সবার পরিচিত ট্রাফিক সিগন্যালের নকশা একশ বছর পুরনো। সম্প্রতি এতে কিছু পরিবর্তন আনার চেষ্টায় রয়েছেন গবেষকরা। আলজাজিরা অবলম্বনে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
নগরবাসী সবাই চেনে ট্রাফিক সিগন্যাল বা স্টপলাইট। দুই বা ততোধিক রাস্তার সংযোগস্থলের মধ্য দিয়ে যাওয়া যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত বাতির নাম ট্রাফিক সিগন্যাল। যা কখনো চলন্ত গাড়ি থামিয়ে দেয়, কখনো থেমে থাকা গাড়ি চলতে দেয়। এ ছাড়া পথচারী পারাপারেও এ বাতির ব্যবহার দেখা যায়। কিছু ক্ষেত্রে ট্রাফিক সিগন্যাল চালকদের ডানে বা বামে যাওয়ার নির্দেশনাও দেয়। সাধারণত লাল, সবুজ আর হলুদ রঙে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে একটি দণ্ডায়মান কাঠামোর ওপর ট্রাফিক সিগন্যালে সংযুক্ত তিনটি বাতির যে নকশা তা একশ বছরেরও বেশি পুরনো। যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েট পুলিশ অফিসার উইলিয়াম পট ১৯২১ সালে প্রথম ট্রাফিক সিগন্যালের এ নকশা তৈরি করেন। এরপর সর্বজনীনভাবে পরিচিত ট্রাফিক লাইটে কোনো উল্লেখযোগ্য নকশা যুক্ত হয়নি। তবে বিজ্ঞানের উৎকর্ষের যুগে যেহেতু চালকবিহীন গাড়িরও আবির্ভাব ঘটেছে, সে জন্য বিশেষজ্ঞরা ট্রাফিক সিগন্যালে কিছু পরিবর্তন আনতে চান। নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল বিষয়ের অধ্যাপক আলি হাজবাবাইয়ের নেতৃত্বে চালকবিহীন গাড়িকেও ট্রাফিক সিগন্যালের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। হাজবাবাই দ্য অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস সংবাদ সংস্থাকে বলেছেন, তিনি আরেকটি আলো যোগ করার প্রস্তাব দিয়েছেন, সম্ভবত সেটি সাদা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাফিক সিগন্যাল শুধু দুর্ঘটনা থেকে সুরক্ষা দেয় না। তারা যানজট ও ভোগান্তি কমায়। এর ফলে মানুষের কর্মস্পৃহা অটুট থাকে এবং জ্বালানি অপচয় কমে। যা অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। ২০২২ সালের এক জরিপে দেখা গেছে যুক্তরাজ্য, জার্মানি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যানজটের কারণে দুই দশমিক দুই বিলিয়ন ডলার খরচ হতো। এ খরচ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ট্রাফিক সিগন্যাল।
শুরু
প্রথম আলোকিত ট্রাফিক সিগন্যাল ১৮৬৮ সালে ইংল্যান্ডের লন্ডনে বসানো হয়েছিল। এটি ম্যানুয়ালি চালু করতে হতো। ওই সময়ে ঘোড়ার গাড়ির জট কমাতে ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। একটি খুঁটিতে লাল এবং সবুজ রঙের দুটি গ্যাস বাতি সংযুক্ত ছিল। রেলওয়ে সিগন্যালিং সিস্টেমের ওপর ভিত্তি করে এটি পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়। যার জন্য একজন পুলিশ সদস্য নিয়োগ দিতে হয়। বাতি জ্বালানোর জন্য পাইপ থেকে গ্যাস সরবরাহ করা হতো। তবে বাতি জ্বালানোর সময় বিস্ফোরণে এক পুলিশ সদস্য নিহত হলে ওই ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা আর ব্যবহার হয়নি। প্রায় ৬০ বছর ইংল্যান্ড তাদের সড়কে ট্রাফিক সিগন্যাল যুক্ত করেনি। ১৯২৯ সালে তাদের রাস্তায় এ ব্যবস্থা যুক্ত হয়। ততদিনে যুক্তরাষ্ট্র আরও আধুনিক ব্যবস্থার প্রচলন করে। প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাফিক সিগন্যাল ১৯১৪ সালে ক্লিভল্যান্ডে বসানো হয়। এতে সবুজ এবং লাল আলোর সঙ্গে সতর্কীকরণ আরেকটি রঙের ব্যবহার ছিল। যা সবুজ বা লাল আলো জ্বলে ওঠার