পথ ভুলে বাংলাদেশে, ৪০ বছর পর নেপালে ফিরলেন বীর বাহাদুর

নেপালি নাগরিক বীর বাহাদুর রায়। বর্তমানে তার বয়স প্রায় ষাট ছুঁইছুঁই। বাংলাদেশেই কেটেছে তার জীবনের দীর্ঘ ৪০টি বছর। দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে থাকায় নেপালি ভাষা ভুলে বাংলা ভাষা শিখে ফেলেন। বাংলা ভাষা এতটাই রপ্ত করেছেন যে বর্তমানে নেপালি ভাষায় কথা বলতে পারছেন না তিনি। দীর্ঘ ৪০ বছর পরে দেশে ফিরছেন তিনি। স্বজনেরা তাকে নিতে এসেছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বাংলাদেশের বাংলাবান্ধা ইমিগ্রেশনে আইনি প্রক্রিয়া শেষে বাংলাবান্ধা ও ভারতের ফুলবাড়ি সীমান্তে তাকে নিয়ে আসা হয়। এ সময় বীর বাহাদুরের ভাতিজা রাজন চাচাকে কাছে পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরেন। দীর্ঘদিন পর স্বজনদের কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বীর বাহাদুর। পরে ভাতিজা রাজন চাচাকে উত্তরীয় ও টুপি পরিয়ে পা ছুঁয়ে সালাম করেন। পরে চাচা বীর বাহাদুরও ভাতিজার পা ছুঁয়ে সম্মান জানান। পরে রাজন বগুড়ার দুঁপচাচিয়া এলাকার বাসিন্দা ফরেন, অলকসহ কয়েকজনের গলায় উত্তরীয় পরিয়ে দেন।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফজলে রাব্বি, নেপালের দূতাবাসের উপ-রাষ্ট্রদূত মিস ললিতা সিলওয়াল, দ্বিতীয় সচিব মিস ইয়োজানা বামজান ও সেক্রেটারি অব অ্যাম্বাসেডর রিয়া ছেত্রী, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহবুবুল হাসান, বাংলাবান্ধা ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের উপপরিদর্শক (এসআই) ও ইনচার্জ অমৃত অধিকারী, পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বীর বাহাদুর ছোটবেলা থেকে কিছুটা মানসিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় বাসায় স্থির থাকতেন না। একপর্যায়ে ১৫ বছর বয়সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন। পরে ঘুরতে ঘুরতে নেপাল থেকে ঢুকে পড়েন ভারতে। পরে সেখান থেকে সীমান্ত দিয়ে কখন বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন এখন কিছুই মনে নেই তার। এরই মাঝে প্রায় ১০ বছর কেটেছে সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাটসহ উত্তরের কয়েকটি জেলায়। এসব জেলায় তিনি দিনমজুর, হোটেল শ্রমিকের কাজ করেছেন। পরে আবার ঘুরতে ঘুরতে বগুড়া জেলার দুপঁচাচিয়া উপজেলার মাস্টার পাড়া এলাকায় চলে যান। সেখানেই কাটে তার জীবনের দীর্ঘ ৩০টি বছর। সেখানে তিনি অলক বসাক নামে এক ব্যক্তির মিল চাতালে শ্রমিকের কাজ করেছেন। কাজের বিনিময়ে শুধু খাবার খেতেন। কোনও টাকা পয়সা নিতেন না।

তার মধ্যে দেশে ফেরার টান ছিল। একপর্যায়ে স্থানীয়রা তার কাছে তার বাড়ির ঠিকানা জানতে চাইলে গোরখে বাঙ্গিনা বললেও বিস্তারিত বলতে পারেননি তিনি। অনেকে তাকে বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের বাসিন্দা মনে করেন। পরে তাকে নেপালি ভাষা লিখতে দিলে স্বাচ্ছন্দে লিখে ফেলেন তিনি। পরে দুপঁচাচিয়া মাস্টারপাড়া এলাকার বাসিন্দা মেহেদী হাসান ফরেন বীর বাহাদুরের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেন ঠিকানা জানতে চান। পরে স্থানীয় একটি গণমাধ্যেমে তাকে নিয়ে নিউজ হলে প্রশাসনিক ভাবে বীর বাহাদুরের ঠিকানা খুঁজতে নেপাল অ্যাম্বাসিতে তার ছবি দেওয়া হয়। পরে দীর্ঘ সময় পরে নেপালের গোরখে বাঙ্গিনাতে তার পরিবারের কাছে ছবি দেখানো হলে তার বড় ভাবি বীর বাহাদুরকে চিনতে পারেন। পরে বীর বাহাদুরকে দেশে পাঠাতে শুরু হয় আইনি প্রক্রিয়া। দীর্ঘ ৬ মাস পরে তাকে দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

বগুড়া জেলার দুপঁচাচিয়া পৌরসভার এলাকার বাসিন্দা পলক কুমার বসাক বলেন, বীর বাহাদুর দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে আমাদের মিল চাতালে কাজ করেছেন। কাজের বিনিময়ে শুধু খাবার খেয়েছেন কোনো পারিশ্রমিক নেননি। আজকে তার পরিবারের হাতে তুলে দিতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত।

দুপঁচাচিয়া মাস্টারপাড়া এলাকার বাসিন্দা মেহেদী হাসান ফরেন বলেন, আমি বীর বাহাদুরের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করি যাতে তাকে কোনোভাবে দেশে পাঠানো যায়। যাক দীর্ঘ দিন পরে তাকে দেশে স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরে খুবই ভালো লাগছে।

নেপালি দূতাবাসের অ্যাম্বাসেডর রিয়া ছেত্রী বলেন, আমরা ফেসবুকে এক নেপালি নাগরিকের দেশে ফেরত যাওয়ার আকুতির জানানোর ভিডিও দেখতে পাই। পরে বগুড়ার দুপচাচিয়া থেকে বীর বাহাদুর নামে ওই ব্যক্তির ছবি নিয়ে আমাদের অ্যাঁম্বাসির মাধ্যেমে আইনি প্রক্রিয়া শেষে দেশে ফেরত দেওয়া হলো। তার স্বজনেরা তাকে নিতে এসেছেন। আমরা তার ভাতিজা রাজনের হাতে বীর বাহাদুরকে তুলে দিয়েছি। আমরা চাই তার জীবনের বাকি সময়টুকু কাটুক পরিবারের সঙ্গে।