বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ রূপকল্পের সঙ্গে সংগতি রেখে এবং তার সার্বিক দিকনির্দেশনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস স্মার্ট হয়ে উঠছে। যার মাধ্যমে বিমানের সব কার্যক্রমে সর্বাধুনিক প্রয্ুিক্ত ও কার্যকরী ব্যবস্থাপনার সমন্বয়, যাত্রী সেবা, ফ্লাইট অপারেশন ও সার্বিক এয়ারলাইনস পরিচালনার গুণগত মান উন্নয়নের মধ্য দিয়ে ‘স্মার্ট এয়ারলাইনস’ করার পরিকল্পনা ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কার্যক্রম চলমান আছে।
স্মার্ট টিকেটিং সিস্টেম : কম্পিউটারাইজড এয়ারলাইনস রিজার্ভেশন সিস্টেম, Sabre PSS বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস একটি প্রযুক্তি ইকোসিস্টেমের মাধ্যমে একজন যাত্রীর টিকিট ক্রয় থেকে শুরু করে যাত্রার সমাপ্তির সব কার্যক্রম যুগোপযোগী ও যাত্রীবান্ধব হয়েছে।
ইন্টিগ্রেটেড পেমেন্ট সিস্টেম : ৩৪টি ব্যাংকিং চ্যানেলের Visa/Master/Amex, ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড, আই-ব্যাংকিং ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সিস্টেম, ইন্টারন্যাশনাল ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ঘরে বসে Website এবং Call Center-এর মাধ্যমে টিকিট ক্রয় করা যায়। এছাড়াও ক্রয়কৃত টিকিটের তারিখ পরিবর্তন ও অতিরিক্ত ব্যাগেজ অ্যালাউন্স ক্রয় করা যায়। এছাড়াও IATA Financial System-এর মাধ্যমে যাত্রীরা বিশ্বের যে কোনো প্রান্ত থেকে ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে টিকিট ক্রয় করতে পারেন। বিমান IATA-এর স্মার্ট উদ্যোগ ব্যবহার করে প্রয্ুিক্ত ইকোসিস্টেম (BSP, ICCAS, CASS, ICH, IBCS, ASD, ARC সিস্টেম)-এর মাধ্যমে ক্রয়কৃত টিকিটের পেমেন্ট নিষ্পত্তি করে থাকে। যা VERDI সিস্টেমের মাধ্যমে অটোমেটেড অডিট করা হয়।
ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন স্মার্ট সলিউশনের সফল বাস্তবায়ন : ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন স্মার্ট সলিউশনের সফল বাস্তবায়ন করে বিমান ‘National Carrier’ হিসেবে বাংলাদেশ অ্যাভিয়েশন ব্যবসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিমানে ইতিমধ্যে ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ায় IATA Billing Settlement System (BSP), IATA Currency Clearance System (ICCS), Cargo Accounting Settlement System (CASS), IATA Clearing House (ICH), IATA BSP Consulter System (IBCS), Air Desk Seminar (ADS) Ges Airline Reporting Corporation (ARC) দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করে বিশ্বের অন্যান্য স্বনামধন্য এয়ারলাইনসের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে আছে। যাত্রীদের কাক্সিক্ষত সময়ে সঠিক উড়োজাহাজ নির্ধারণ, ডেটানির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দক্ষ অপারেশন এবং গ্রাহকের সম্পৃক্ততা নিশ্চিতকরণে বিমান IATA-এর Direct Data Solution (DDS) চালু করেছে। Direct Data Solution (DDS) সিস্টেমের Big Data টেকনোলজি ব্যবহার করে তথ্য-উপাত্তের সাহায্যে মার্কেট রিসার্চ করার মাধ্যমে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত দ্রুত ও সঠিকভাবে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
ডিজিটাল গ্রাহক সেবা : Sabre ডিপার্চার কন্ট্রোলের সহযোগিতায় বিমান একটি প্রযুক্তি ইকোসিস্টেমের মাধ্যমে ভ্রমণকারীদের চেক-ইন সম্পন্ন করা ও ভ্রমণকারীর গন্তব্যের দেশটির নিয়ম অনুসারে প্যাসেঞ্জার APIS সিস্টেমের মাধ্যমে অগ্রিম তথ্য প্রেরণ করা হয়, যা তাকে ওই দেশে প্রবেশে সহায়তা করে থাকে। আন্তর্জাতিক রুটের যাত্রীদের জন্য ‘ওয়েব চেক-ইন’ সেবা চালু রয়েছে। বিমানের রিজার্ভেশন সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন করে প্যাসেঞ্জার নোটিফিকেশন সিস্টেমের মাধ্যমে ফ্লাইটের তারিখ ও সময় পরিবর্তিত হলে দ্রুততার সঙ্গে ইমেইল ও বাংলাদেশি মোবাইল নম্বরে এসএমএস প্রদান করে যাত্রীদের অবহিত করা হয়।