আগে সংকেত দিত। ১৯২৩ সালে আফ্রিকান-আমেরিকান উদ্ভাবক গ্যারেট মরগান স্বয়ংক্রিয় বিদ্যুৎচালিত প্রথম ট্রাফিক লাইট উদ্ভাবন করেন। তিনি জেনারেল ইলেকট্রিকের কাছে তার নকশা ৪০ হাজার ডলারে বিক্রি করেন। মুদ্রাস্ফীতিসহ বিবেচনায় নিলে আজকের মূল্যে যা ৭ লাখ ৩০ হাজার ডলার। লাল মানে থামা আর সবুজ চলার সংকেত, এ ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল রেলওয়েতে। এ পরিবহনব্যবস্থার প্রথম দিক থেকেই লাল ব্যবহার করা হতো থামার জন্য। আর সাদা এগিয়ে যাওয়ার সংকেত ছিল। সবুজ দিত সাবধানতার বার্তা। তবে এ নিয়ে কিছু সমস্যা তৈরি হয়। যেমন সাদা রঙ নিয়ে বিভ্রান্ত হতেন চালকরা। অন্যান্য বাতির রঙও সাদা বলে ভ্রম হয় অনেক সময়। অথবা আকাশের চাঁদকেও সাদা বলে মনে হতে পারে কখনো। এ সংকট দূর করতে রেলওয়ে কোম্পানিগুলো এগিয়ে চলার সংকেত হিসেবে সবুজের ব্যবহার শুরু করে। আর লাল বরাবরই বিপদের প্রতীক। লাল আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বেশি বলে অনেক দূর থেকেও দেখা যায়। সে বিবেচনায় লাল অন্যান্য রঙের তুলনায় এগিয়ে। সম্ভবত এ কারণে লালকে থামার রঙ হিসেবে ব্যবহারে কোনো বিভ্রান্তি তৈরি হয়নি। তবে উনিশ শতকের শুরুতে কোথাও কোথাও থামার সংকেত হিসেবে হলুদ ব্যবহার হতো।
কয়েক রকম
বেশিরভাগ ট্রাফিক ব্যবস্থা দুভাবে কাজ করে, একটি হলো ট্রাফিক সিগন্যাল যা একটি নির্দিষ্ট সময়সূচিতে কাজ করে, আরেকটি ট্রাফিক ভলিউমের ওপর সামঞ্জস্য তৈরি করতে পারে। কয়েক ধরনের ট্রাফিক ব্যবস্থা রয়েছে, যেমন সাধারণ একটি ব্যবস্থা রয়েছে নির্দিষ্ট সময়ের ওপর ভিত্তি করে। ট্রাফিক পরিকল্পনাকারী সাধারণ গবেষণার ওপর ভিত্তি করে কখন কোন আলো জ্বলবে তা নির্ধারণ করে দেয়। ফলে নির্দিষ্ট সময় পরপর লাল, সবুজ বাতি জ্বলে ওঠে। আরেকটি ব্যবস্থা তৈরি হয় রাস্তায় সংযুক্ত অন্যান্য যন্ত্রের ওপর ভিত্তি করে। এ ব্যবস্থায় কোনো মোড়ে যানবাহনের উপস্থিতি এবং সংখ্যা শনাক্ত করা হয়। ট্রাফিক সিগন্যালের সঙ্গে এ পরিসংখ্যান যুক্ত হয়। সে হিসেবে নির্দেশ তৈরি হয় কোন সড়কের গাড়ি চলবে এবং কোনটি থেমে থাকবে। স্পিøট সাইকেল অফসেট অপ্টিমাইজেশন টেকনিক ব্যবস্থায় যানবাহনের বাস্তব উপস্থিতির তথ্য ব্যবহার করে কয়েকটি সংযোগ সড়কের বিভিন্ন দিকে এর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এ ব্যবস্থায় ট্রাফিক সিগন্যাল থেকে সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কোন আলো কতটা সময় জ্বলবে তা নির্ধারণ করা হয়। এটি যানজট কমাতে এবং ট্রাফিক প্রবাহের উন্নতিতে সহায়তা করে। আরেকটি রয়েছে পথচারী সক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল। এগুলো একটি পুশ বোতাম বা সেন্সরের মাধ্যমে সক্রিয় করা হয়। পথচারীকে শনাক্তের মাধ্যমে ট্রাফিক লাইট পরিবর্তিত হয়।
চতুর্থ রঙ
স্বয়ংক্রিয় গাড়ির জন্য আলাদা আলোর ব্যবস্থা রাখার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, মানুষের মস্তিষ্ক এবং নিজেই নিজেকে চালাতে পারে এমন গাড়ির ক্ষেত্রে আলোর সংকেত ভিন্ন হওয়ার কথা। তারা সে জন্য নতুন একটি রঙ ট্রাফিক ব্যবস্থায় যুক্ত করতে চাচ্ছেন আর সেটি হলো সাদা। সাদা রঙটি জ্বলতে থাকলে স্বয়ংক্রিয় গাড়ি চলতে থাকবে। এ রঙ নির্দেশ দেবে অন্য নির্দেশ না আসা পর্যন্ত চালিয়ে যেতে। এনসিএসইউর অধ্যাপক হাজবাবাই বলেন, যদি সাদা আলো সক্রিয় থাকে, তবে স্বচালিত গাড়ি কেবল সামনের গাড়িটিকে অনুসরণ করবে। প্রস্তাবিত চতুর্থ আলো আজকের