মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞা পাওয়া প্রথম সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ (অব.)। আছে দুর্নীতি ও প্রতিষ্ঠানকে প্রভাবিত করার অভিযোগ

জানার বাকি অনেক প্রশ্নের উত্তর

সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ এবং তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনার ডালপালা ক্রমেই ছড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর বাংলাদেশ সফরে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করার পর এ ধরনের নিষেধাজ্ঞায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, আসলে ওয়াশিংটন-ঢাকা সম্পর্ক কোন দিকে গড়াচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এখন তারা শুধু বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায়। তাহলে এত বড় ধাক্কা কেন দিল?

এর সঙ্গে আবার এমন প্রশ্নও যুক্ত হয়েছে, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সেনাসদস্যদের যাওয়ার বিষয়ে কোনো নেতিবাচক সিদ্ধান্ত আসবে কি না।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র যেসব অভিযোগ তুলে জেনারেল আজিজের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, সেগুলোর দালিলিক প্রমাণ আছে কি নাএ প্রশ্নও উঠেছে। অভিযোগের তদন্ত তারা করেছে কি না বা করলেও কী প্রক্রিয়ায় করা হয়েছেএমন প্রশ্নের উত্তরও জানার আছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক তৎপরতা দরকার। আবার দায়মুক্তির জন্য জেনারেল আজিজকেও প্রমাণ করতে হবে যে, তার বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগ মিথ্যা।

সাবেক সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিরোধীপক্ষ সরকারের ওপর দায় চাপাচ্ছে। তবে সরকারের একাধিক মন্ত্রী বলেছেন, এর দায় আজিজ আহমেদের ব্যক্তিগত।

কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে অভিযোগ এনে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তা নিয়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বা বিরোধীপক্ষের খুশি হওয়ার কিছু নেই। এটি দেশের জন্য অবশ্যই কোনো ইতিবাচক ঘটনা হয়নি।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য, এ ঘটনায় সাধারণ নাগরিকদের শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন দেশের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দিয়ে থাকে।

তারা বলেন, শান্তিরক্ষা মিশনে সেনাসদস্যদের যাওয়ার বিষয়ে বিধিনিষেধ ঢালাওভাবে আসার কথা নয়। র‌্যাবের বিষয়টি আলাদা ছিল। র‌্যাব তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করেছে। র‌্যাবের বিষয়টি আলাদাভাবে দেখেছে দেশটি।

পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, জেনারেল আজিজের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞার কারণ জানিয়েছে। এর থেকে দায়মুক্তির পথ হলোতিনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার সুযোগ নিতে পারেন। আবার সরকারের পক্ষ থেকেও এটি খতিয়ে দেখা যেতে পারে। পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। গত ২১ মে সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ ও তার পরিবারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে দেওয়া নিষেধাজ্ঞায় বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। তাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেগুলোর দালিলিক প্রমাণ তাদের কাছে রয়েছে কি না কিংবা সেটি তারা কীভাবে তদন্ত করল তাও জানতে চাইতে পারে বাংলাদেশ।

তারা মনে করেন, আজিজ আহমেদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ফলে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের মর্যাদা ক্ষুণœ হয়েছে। বাংলাদেশের সেনাসদস্যদের জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে যাওয়ার সুযোগ সচল থাকা ও বন্ধ হওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কারও দুর্নীতির দায় তারা নেবে না। কিন্তু আলজাজিরা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের অভিযোগের মূল কারণ খতিয়ে দেখা দরকার।

রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পদ্মা সেতু প্রকল্পেও বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছিল। এ নিয়ে কানাডার আদালতে মামলা হয় এবং তদন্ত শেষে অভিযোগ খারিজ করে রায় দেয় আদালত। রায়ে বলা হয়, পদ্মা সেতু প্রকল্পে কোনো ধরনের ঘুষ লেনদেনের চেষ্টা হয়নি। জেনারেল আজিজও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পর বলেছেন, অভিযোগ সত্য নয়। তিনি এ প্রসঙ্গে তার কিছু মতামত দিয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদের (জানিপপ) প্রধান অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, তিনি তার জবাব দিয়েছেন। এই পরিবারটি রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সচেতন একটি পরিবার। আমি মনে করি, সরকারের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো ভালো। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা কেন দিল ওয়াশিংটন, তারা কী চায়, তাও জানা দরকার।’

তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি দেশে যেসব ঘটনা ঘটেছে, সবগুলোর সঙ্গে জেনারেল আজিজের ঘটনা মিলিয়ে ফেলা যাবে না। জেনারেল আজিজ তার পেশাগত জীবনে সফল এবং একজন যোগ্য ব্যক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে অনেক কিছু জড়িত। কূটনৈতিক রাজনীতিকেও বাদ দেওয়া যাবে না।’

কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র তার নীতিগত অবস্থান একই রেখে দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। এ ঘটনাটি দেশের জন্য কিছুটা হলেও নেতিবাচক। কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে তদন্ত করা যেতে পারে। নানা কারণে যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে চায়। আর এ ঘটনায় ডালপালা বাড়ছে, কারণে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে দেশের সেনাসদস্যরা সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। ফলে এটা আমাদের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’

তিনি বলেন, ‘ভূ-রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশ এখন গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। আমি খুব নেতিবাচক কিছু দেখছি না।’

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পরপরই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ। ঘটনার পরপরই গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘শাস্তি পাওয়ার মতো কোনো অপরাধ করিনি। আমি মনে করি এটা (মার্কিন নিষেধাজ্ঞা) সম্পূর্ণভাবে আমার জন্য প্রযোজ্য নয়।’