স্মার্ট কল সেন্টার : সার্বক্ষণিক যাত্রীসেবার জন্য বিমান ১৩৬৩৬ শর্ট কোডের মাধ্যমে স্মার্ট Call Center চালু করেছে। যাত্রীরা স্মার্ট Call Center -এর মাধ্যমে নতুন টিকিট ক্রয়, টিকিটের তারিখ পরিবর্তন ও অন্যান্য সেবা পেয়ে থাকেন। স্মার্ট ঈধষষ ঈবহঃবৎ-এর সঙ্গে ভিসা, মাস্টার, এমেক্স কার্ড, বিকাশ, নগদ-সহ প্রায় সব ধরনের কার্ড এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম য্ক্তু করা হয়েছে যা বাংলাদেশে এই প্রথম।
অপারেশনে প্রযুক্তিগত ইন্টিগ্রেশন : জার্মানির লুফথানসা সিস্টেমের বিশ্বখ্যাত ফ্লাইট ডিসপ্যাচ সল্যুশন ‘LIDO Flight 4D’ চালু করা হয়েছে। ডেটা ইন্টিগ্রেশন করে NOTAMs, AIP, এবং ATM সীমাবদ্ধতাগুলোকে একটি ডিজিটাল, মেশিন-পাঠযোগ্য বিন্যাসে রূপান্তরের মাধ্যমে আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স (AI) ও মেশিন লার্নিং (ML) টেকনোলোজি ব্যবহার করে ‘LIDO Flight 4D’ সফটওয়্যারটি নিখুঁত এবং সাশ্রয়ীভাবে ফ্লাইট প্ল্যানিং করে থাকে। এটি জেট ফুয়েল খরচসহ বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয়ী করে। সফটওয়্যারটি নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত ও নতুন রুট সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ডেটা-পরিচালিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ : Big Data, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI), মেশিন লার্নিং (ML) ব্যবহার করে ফ্লাইট প্রফিটেবিলিটি বৃদ্ধি করার জন্য Revenue Management System-এর মাধ্যমে টিকিটের বিভিন্ন আরবিডি (রিজার্ভেশন বুকিং ডেজিগনেটর) নির্ধারণ করা হয়। এছাড়াও Revenue Integrity সিস্টেমের মাধ্যমে মেশিন লার্নিং (গখ) টেকনোলজি ব্যবহার করে বিভিন্ন ‘ব্যাড-বুকিং’ ও বিমানের টিকিট বিক্রয় পলিসি বহির্ভূত বুকিংগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিজার্ভেশন সিস্টেম থেকে মুছে ফেলা হয়। ফলে টিকিটের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি পায়।
টেকসই উদ্যোগ : স্মার্ট ডিভাইস (বডি ক্যামেরা) যুক্ত করার মাধ্যমে ব্যাগেজ পরিষেবার আধুনিকায়ন ও জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। বুকিং-এর সব ধরনের অনিয়ম রোধকল্পে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও এজেন্ট কর্র্তৃক টিকিট ভাড়া কম দেখিয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে বিমানের আর্থিক ক্ষতি বন্ধে বিশ্বের স্বনামধন্য IATA Strategic Partner Accelya থেকে VERD নামক সিস্টেম যা Sales Audit (BIDT)-এ যুগান্তকারী সিস্টেম। সিস্টেমটি এই পর্যন্ত টিকিটের আর্থিক অনিয়ম চিহ্নিত করে প্রায় ইউএসডি ৩ মিলিয়ন ডলারের সাশ্রয় করেছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যে কার্গো পরিষেবাগুলোর গুরুত্ব অনুধাবন করে বিমান একটি স্বয়ংক্রিয় কার্গো ব্যবস্থাপনা এবং ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করার পথে রয়েছে।
