এজেন্সির নাম ভাঙিয়ে প্রতারণা, অনিশ্চয়তায় ৭৫ হজযাত্রী

চলতি মৌসুমের হজ ব্যবস্থাপনা শুরু থেকেই নানা-বিতর্কের জন্ম দেয়। হজ গমনেচ্ছুদের নিবন্ধনে সাড়া না মেলা, এজেন্সিগুলোর বাড়ি ভাড়ায় জটিলতা, সময়মতো ভিসা কার্যক্রম শেষ না হওয়ার মতো বিষয়গুলো সামনে আসে। এসব কারণে হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) কর্মকর্তারা দায়ী করে আসছে ধর্ম মন্ত্রণালয়কে। আর ধর্ম মন্ত্রণালয় দাবি করছে, সঠিক নিয়মে হজ কার্যক্রম চলছে। সৌদি সরকারের নিয়ম অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

এসব অভিযোগের মাঝেই আগামী ৯মে থেকে হজের ফ্লাইট শুরু হয়েছে। তিন এয়ারলাইন্সের ৮২ ফ্লাইটে এখন পর্যন্ত সৌদি আরবে পৌঁছেছেন ৩২ হাজার ৭১৯ জন হজযাত্রী। এদিকে অনেকেই যখন হজে যাচ্ছেন তখন এক প্রতারকের ফাঁদে পড়ে ৭৫ হজ গমনেচ্ছুর হজ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কারণ রংপুরের মোহাম্মদ আলী নামের এক ব্যক্তি ‘দিয়া ইন্টারন্যাশনাল’ হজ এজেন্সির নাম ব্যবহার করে ৭৫ হজযাত্রীর প্রাক-নিবন্ধন করেছেন। তাদের কাছ থেকে কয়েক কোটি  টাকা নিলেও হজ কার্যক্রম শেষ করতে পারেনি।

বিষয়টি হজ মন্ত্রণালয় জানতে পেরে গতকাল সোমবার (২০ মে) হজযাত্রীদের সঙ্গে প্রতারণাকারী মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে।

চিঠিতে হজ মন্ত্রণালয় বলেছে, রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার মোহাম্মদ আলী দিয়া ইন্টারন্যাশনাল হজ এজেন্সির নাম ব্যবহার করে ইসলামী ব্যাংক পিএলসি রংপুর শাখায় একটি অ্যাকাউন্ট ( অ্যাকাউন্ট নং: ২০৫০৩৩৩০১০০১৫৫৯১৬) করেন। এই অ্যাকাউন্ট দিয়ে তিনি হজযাত্রীদের প্রাক-নিবন্ধন করিয়ে টাকা নেন। পরে প্রাক-নিবন্ধনকৃত হজযাত্রীদের চট্টগ্রামের আল ইমাম হজ কাফেলা ট্রাভেলস এন্ড ট্যুর এজেন্সির সঙ্গে চুক্তি করেন । চুক্তি অনুযায়ী অভিযুক্ত মোহাম্মদ আলী হজযাত্রীদের টাকা ইমাম হজ কাফেলার অ্যাকাউন্টে জমা করবেন। আর ওই এজেন্সি হজযাত্রীদের সকল কার্যক্রম শেষ করবেন। কিন্তু মোহাম্মদ আলী এখনও আল ইমাম হজ কাফেলা ট্রাভেলস এন্ড ট্যুর এজেন্সির পাওনা ৫৪ লাখ ৪৪ হাজার ২০০ টাকা দেইনি। তাই ওই এজেন্সি মক্কা-মদিনায় বাড়িভাড়া, ভিসা ও বিমান টিকিট সংগ্রহ করতে পারেনি। ফলে অনিশ্চয়তায় পড়েছে নিবন্ধনকৃত ৭৫ হজযাত্রী। 

