দাউ শ্যাল্ট নট কিল

মুশির কিতাব, যাকে বলে পেন্টাটুক বা পঞ্চতন্ত্র বা পাঁচ পুস্তিকা তাকে টেন কমান্ডমেন্টস বা আশেরাত হা’দাবারিম বা দশ কথা বা দশ উপদেশ বা দ্য ডেকালগও বলা হয়। এটা হলো আদিপুস্তকীয় দশ নীতিকথা; ইহুদি নীতিশাস্ত্র বা এবাদতনামা বিষয়ক কিতাব। ইহুদি ও খ্রিস্টধর্মে এ উপদেশাবলির মৌলিক এবং নিয়ামক ভূমিকা আছে।

বাইবেলের আদিকিতাবের (ওল্ড টেস্টামেন্ট) তিনটি আলাদা ভাষ্যে যথা Exudus বা নিষ্ক্রমণ বা মহাযাত্রা ২০:২-১৭, Deuteronomy  বা দ্বিতীয় বিবরণ বা পুনর্বিবরণ ৫:৬-২১ এবং Exudus বা মহাযাত্রায় ৩৪:১১-২৬ (রিচুয়াল ডেকালগ) তোরাহ বা তাওরাতে দশ উপদেশাবলির অর্থাৎ টেন কমান্ডমেন্টসের বিবরণ পাওয়া যায়। তাওরাতের পুস্তিকাগুলো হচ্ছে ক্রমানুসারে Genesis  বা পয়দায়েশ বা সৃষ্টির বিবরণ, Exodus বা নিষ্ক্রমণ বা মহাযাত্রা,Leviticusবা লেবীয়গণের পুস্তক বা কাজীগণের কিতাব বা ব্রাহ্মণগণের পুস্তক, Numbers বা শুমারি বা গণনা এবং Deuteronomy বা দ্বিতীয় বিবরণ বা পুনর্বিবরণ। পাঁচটি পুস্তিকাকে বা ছহিফাকে একত্রে বলা হয় পেন্টাটুক বা পঞ্চতন্ত্র।

প্রসঙ্গত, এ লেখায় উল্লিখিত পরিভাষার সঙ্গে অন্য কোনো কিতাবের বা ভাষ্যের বা বিবরণের মিল খোঁজা উচিত নয়। বাহ্যত মিল থাকলেও এসবের ঐকান্তিক পৃথগ্নতাকে পৃথক বিষয়ই ভাবা উচিত।

পন্ডিতরা কী বলে সে বিষয়ক পন্ডিতি তর্ক বা কুতর্ক আপাতত স্থগিত থাক, বরং হৃদয়ে গোলাপকলির মতো গেঁথে নেওয়া যাক ঐশী কিতাবের খোদায়ী তথা ‘অপৌরুষেয়’ বাণীমঞ্জুরী এতেই মঙ্গল, এতেই কল্যাণ, আর এতেই সওয়াব। পন্ডিতি তর্ক-বিতর্কে খুলিবর্তী তথা করোটিপূর্ণ সুখ বা প্রশান্তি থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু বেহেশতি খুশবুর নাগাল তাতে পাওয়া যাবে না ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু (ঈশ্বর) তর্কে বহুদূর’। কী লেখা ছিল ডেকালগে আর কী-ই বা লেখা ছিল হিত্তীয় বা মেসোপটেমীয় বিধানাবলিতে বা অভিসন্দর্ভগুলোতে (treaties) সেসবের তুলনামূলক আলোচনা বর্তমান নিবন্ধের বিষয় নয়। বরং দশ উপদেশাবলির বা টেন কমান্ডমেন্টসের কিছু নির্বাচিত কথা বা উপদেশ বা মান্যতার কথা স্মরণে রাখা যাক

Thou shalt not kill

(কাউকে হত্যা কর না)

Thou shalt not steal

(কারও কিছু চুরি কর না)

Thou shalt not bear false witness against thy neighbor

(প্রতিবেশী সম্পর্কে মিথ্যা সাক্ষ্য দিও না)

Thou shalt not covet your neighbor’s house

(প্রতিবেশীর বাড়িঘরের ওপর লোভ কর না)

Thou shalt not covet your neighbor’s wife, or his male or female servant, his ox or donkey, or anything that belongs to your neighbor

(প্রতিবেশীর স্ত্রীর প্রতি লোভ কর না, তার দাস/দাসীদের প্রতিও না, তার গরু/গাধার প্রতিও লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ো না; প্রতিবেশীর সহায়-সম্পদের প্রতিও না)

