ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ এমন কোনো ক্ষমতাশালী ব্যক্তি ছিলেন না যে ইতিহাসের ছাত্র মাত্রই তা মনে রাখতে বাধ্য হবে। অথচ ইতিহাসের এমনই খেলা অস্ট্রিয়ার এই আর্চডিউকের হত্যাকাণ্ড মানুষের ইতিহাস চিরদিনের জন্য বদলে দেয়। ফ্রাঞ্চ ফার্দিনান্দকে হত্যার পর ইউরোপজুড়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা এমন জায়গায় চলে যায় শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। মারা যায় প্রায় দুই কোটি লোক।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বছর পাঁচেক পরে শেষ হয়। কিন্তু এর রেশ রয়ে যায়। আরও বছর বিশেক পর শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এই যুদ্ধে মারা যায় অন্তত কোটি চারেক মানুষ। পৃথিবীর ইতিহাস বদলে যায় পারমাণবিক বোমার ব্যবহার ও হুমকিতে। পরের কয়েক দশক অবশ্য ঠাণ্ডা যুদ্ধ এবং নানারকম চাপান উতোর চললেও সৌভাগ্যক্রমে আরেকটা মহাযুদ্ধ হয়নি। কিন্তু বহুবারই আশঙ্কা জেগেছে।
রবিবার (১৯ মে) ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি এক মমার্ন্তিক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত হন। এ সময় নিহত হন তার সঙ্গে থাকা পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির আব্দোল্লাহিয়ানসহ দেশটির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। ঘটনাটি ঘটল এমন এক সময়ে যখন গাজায় গণহত্যা চালানো ইসরায়েল এবং এর সমর্থনপুষ্ট যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে ইরান। যখন গোটা বিশ্ব ইসরায়লের হানাদারদের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত।
একদিকে পশ্চিমা বলয় অন্যদিকে চীন-রাশিয়া-ইরানের বলয়ে জটিল ও উত্তপ্ত হচ্ছে দুনিয়া। ফলে রাইসির মৃত্যু নিয়ে আরেকটা বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় কিনা তা নিয়ে আশঙ্কা হতেই পারে। তবে সেই সম্ভাবনা আপাতত কিছুটা সরিয়ে রেখে প্রথম যে ভাবনা আসে তা হচ্ছে, সর্বোচ্চ ক্ষমতাসীনরাও আসলে কতোটা জীবনের ঝুঁকিতে থাকে?
বাংলাদেশ এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এ দেশের সবচেয়ে বড় দুই রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই নেতাই আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছেন। স্বাধীনতার পর এক দশকে হয়েছে অনেক ক্যু ও পালটা ক্যু। সামরিক ও বেসামরিক হত্যাকাণ্ডে মারা গেছে শীর্ষ নেতারা। পাশের দেশ ভারত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণত্রন্ত্র হলেও সেখানে শীর্ষ নেতাদের হত্যাকাণ্ড কম হয়নি। সে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নায়ক গান্ধী, দুই রাষ্ট্রপ্রধান মা ও ছেলে ইন্দিরা ও রাজীব গান্ধী এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। পাকিস্তানে তো জন্মের পর থেকেই এইসব হত্যাকাণ্ড চলছে। সেখানেও বাপবেটি জুলফিকার আলী ভুট্টো ও বেনজীর ভুট্টো মারা গেছেন অস্বাভাবিকভাবে। শ্রীলংকার হাস্যজ্জল, এদেশে এসে বাংলা বলে তাক লাগানো রানাসিংহে প্রেমাদাসা উড়ে গিয়েছিলেন বোমা হামলায়।
ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময় পৃথিবীর প্রায় কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানই নিরাপদ ছিলেন না। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের জন এফ কেনেডি তার প্রমাণ। যুক্তরাষ্ট্রে অবশ্য এ যাবত চারজন (আব্রাহাম লিংকন, জেমস এ গারফিল্ড, উইলিয়াম ম্যাককিনলে আর জন এফ কেনেডি) হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।
উনিশ শতকের আগে রাজারাজরাদের বিপদ অবশ্য আরো বেশি ছিল। কখনো বাইরের শত্রু, কখনো নিজের রাজ্যের শত্রুপক্ষ, আবার কখনো বা ঘরের লোকেরাই খুন করে বসতেন ক্ষমতার লোভে। বাবাকে, ভাইকে, চাচাতো ভাইকে, বিশ্বস্ত উজির হওয়া সত্ত্বেও অনেকদিন ধরে খেদমত করা রাজাকে হত্যা করা ইতিহাসের একেবারে প্রচলিত গল্প। সকল এলাকা, সকল সংস্কৃতি নির্বিশেষেই। এদের কারো কারো রাজ্যভিষেক সফল হত, কেউ দারুণ সফল শাসক হিসেবে ইতিহাসে টিকে গেছেন আবার কেউ কেউ মীরজাফর বা ঘষেটি বেগমের মতো গালিতে পরিণত হয়েছেন। এমনকি আধুনিক বাংলাদেশেও খন্দকার মুশতাক নামটা গালি হিসেবেই ব্যবহার হয়।
ঠাণ্ডা যুদ্ধের পর এ ধরনের হত্যাকাণ্ড কমে গেছে। যদিও একেবারে থামেনি। আফ্রিকা মহাদেশে আর ল্যাটিন আমেরিকায় সম্পদের লোভে হানাদাররা গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে রেখেছে। অবশ্য প্রযুক্তির উন্নয়নে রাষ্ট্রপ্রধানরা কিছুটা নিরাপদ হয়েছেন। ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়েছেন। কিন্তু এরপরেও রাইসির মতো রাষ্ট্রপ্রধানরা যে ঝুঁকিতে আছেন তা আবার প্রমাণ হলো। এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না যে রাইসির মৃত্যু নেহায়েত দুর্ঘটনা নাকি হত্যাকাণ্ড তবে ঝুঁকির ব্যাপারটা নিশ্চিতই।
কিশোরগঞ্জ এলাকার লোকেরা নির্মম রসিকতার জন্য কুখ্যাত। তেমনি এক মুরুব্বী একদা বলেছিলেন, গরীব মরে আর ধনীরা ইন্তেকাল ফরমান। মুরুব্বির কথা ধার করে বলতে হয়, ক্ষমতাসীনরা যেমন ইন্তেকাল ফরমানোর ঝুঁকিতে থাকেন, তাদের প্রয়াণে তৈরি হয় প্রচুর গরিবের মরে যাওয়ার শঙ্কা। ক্ষমতা অত্যন্ত উত্তপ্ত বিষয়। এর ঝুঁকি মারাত্মক।