এছাড়াও অভিযুক্ত মোহাম্মদ আলী ৭৫ হজযাত্রীর মধ্যে ২৫ হজযাত্রীর মক্কা-মদিনায় বাড়ি ভাড়ার দায়িত্ব নেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের বাড়ি ভাড়াও করেনি। পাশাপাশি আতিকুর রহমান ও মোনতাসির ইসলাম নামের দুই হজযাত্রীর কাছে অন্য এজেন্সির নাম ভাঙ্গিয়ে আলাদাভাবে ১৪ লাখ টাকা নিয়েছেন। যা সম্পূর্ণ বেআইনী। তাদের কাছ থেকে টাকা নিলেও হজে যাওয়ার ব্যবস্থা করেনি।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, অভিযুক্ত মোহাম্মদ আলীর নিজের কোন হজ এজেন্সি নেই। তবুও দিয়া ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সির পরিচয় দিয়ে তিনি হজযাত্রীদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। হজের পূর্বে ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা উত্তোলনের নিয়ম না থাকলেও তিনি টাকা তুলেছেন। এভাবে তিনি হজযাত্রীদের সঙ্গে একের পর এক প্রতারণা করেছেন। এজন্য তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সুপার রংপুর, জেলা প্রশাসক রংপুর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করেছেন। 

এদিকে অভিযুক্ত মোহাম্মদ আলীর বিষয়ে এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি এলাকায় বাবু নামে পরিচিত। এই নামেই তিনি প্রতারণা করেন। হজে লোক পাঠানোর পাশাপাশি চাকরি দেওয়ার নামেও তিনি মানুষের কাছ থেকে টাকা নেন। প্রায়শই টাকার জন্য মানুষ তার বাড়িতে যান। স্থানীয়রা জানান, তিনি প্রায় দেড় মাস ধরে এলাকায় নেই। তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত মোহাম্মদ আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। সবাই হজে যেতে পারবেন। তার বিষয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তদন্ত করুক, তাহলেই বোঝা যাবে। আমি অপরাধ করেছি কিনা।’ 

এ বিষয়ে রংপুরের পীরগাছার হারুনুর রশীদ নামের এক ভুক্তভোগী হজযাত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বাবা-মাসহ হজে যাওয়ার জন্য মোহাম্মদ আলীকে ২০১৮ সালে ৯ লাখ টাকা দেই। কিন্তু এর আগে তিনি হজে নিতে পারেনি। এ বছর সবকিছু ঠিকঠাক ছিল কিন্তু এখন শুনছি তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ। এখন হজ যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। তবে আশা করছি হজে যেতে পারবো। 

বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রামের আল ইমাম হজ কাফেলা ট্রাভেলস এন্ড ট্যুর এজেন্সির মালিক মো. মুনির উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মোহাম্মদ আলীর নিজের কোন এজেন্সি নেই। তাই তিনি ৭৫ হজযাত্রীর হজ কার্যক্রমের দায়িত্ব আমাদের দেন। আমরা তার কথা অনুযায়ী কাজ শুরু করি। কিছু কাজও করেছি। কিন্তু তার কাছে ৫৪ লাখ ৪৪ হাজার ২০০ টাকা পেলেও তিনি মাত্র ৩ লাখ টাকা দিয়েছেন। তাই আমরা কাজ করতে পারছি না। ফলে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।’ 

রংপুর জেলা প্রশাসক মোবাশ্বের হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি আমি শুনেছি, তবে এখনও মন্ত্রণালয়ের কোন চিঠি হাতে পাইনি। তারপরও বিষয়টি অবগত হওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছি। তারা খোঁজ খবর নিচ্ছেন। চিঠি হাতে পেলে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

চলতি মৌসুমে হজের নিবন্ধন শুরু হয় গত বছরের ১৫ নভেম্বর, যা ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলে। হজে গমনেচ্ছুদের প্রত্যাশিত সাড়া না মেলায় সর্বশেষ ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়।

এ বছর বাংলাদেশ থেকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৪ হাজার ৫৬২ ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় এজেন্সির মাধ্যমে ৮০ হাজার ৬৯৫ জনসহ ৮৫ হাজার ২৫৭ জন হজ করতে যাবেন। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ১৬ জুন পবিত্র হজ হবে। হজযাত্রীদের প্রথম ফিরতি ফ্লাইট শুরু হবে ২০ জুন এবং শেষ হবে ২২ জুলাই।