আরও উপদেশ আছে। যাই হোক, এসব উপদেশ আদিপুস্তকের সূত্রে নয়াপুস্তকে বা নববিধানে অর্থাৎ ইঞ্জিল শরীফে বা যিশুর ওপর নাজিল করা কিতাবে এবং কোরআরে অর্থাৎ মুহম্মদের (সা.) ওপর নাজিল করা কিতাবেও উনিশ-বিশ পার্থক্যে উল্লেখ করা আছে। মর্মমূলে এসব কথা তারও অনেক আগের সুমেরীয় কিতাবে বিশেষ করে হামুরাবির বিধানে বা নোয়াহর বিধানেও উল্লেখ করা আছে; যেহেতু আরব অঞ্চলের সব ধর্মই একসূত্রজাত। কিঞ্চিৎ পার্থক্যে বোঝদারদের হয়তো কিছু আসে যায় না, তবে যারা গোঁড়া তারা তুলকালাম বাঁধিয়ে দিতে পারে।

মুশির দশ উপদেশের কথা প্রায়শ জায়নবাদীরা এড়িয়ে যায়। যেমন- Thou shalt not kill, Thou shalt not steal, Thou shalt not bear false witness against thy neighbor, Thou shalt not covet your neighbor’s house এসব উপদেশে সব প্রতিবেশীকেই (আরব অথবা অনারব, ইসরায়েলি অথবা অ-ইসরায়েলি) মিলেমিশে থাকতে বলা হয়েছে, অন্যের বা প্রতিবেশীর বাড়িঘর বা সম্পত্তিতে লোভ করতে নিষেধ করা হয়েছে, তাদের হত্যা করতে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু জায়নবাদী ইহুদিরা কি সেসব কথা কানে তুলছে? তুলেনি। তাহলে ফিলিস্তিনি প্রতিবেশীদের তারা হত্যা করত না।

সব ইহুদিকে যদিও জায়নবাদী কর্মকান্ডের জন্য দায়ী করা চলে না। কিন্তু উগ্র ইহুদিবাদ বা জায়নবাদ এ আলোচনার বাইরে। কোনো ধর্মেই নৈতিক-আদর্শিক বিচারে উগ্রতাকে স্বাগত জানানো হয় না, অন্তত বৈশ্বিক পরিসরে ব্যপ্তি আছে যে ধর্মের। আজকাল প্রায় সব ধর্মই বহুজাতিক বা আন্তর্জাতিক; নিদেনপক্ষে বহুরাষ্ট্রীয়। কিন্তু এই বৈশ্বিক চওড়া পরিসরের চওড়া মানসিকতা কিছু কিছু ধর্মের বিশ্বাসীরা সম্ভবত ধারন করতে সক্ষম নয়, কাজে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তাদের মন স্থানিকতায় বা প্রাদেশিকতায় বা প্রভিন্সিয়ালিজমেই আটকে থাকে। এর বাইরেও থাকে কিছু সংকীর্ণ মানসিকতার লোক, রাজনৈতিক ছলচাতুরীর আশ্রয় নেয় তারা। ছলচাতুরী তাদের স্বভাব, তাদের পরম ধর্ম। তাদের অনুগত এবং অনুসারীদেরও এ রকম স্বভাব, যেমন আইএসআইএস।

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং স্বার্থান্বেষী রাজতন্ত্রী আরব রাষ্ট্রগুলো ছাড়া কেউ তাদের আমলে নেয় না, বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের বর্তমান দুর্গতির কালে। আইএস এ সময়ে ফিলিস্তিনিদের জন্য এক ফোঁটা চোখের পানি ফেলেছে এ কথা ইসরায়েলের চরম শত্রুও বলতে পারবে না। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে সংবেদনশীল হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা। তাদের মধ্যে খ্রিস্টান আছে, ইহুদিও আছে, মুসলিমও আছে, ধর্মে অবিশ্বাসীরাও আছে। তাদের সাধারণ বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে মানবতা। তাদের আপত্তির বিষয় হচ্ছে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ। তারা মুশির কথাই বলছে, বোধবুদ্ধিসম্পন্ন যে কোনো মানুষেরই তা বলা উচিত দাউ শ্যাল্ট নট কিল।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলিস্তিনপন্থি ছাত্রবিক্ষোভ চলছেই; নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না মার্কিন প্রশাসন। চলছে গণগ্রেপ্তার। আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গ্রিন পার্টির প্রার্থী জিল স্টাইনকে কোনো একটি বিক্ষোভে যোগদান করতে গেলে গ্রেপ্তার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতো গণতন্ত্রের গয়া-কাশিতে বিরোধী রাজনৈতিক দলের একজন নেতা বা নেত্রীকে গ্রেপ্তার করা আশ্চর্য ঘটনা বটে। এসব তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশের ফেনোমেনা বা প্রপঞ্চ হলেও হতে পারত। অথবা ‘কর্তৃত্ববাদের শিরোমণি’ রাশিয়া বা চীনে ঘটলে খুব সহজেই একটা যুক্তি দাঁড় করানো যেত।

