তিনি বাংলাদেশের প্রথম পুলিশপ্রধান যার সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। বেনজীর আহমেদকে মুখোমুখি হতে হচ্ছে দুদকের

পুলিশে অস্বস্তি শুদ্ধি অভিযানের চিন্তা

মেধাবী ও চৌকস পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন বেনজীর আহমেদ। ছিলেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি)। দায়িত্ব পালন করেছেন এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালকের। ছিলেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারও। এসব দায়িত্ব পালনের সময় অবৈধভাবে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় বিব্রত পুলিশ প্রশাসন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে তলব করায় পুলিশও আছে অস্বস্তিতে। পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, তারা বিশ্বাসই করতে পারছেন না বেনজীর আহমেদ এসব করতে পারেন। তবে এ নিয়ে কেউ মুখ না খুললেও অনেকেই বলেছেন পুলিশের বিরুদ্ধে এমনিতেই নানা অভিযোগ আছে। এখন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উচিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ ও তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা। তা না হলে পুলিশের বদনাম ঘুচবে না।

আগামী ৬ জুন বেনজীর আহমেদকে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তলব করা হয়েছে। আর ৯ জুন তার স্ত্রী ও তিন সন্তানকে ডেকেছে সংস্থাটি। গুঞ্জন উঠেছে, সপরিবারে বেনজীর আহমেদ দুবাই চলে গেছেন। তবে এর কোনো সত্যতা মেলেনি।

এদিকে, পুলিশের সাবেক আইজিপির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর নড়েচড়ে বসেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর। যেসব পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তাদের বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছে পুলিশ সদর দপ্তর। এমনকি শুদ্ধি অভিযান চালানোরও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলেছেন, অভিযোগ থেকে মুক্তি পেতে আইনের দ্বারস্থ হতেই পারেন বেনজীর আহমেদ। আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার আছে তার। পুলিশের আইজি হওয়ার আগে ডিআইজি এবং অ্যাডিশনাল আইজিপি হতে হয়েছে বেনজীর আহমেদকে। প্রতিটি পদে পদোন্নতি পেতে হলে চাকরিজীবনের শ্রেষ্ঠত্ব ছাড়াও, বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে তাদের চরিত্র ও কাজকর্ম বিশ্লেষণ করা হয়। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্য-উপাত্ত ও তথ্যবিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন দিয়ে সরকারকে সাহায্য করেছে, অবশ্যই এসব রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে তাকে আইজিপি পদে পদস্থ করেছেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা। তার কর্মকান্ড মনিটরিং করা উচিত ছিল। এখনো যেসব পুলিশ সদস্য আছেন, তাদের কর্মকান্ডও মনিটরিংয়ের আওতায় আনা জরুরি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পুলিশের কোনো সদস্য অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনে বিচারের বিধান থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা কার্যকর হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে ফৌজদারি অপরাধের বিচারও করা হয় বিভাগীয় আইনে। এ ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের ‘বিভাগীয় শাস্তির আওতায়’ আনার কথা বলে অপরাধ আড়াল করার অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত করে শাস্তি দেয় পুলিশ। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছেন। উন্নত বিশ্বে পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এলে আলাদা কমিশন করে তার বিচার করা হয়। ওইসব দেশের মতো বাংলাদেশেও এ ধরনের প্রথা চালু করলে পুলিশের অপরাধ অনেকাংশ কমে আসবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী, তিন মেয়ে ও এক স্বজনের নামে থাকা ৩৪৫ বিঘা (১১৪ একর) জমি ক্রোক বা জব্দের আদেশ দিয়েছে আদালত। একই দিন বেনজীর ও তার স্ত্রী-সন্তানদের নামে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে থাকা ৩৩টি ব্যাংক হিসাব (অ্যাকাউন্ট) অবরুদ্ধ করার আদেশ দেওয়া হয়। তা ছাড়া জীশান মীর্জার নামে থাকা মাদারীপুরে ২৭৬ বিঘা (৯১ একর) জমি এবং বেনজীর পরিবারের নামে থাকা গুলশানের চারটি ফ্ল্যাটও জব্দের আদেশ দেয় আদালত। বেনজীর পরিবারের নামে থাকা ১৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও তিনটি বিও হিসাব (শেয়ার ব্যবসা করার বেনিফিশিয়ারি ওনার্স অ্যাকাউন্ট) এবং ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র অবরুদ্ধ করার আদেশ দেওয়া হয়। সাভারে তাদের কিছু জমিও পড়েছে একই আদেশের মধ্যে। ইতিমধ্যে সম্পদ জব্দের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি ছিলেন বেনজীর আহমেদ। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার ও র‌্যাবের মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র‌্যাব এবং র‌্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দেয়, তাদের মধ্যে বেনজীর আহমেদের নামও ছিল। ওই সময় আইজিপির দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