স্মার্ট ব্যাক অফিস : বর্তমানে বিমানের Back Office-এর প্রকৃতি data processing এর জন্য RAPID, Cargo Data Processing-Gi -এর জন্য Cargo Spot System দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়াও Routine Performance Evaluate করার নিমিত্তে Finess FPS System-এর মাধ্যমে প্রতিনিয়ত ব্যবস্থাপনাকে লাভজনক রুট চিহ্নিতকরণসহ রাজস্ব বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। এছাড়া Cargo Handling সেবার বিলিং পদ্ধতি ও সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে Fineness MBS System ব্যবহার করে ICH বিলিং কার্যক্রম সম্পন্ন করছে। বিশ্বের স্বনামধন্য Acceleya Company-এর Revenue MST System Air RM ব্যবহার করে রাজস্ব ব্যবস্থাপনাসহ যাত্রীপ্রতি রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ডিজিটাল ট্রেনিং ও উন্নয়ন : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য ডিজিটাল ট্রেনিং প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কর্মীরা নিয়মিত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারেন, যা তাদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। কর্মীদের দক্ষতা মূল্যায়ন এবং উন্নয়নের জন্য একটি ট্যালেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা কর্মীদের প্রফেশনাল গ্রোথ নিশ্চিত করবে।
পরিবেশ বান্ধব উদ্যোগ : কার্বন নির্গমন কমানোর জন্য নতুন প্রজন্মের ফুয়েল-এফিশিয়েন্ট এয়ারক্রাফটের ব্যবহার এবং বিভিন্ন পরিবেশ সংরক্ষণ প্রকল্পে অংশগ্রহণ। বিভিন্ন গ্রিন অপারেশনাল প্র্যাকটিস চালু করা, যেমন কাগজহীন অফিস, ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণের ব্যবহার।
স্মার্ট লয়্যালটি প্রোগ্রাম : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস যাত্রীদের জন্য একটি স্মার্ট লয়্যালটি প্রোগ্রাম চালু করেছে। এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত যাত্রীরা বিশেষ সুবিধা এবং অফার উপভোগ করতে পারেন, যা যাত্রীদের সঙ্গে সংস্থার সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমে যাত্রীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে তারা নিয়মিত ফ্লাইট তথ্য, প্রমোশন এবং অন্যান্য আপডেট প্রদান করে।
ইনফ্লাইট এন্টারটেইনমেন্ট সিস্টেম : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের নতুন প্রজন্মের এয়ারক্রাফটগুলোতে উন্নত ইনফ্লাইট এন্টারটেইনমেন্ট সিস্টেম (IFE) ইনস্টল করা হয়েছে, যা যাত্রীদের জন্য ফ্লাইট অভিজ্ঞতাকে আরও মনোরম করে তোলে।
রিয়েল-টাইম ফ্লাইট ট্র্যাকিং : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস যাত্রীদের জন্য রিয়েল-টাইম ফ্লাইট ট্র্যাকিং সেবা চালু করেছে। যাত্রীরা তাদের ফ্লাইটের বর্তমান অবস্থান এবং সময়সূচি সহজেই ট্র্যাক করতে পারেন, যা তাদের ভ্রমণ পরিকল্পনা আরও সহজ করে তোলে।
সামাজিক দায়বদ্ধতা : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বিভিন্ন সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রম (CSR গ্রহণ করেছে, যা সমাজের কল্যাণে ভূমিকা রাখছে। এর মধ্যে শিক্ষামূলক প্রোগ্রাম, স্বাস্থ্যসেবা উদ্যোগ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত।
অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনস ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্ব করেছে, যা তাদের প্রযুক্তিগত ও অপারেশনাল দক্ষতা বৃদ্ধি করতে সহায়ক হয়েছে।
রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণের জন্য গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) কার্যক্রম পরিচালনা করছে। উদ্ভাবনী প্রযুক্তি এবং পরিষেবার উন্নয়নের জন্য তাদের নিজস্ব গবেষণা দল কাজ করছে।
উন্নত গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং : বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা উন্নত করার জন্য নতুন প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সংযোজন করা হয়েছে, যা বিমানের পরিষেবা দক্ষতা ও যাত্রী সন্তুষ্টি বৃদ্ধি করেছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় করেছে এবং লাভের ধারা বজায় রেখে সরকারের লাভজনক কোম্পানিসমূহের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে।
লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস
mdbiman@biman.gov.bd