ট্রাফিক লাইটের মতো একইভাবে কাজ করবে। একটি অতিরিক্ত সাদা আলো শুধু যুক্ত হবে এতে। যা জানান দেবে ওই সড়কে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে পারে এমন গাড়ি রয়েছে। সাদা আলো মানব চালকদের সংকেত দেবে যে স্বচালিত গাড়িও তাদের সঙ্গে আছে। এ আলো জ্বললে মানব চালকদের শুধু সামনের গাড়িটিকে অনুসরণ করতে হবে। স্বয়ংক্রিয় গাড়ির জন্য চতুর্থ আলো জ্বলবে না। এটি জ্বলবে শুধু মানুষ চালকদের জন্য। তবে পথচারীদের কাছে এ আলোর অর্থ কী দাঁড়াবে তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। এ ছাড়া জরিপে দেখা গেছে, স্বয়ংক্রিয় গাড়ির উপস্থিতি যত বেড়েছে সড়কে যানজট তত কমেছে। সড়কে অবস্থানের পরিমাণ তিন শতাংশ কমাতে হলে স্বয়ংক্রিয় গাড়ি থাকতে হবে ১০ শতাংশ। আর ৩০ শতাংশ এমন গাড়ির উপস্থিতিতে সময় কমেছে সাড়ে ১০ শতাংশের বেশি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
এ ছাড়া মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক হেনরি লিউ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে যানজট সমস্যা সমাধানের একটি ভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে এসেছেন। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব ট্রান্সপোর্টেশন থেকে কানেক্টেড অ্যান্ড অটোমেটেড ট্রান্সপোর্টেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৫ মিলিয়ন অনুদান জিতে নেয় লিউ এবং তার দল। তারা পরীক্ষা করছে কীভাবে ট্রাফিক লাইটগুলোকে জিপিএসের মাধ্যমে ‘রিয়েল টাইম’ অবস্থান এবং গাড়ির গতির তথ্য ব্যবহার করে সংকেত দেওয়া যায়। সংবাদ মাধ্যমের খবরে জানা যায়, কয়েক বছর আগে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট জানায়, রাজধানীতে মোট ১১০টি ট্রাফিক সিগন্যাল রয়েছে। এআই পদ্ধতিতে ভিডিও ক্যামেরা ও সেন্সর এবং গতি মিটারসহ আরও কিছু সরঞ্জাম বসানো হলে রাজধানীতে যানজট কমে আসবে অনেক। এতে সড়কের চারটি লেনের বিপরীতমুখী গাড়িগুলোর ডানের টার্নগুলো বাদ দেওয়া হবে। তখন শুধু বামে ও সামনের দিকেই চলবে। এটাকে বলা হয় দ্বিমুখী সিগন্যাল। তাছাড়া এতে পথচারীর জন্য সবুজ বাতি দিয়ে হাঁটার সুযোগ করে দেওয়া যেতে হবে।
ঢাকা শহরে ট্রাফিক সিগন্যালের বিষয়টি অবশ্য আলাদা। এখানে হাত ও বাঁশ দিয়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েও সফলতা মেলেনি। কারণ সড়ক ব্যবস্থাপনাসহ অন্য অনেকগুলো বিষয় এর সঙ্গে যুক্ত। ফলে শুধু ট্রাফিক সিগন্যালই যানজট বা পথের অন্যান্য ভোগান্তি কমাতে পারে না। পুরো আর্থসামাজিক অবস্থা এর সঙ্গে যুক্ত। পশ্চিমের দেশগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে গাড়ি চালানোর প্রস্তুতি চললেও, বাংলাদেশের মতো দেশে পরিস্থিতি ভিন্ন। যে কারণে দেশ ভেদে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও ভিন্ন হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে যেমন পশ্চিমা দেশগুলোর এ ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। আবার এশিয়ার ভেতর চীন ও ভারতের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি আলাদা। ভারতের সঙ্গে আমাদের দেশের ট্রাফিক ব্যবস্থায় মিল দেখা যায়। আবার যেমন যানজট, বিশ্বের যে কোনো দেশেই হতে পারে। তবে তা কতটা সময় ধরে হচ্ছে, কত নিয়মিত হচ্ছে; পার্থক্যটা সেখানে তৈরি হয়। সব হিসাবে ট্রাফিক ব্যবস্থাকে বলা যায়, কোনো দেশের আর্থসামাজিক অবস্থারই একটি চিহ্ন।