খেলায় হারজিত থাকবেই, তবে কিছু কিছু হার লজ্জার। যেমন হিউস্টনে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সিরিজের দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টি ম্যাচটা ৬ রানে হেরে সিরিজ খোয়ানোটা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ক্রিকেটের চূড়ান্ত লজ্জাজনক মুহূর্তের একটি। অপেশাদার, অভিবাসী খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া একটা দল হারিয়ে দিল ২৪ বছর ধরে টেস্ট খেলা পুরোদস্তুর পেশাদার এবং দেশের গন্ডিতে ঈর্ষণীয় তারকাখ্যাতি পেয়ে আসা দলটাকে।
একটা ক্রিকেট ম্যাচ মাঠে গড়ালে সেখানে কেউ রান করবে, কেউ উইকেট পাবে, কেউ ক্যাচ ধরবে এটাই স্বাভাবিক। তবে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের শরীরী ভাষা, খেলার ধরন, আউট হওয়ার ভঙ্গিমা সবকিছুর ভেতরই অদ্ভুত এক ছন্নছাড়া নির্লিপ্ততার ছাপ।
কেউ যদি জার্সির রঙ না জানেন, তাহলে খেলাটা দেখলে মনে করতে পারেন যুক্তরাষ্ট্রের দলটাই হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে দল আর বাংলাদেশ হচ্ছে পাড়ায় নতুন। সিরিজের প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশ আগে ব্যাটিং করে হেরেছিল, এবার পরে ব্যাটিং করে হেরে দেখিয়ে দিল যে সবরকমভাবেই তারা হারতে প্রস্তুত।
বৃহস্পতিবার, দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টির একাদশে লিটন দাস ছিলেন না; তানজিদ হাসান তামিম এসেছেন তার জায়গায়। তাতেও উদ্বোধনী জুটিতে ভালো শুরু বা পাওয়ার প্লেতে ভালো রান, কিছুই দেখা যায়নি।
অভিজ্ঞতার বুলি বারবার আউড়ে যাওয়া হয় বাংলাদেশে। ২০ ওভারে ১৪৫ রান তাড়া করতে গিয়ে দলের অভিজ্ঞতম দুই ক্রিকেটার, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১৭ বছরের মতো সময় কাটিয়ে দেওয়া সাকিব আল হাসান এবং মাহমুদউল্লাহ যেভাবে ব্যাট করলেন, তাতে মনে হতে পারে তারাও নবীনের দলে। অথচ একই ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের অধিনায়ক মোনাক প্যাটেল যেভাবে ইনিংসের সূচনায় নেমে ১৯তম ওভার পর্যন্ত একটা প্রান্ত আগলে রেখে দলের ইনিংসটাকে এক সুতোয় বাঁধলেন, তাতে মনেই হলো না এ ক্রিকেটারটি মাত্র ২৪তম আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি খেলতে নেমেছেন।
আগে ব্যাট করে যুক্তরাষ্ট্র করে ২০ ওভারে ৬ উইকেটে ১৪৪ রান। শরিফুল ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান আর রিশাদ হোসেন প্রত্যেকে মিলে ২ উইকেট করে ভাগ করে নিয়েছেন। মোনাক প্যাটেলের ৩৮ বলে ৪২ রানই সর্বোচ্চ মার্কিনিদের ইনিংসে।
১২০ বলে ১৪৫ রানের সমীকরণ মিলে যাওয়ারই কথা। মিলল না সৌম্য সরকারের অবিমৃষ্যকারিতায়, নাজমুল হোসেন শান্তর দায়িত্বে অবহেলায়, সাকিবের খেয়ালিপনায়, মাহমুদউল্লাহর ব্যর্থতায়। শূন্য রানে সৌম্যর বিদায়, যখন দলের রান মাত্র ১। শান্তর সঙ্গে তানজিদ তামিম ৩০ রানের জুটি গড়ে বিপদটা সামাল দিলেও মূলত শান্তর রান আউটেই বদলে যায় ম্যাচের রঙ। ৩৭ বলে ৪৮ রান জুড়ে খেলাটা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসছিল শান্ত-হৃদয়ের জুটি। কিন্তু এমন সময়ই সর্বনাশা রান আউট, দিকভ্রান্তের মতো শান্তের দৌড় আর কোরে অ্যান্ডারসনের বুদ্ধিদীপ্ত ভ‚মিকা। বল না ছুড়ে নিজেই বল নিয়ে দৌড়ে গিয়ে স্টাম্প ভাঙা। পেসারের বলে কাট-শটে সাকিবের বিদায়, দলের বিপর্যয়ের মুখে বোল্ড হয়ে মাহমুদউল্লাহর বিপদ বাড়িয়ে তোলেন।
ম্যাচসেরা হয়েছেন ২৫ রানে ৩ উইকেট নেয়া আলি খান। প্রায়ই বিপিএলে প্লেয়ার ড্রাফটে বিদেশি খেলোয়াড় তালিকায় তার নাম থাকে এবং তিনি অবিক্রিত থাকেন। একটা মৌসুম খুব সম্ভবত খুলনা ফ্র্যাঞ্চাইজির হয়ে খেলেছিলেন। বাংলাদেশের হয়ে আইপিএলে শেখার কিছু অবশিষ্ট না থাকা বোলার এই শৌখিন মার্কিনিদের যতটা না নাজেহাল করেছেন, আলি খান তার চেয়ে বেশি করে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ দলকে। শেষটায় রিশাদ হোসেন যখন শর্ট বলে বাউন্ডারি মেরে বেশ একটা নাটকীয়তার জন্ম দিলেন, পরের বলটাতেই রিশাদ হলেন কট বিহাইন্ড। ১৯.৩ ওভারে ১৩৮ রানে অলআউট হল বাংলাদেশ, ম্যাচটা হেরে গেল ৬ রানে।
সিরিজটাও হেরে গেল ২-০ ব্যবধানে। বিশ্বকাপের আগে যে হারটা লজ্জার এবং আতঙ্কেরও।