়রন বোমা, যার মধ্যে রাশিয়ার সোভিয়েত আমল থেকে কয়েক হাজার স্টোরেজ রয়েছে। এগুলো পপ-আউট উইংসের সাথে লাগানো থাকে যা বোমাটি ফেলার পরে এটিকে আরও দীর্ঘ দূরত্বে পিছলে গিয়ে ঝাঁকুনি দেয়। এর পর এতে সংযুক্ত স্যাটেলাইট সিস্টেম তুলনামূলকভাবে খুব নির্ভুলতার সাথে একটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে।

তবে রাশিয়ার এই অস্ত্রের ধারণাটি নতুন নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রথম অপারেশনাল গ্লাইড বোমাগুলো জার্মানরা জাহাজবিরোধী অস্ত্র হিসাবে তৈরি করেছিল। জাহাজগুলোকে আক্রমণ করা সাধারণত খুব কঠিন। কোনো গুরুতর ক্ষতি করার জন্য একটি সরাসরি আঘাত বা খুব কাছাকাছি লক্ষ্য থাকা প্রয়োজন। এই কারণে একটি জাহাজের মতো ছোট লক্ষ্যে আঘাত করা কঠিন ছিল। তখন এই অস্ত্রের আবির্ভাব হয়। পরবর্তীতে তারা এগুলো ইরাক এবং আফগানিস্তানসহ অন্যান্য এলাকায় ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে।

এই বছরের শুরুতে রাশিয়ান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গ্লাইড বোমার সর্বশেষ সংস্করণ ১.৫ টন প্রদর্শন করেছে। গ্লাইড বোমা যে ধ্বংসলীলা সৃষ্টি করে তা অসাধারণ। গ্লাইড বোমার জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সংস্করণ হলো এফএবি-১৫০০, যার ওজন ১.৫ টন।

তুলনা হিসেবে একটি রাশিয়ান ১৫২ মিমি শেলে প্রায় ৬.৫ কেজি বিস্ফোরক উপাদান রয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে ছোট গ্লাইড বোমা এফএবি-৫০০ তে ২০০ কেজিরও বেশি বিস্ফোরক থাকে। আর এসব কারণে ইউক্রেনের সবচেয়ে সুরক্ষিত স্থানগুলোতেও রাশিয়া খুব সহজেই আক্রমণে করতে সফল হয়।