পুলিশ সূত্র জানায়, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে শুরু করে পুলিশের সব কটি ইউনিটে এ নিয়ে আলোচনা চলছে। কনস্টেবলরাও এখন আলোচনা করছেন বেনজীরের দুর্নীতির বিষয় নিয়ে। প্রতাপশালী পুলিশের সাবেক এই কর্মকর্তার কর্মকান্ড নিয়ে নাখোশ হওয়ার পাশাপাশি বিব্রত অনেকেই। তবে বেনজীর আহমেদকে কেউ কৌশলে ফাঁসাচ্ছে কি না, তাও খতিয়ে দেখার কথা বলছেন কেউ কেউ।

নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেনজীর আহমেদের দুর্নীতির ঘটনায় তারা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন। দায়িত্ব পালনকালে তিনি এত সম্পদ গড়েছেন, তা বিশ্বাসই করতে পারছেন না তারা। এ নিয়ে তারা অস্বস্তিতে আছেন। এখন সময় এসেছে পুলিশের ভেতরে থাকা দুর্নীতিবাজদের লাগাম টেনে ধরা।

তারা জানান, বেনজীর আহমেদের ঘটনা নিয়ে কয়েক দিন আগে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একাধিক বৈঠক করেছেন। ইতিমধ্যে পুলিশের সব কটি ইউনিটপ্রধানদের নির্দেশনা পাঠিয়ে দুর্নীতিবাজ পুলিশ সদস্যদের ওপর কঠোর মনিটরিং করতে বলেছে পুলিশ সদর দপ্তর।

দুই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আইনের পোশাক পরে যারা অপরাধ করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে তারা।

পুলিশ সূত্র জানায়, নানা রকম অপরাধ কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছেন পুলিশের কতিপয় সদস্য। পেশাদার অপরাধীর মতোই মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন তারা। পুলিশের পোশাক পরেই করছেন এসব অপকর্ম। মাঝেমধ্যে ধরা পড়ছেন দু-চারজন, বাকিরা থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। অসাধু এসব পুলিশ সদস্যের আচরণ পুরো বাহিনীকে ইমেজ-সংকটে ফেলছে। আবার কারও কারও বিরুদ্ধে জোর করে অর্থ আদায়, জমি দখল, মাদক পাচার, পরকীয়া, ঘুষের বিনিময়ে পোস্টিং বাণিজ্য, টাকা না পেয়ে গ্রেপ্তারের হুমকি, যানবাহন আটকে অর্থ আদায়, সহকর্মীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ, চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণাসহ নানা অভিযোগ আছে। প্রতিদিনই আইজিপিসহ পুলিশের সব ইউনিটপ্রধানের কাছে অভিযোগ আসছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের ১৩ নভেম্বর সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক আইজিপি কমপ্লেইন সেল চালু করার পর থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে বেশি। পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় পুলিশ কর্মকর্তারাও অনেকটা বিব্রত। এই নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন আইজিপিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পুলিশের অপরাধ রুখতে প্রতিটি জেলায় গোয়েন্দাদের নিয়ে বিশেষ টিম গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জিরো টলারেন্সনীতি গ্রহণ করতে বলা হয়েছে বৈঠকে। ইতিমধ্যে জেলা পুলিশ সুপাররা টিম গঠনের কাজ শুরু করেছেন।

পুলিশ আইন অনুযায়ী, কোনো পুলিশ সদস্য অপরাধমূলক কাজে জড়ালে তার বিরুদ্ধে দুই ধরনের বিভাগীয় শাস্তির (লঘু ও গুরু) বিধান আছে। গুরুদণ্ডের আওতায় চাকরি থেকে বরখাস্ত, পদাবনতি, পদোন্নতি স্থগিত, বেতন বৃদ্ধি স্থগিত ও চাকরিকালীন সুযোগ-সুবিধা রহিত করা হয়। অপরাধ প্রমাণ হলে বরখাস্ত করা হয়। গুরুদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ আছে। ছোট অনিয়ম বা অপরাধের জন্য দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার, অপারেশনাল ইউনিট থেকে পুলিশ লাইনস বা রেঞ্জে সংযুক্ত করে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়। বিসিএস ক্যাডারের পুলিশ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ (শৃঙ্খলা ও আপিল) অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) থেকে তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ খতিয়ে দেখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগে একটি সেল রয়েছে।