সব যুক্তিরই একটা আদল বা কাঠামো থাকতে হয়, আর সেটা যদি না থাকে তাহলে আদলহীনতার যুক্তিদাতাকে ‘পাপী’ বলাই শ্রেয়। পাপীদের জন্যও বাণী আছে ‘প্রয়াগে মুড়িয়ে মাথা পাপী মরগে যথাতথা’। প্রসঙ্গত, ভারতে কেষ্টঠাকুরের সর্বাধুনিক চেলাকুঞ্জ ‘মোদিমা-লিক রাষ্ট্রসভা’র পৌরহিত্যে গণতন্ত্রের অর্থাৎ গণপতির পূজা এবং অর্চনা চলছে। জিল স্টাইনকে গ্রেপ্তারের পর মার্কিন মুল্লুকে গণতন্ত্রের ‘হরিবোল’ হয়ে গেছে। সো, লং লিভ ডেমোক্র্যাসি। অযথা মোদি সাহেব অথবা পুতিন সাহেব অথবা সর্বজনাব শি জিন পিংকে গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে দোষারূপ করে কী লাভ!

যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বদ্যিালয়গুলোতে কিন্তু গ্রেপ্তার-অভিযান চলছেই। চূড়ান্ত আগ্রাসী ভূমিকায় মার্কিন প্রশাসন তথা ব্র্যান্ডন প্রশাসন। বলাবলি হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ফিলিস্তিনপন্থি এ বিক্ষোভ গত শতকের ষাট দশকের ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভের স্মৃতিকে মনে পড়িয়ে দিচ্ছে। ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস থেকে জিল স্টাইনসহ প্রায় ৮০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সহস্রাধিক শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়েছে। কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের নির্যাতনের অভিযোগও উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন সময়ে অনেক বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। বর্ণবাদী বৈষম্য, বৈশি^ক উষ্ণায়ন কিংবা বন্দুকবাজির ঘটনার প্রতিবাদে মাঝেমাঝেই ছোটখাটো বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। এসব বিক্ষোভে মার্কিন প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াই দেখায়। কিন্তু এবার গাজায় ইসরায়েলি নৃশংসতার কারণে ৩৫ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট বিক্ষোভ কর্তৃপক্ষের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিউ ইয়র্কের মেয়র এরিক অ্যাডামস নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির বিক্ষোভকে ‘পেশাদার দুষ্কৃতির অস্থির কর্মকান্ড’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। শহর কর্তৃপক্ষ নিউ ইয়র্কের ওয়াশিংটন পার্ক স্কয়ার ঘেরাও করেছে, সেখানে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান নিয়েছে এবং তাদের দাবির কথাই বলেছে, যার মর্মার্থ ‘ইসরায়েল! দাউ শ্যাল্ট নট কিল, দাউ শ্যাল্ট না কভেট আদার’স ল্যান্ড।’ 

নিউ ইয়র্ক শহরের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ যুক্তরাষ্ট্রের ৪০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ইউরোপ-আমেরিকার ১৩টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সংবাদে বলা হয়েছে, বিক্ষোভকারীরা ক্যাম্পাসে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করছে। শিক্ষার্থীদেরকে আটক করা হয়েছে। জর্জিয়ার ইমোরি ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের ওপর রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসের গোলা ছুড়েছে পুলিশ। দর্শন বিভাগের প্রধান নো লি ম্যাকাফিকে গ্রেপ্তারের পর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। জিল স্টাইনের সহযোগী তাহলে আরও একজন আছেন। শিক্ষার্থীদের মারধর করার পাশাপাশি তাদের মাটিতে চেপে ধরার ঘটনাও ঘটেছে। এসব গণতন্ত্রের আরেক পূজারি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময়কার গত শতকের আটের দশককে মনে করিয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা দাবি করছে, তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো যেন ফিলিস্তিনের সংঘাত থেকে লাভবান সংস্থাগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে। প্রতিবাদের এই ঢেউ মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জন্য ব্যাপক রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।

তাহলে কি ইসরায়েল হতে পারে বাইডেনের ভিয়েতনাম! মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিক্ষোভরত ফিলিস্তিনপন্থি শিক্ষার্থীদের পক্ষে মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এ মন্তব্য করেন। মার্কিন কোনো বিক্ষোভ থেকে এতটা আশা করা যায় না। ষাটের দশকেও হয়নি এখনো হবে না বলা যায়। তবে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা তথাকথিত মূলধারার গণমাধ্যমের নির্লজ্জ উপায়ে মূক ও বধির হয়ে থাকার ভণিতার বাইরে গিয়ে জানতে পেরেছে যে, ফিলিস্তিনে বিশেষত গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে ইসরায়েল। এটা বন্ধ হোক দাউ শ্যাল্ট নট কিল, দাউ শ্যাল্ট নট কভেট। 

লেখকঃ সাংবাদিক

tarik69@gmail.com