অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে অযত্ন-অবহেলায় যান্ত্রিক ত্রুটির পাশাপাশি নানা সমস্যার মুখে অর্ধশতাব্দী বয়সের ভারে ন্যুব্জ কুষ্টিয়া সুগার মিলের উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করা হয় ২০২০ সালের নভেম্বরে। এরপর থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠানটির দিকে নজর নেই সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের। প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কারখানা ভবনসহ অন্যান্য অবকাঠামো হয়ে পড়েছে নড়বড়ে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত জায়গাগুলো মেরামতে অর্থ বরাদ্দ দেয়নি চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন। টানা কয়েক মৌসুম বন্ধ থাকায় চিনিকলটির অভ্যন্তরে বিরাজ করছে ভূতুড়ে পরিবেশ ও সুনসান নীরবতা। এককালের জৌলুসপূর্ণ এই মিলে এখন নেই কর্মব্যস্ততা ও প্রাণের কলরব। সব মিলিয়ে এক সময়ের নামকরা এ শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি যেন এখন শুধুই ধ্বংসস্তূপে রূপলাভের অপেক্ষার প্রহর গুনছে।
চাষাবাদের জন্য অতি উর্বর কুষ্টিয়ার মাটিতে আখ চাষের সেরা মানের পরিবেশ থাকায় ১৯৬১ সালে ২২১ দশমিক ৪৬ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় কুষ্টিয়া চিনিকল। ১৯৬৫-৬৬ অর্থবছর থেকে শুরু হয় আখ মাড়াই কার্যক্রম। পরে ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে রাষ্ট্রায়ত্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেয় সরকার।
কুষ্টিয়া চিনিকলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০২০ সালের ৩ নভেম্বর শিল্প মন্ত্রণালয়ের একটি সুপারিশপত্রে চিনি উৎপাদন, আখের জমি হ্রাসকরণ, মিলের ব্যবস্থাপনা ও দক্ষতা, লোকসান ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ঊর্ধ্বগামী হওয়ায় দেশের ১৫টি চিনিকলের মধ্যে কুষ্টিয়া চিনিকলসহ ছয়টি চিনিকলে ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে আখ মাড়াই মৌসুমে উৎপাদন স্থগিত করা হয়।
উৎপাদন বন্ধ থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে কুষ্টিয়া চিনিকলের অবসরপ্রাপ্ত কারখানা শ্রমিক মিনাপাড়ার বাসিন্দা রেজাউল করীম (৭৫) বলেন, ‘প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিভিন্ন ক্যাটাগরির শ্রমিক, কৃষক, ব্যবসায়ী মিলে অর্ধলক্ষাধিক মানুষের আয় রোজগারের কেন্দ্র ছিল এ প্রতিষ্ঠানটি। চলছিলও ভালোই, লাভজনক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এর উৎপাদন ক্ষমতাও বৃদ্ধি করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের অযতœ-অবহেলা, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনার ফলে এ প্রতিষ্ঠানটিকে লোকসান দেখিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হলো।
কর্র্তৃপক্ষ দোষ দেয় শ্রমিক সংগঠনকে; শ্রমিকরা দোষারোপ করে কর্র্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনাকে। বন্ধ হওয়া কারখানাটি এখন আস্তে আস্তে মাটিতে মিশে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে। এত বড় একটা কারখানা চোখের সামনে ধ্বংসস্তূপ হয়ে যাচ্ছে; কারখানার শেডগুলো খসে পড়ে যাচ্ছে, অথচ দেখার কেউ নেই।’
আখচাষি জালাল মন্ডল আক্ষেপ করে বলেন, ‘হয়রানি ভোগান্তির কারণে কুশরী (আখ) চাষ মাঠ থেকে তুলে দেয় কৃষকরা। তামুক (তামাক) কোম্পানিরা যেকানে টেকা সার বীজসহ সবরকম সাহায্য করে চাষিদের, চিনিকলের লোকজন তার সম্পূর্ণ উল্টা। সেজন্যিই আজ মিলটার এই দুরবস্থা।’
কুষ্টিয়া চিনিকলের শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি সাগর আহমেদ বলেন, ‘কোনো শ্রমিক কখনো চাইবে না তার কর্মপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যাক। এখানে শুধু শ্রমিকদের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা
থাকলেই চলবে না। একই সঙ্গে চিনিশিল্প করপোরেশনকে সুদৃষ্টি দিতে হবে। করপোরেশনের দায়িত্বহীনতার ফলে প্রতি বছরই উৎপাদিত চিনি গুদামজাত থেকে অবিক্রীত থাকায় একদিকে শ্রমিক তার বকেয়া বেতন/বোনাস/ভাতা না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করত, অন্যদিকে কৃষক তার আখের দাম পেতে হয়রানির মুখে পড়ে আখ চাষে নিরুৎসাহিত হয়; আবার অর্থসংকটে মিলের সংস্কারকাজও আটকে যাওয়া, সব মিলিয়ে এক অনিশ্চিত শঙ্কায় দিন কাটছে।’
সার্বিক বিষয়ে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া কুষ্টিয়া চিনিকলের দেখভালের দায়িত্বরত (কারখানা ইনচার্জ) হাবিবুর রহমান বলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নানা কারণে কারখানা ভবনের এ জরাজীর্ণতার কথা চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন কর্র্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে। উনারা কয়েকবার এসে পরিদর্শনও করে গেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত জায়গাগুলো মেরামতের জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ হয়নি। অর্থ বরাদ্দ পেলেই ভেঙে যাওয়া জায়গা বা উড়ে যাওয়া চালাসহ ক্ষতিগ্রস্ত ভবন সংস্কার করা হবে।’