নাটোরের সিংড়া উপজেলার মো. সাইফুল্লাহ (২০)। শুক্রবার (৩১ মে) তার মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা। নারায়ণগঞ্জের গ্রীন লাইন এজেন্সিকে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়েছেন। ওই এজেন্সির মালিক মো. আবু আজ তাকে টিকিট দেওয়ার আশ্বাস দেন। তার কথা মতো ভোরে বিমানবন্দরে আসেন তিনি। তারপর এজেন্সি মালিকের কাছে টিকিটের জন্য ফোন দেন। তখন মালিক তাকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলেন৷ একঘণ্টা পর ফের আবুর কাছে ফোন দিলে নম্বর বন্ধ পান। নিরুপায় সাইফুল্লাহ অসহায় অবস্থায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে টার্মিনাল-১ সামনে বসে থাকেন।
তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি ঋণ করে ওই এজেন্সিকে ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়েছি। এখন আমার সঙ্গে প্রতারণা করল। আমার ভিসা, পাসপোর্টসহ ওয়ার্ক পারমিট আছে। কিন্তু টিকেট নেই। আজ মালয়েশিয়া যেতে না পারলে আত্মহত্যা করব। তবুও বিমানবন্দর ছাড়ব না।
তার মতো ২৪ জন মালয়েশিয়াগামী কর্মী প্রতারণার শিকার হয়ে বিমানবন্দরে বসে আছেন। নারায়ণগঞ্জ গ্রীন লাইন এজেন্সি তাদের কাছ থেকে ৬ লাখ করে টাকা নিলেও টিকিট দেয়নি। ফলে তারা বিমানবন্দর ছেড়ে যাবেন না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
নাটোরের ইলিয়াস হোসেন নামের আরেক ভুক্তভোগী দেশ রূপান্তরকে বলেন, জীবনটা ধ্বংস করে দিল এই এজেন্সি। আমাদের সঙ্গে এমন প্রতারণা কেন করল৷ এর বিচার চাই আমরা।
এদিকে সকাল থেকেই মালয়েশিয়া যেতে বিমানবন্দরে ভিড় করছে হাজার হাজার মানুষ। যাদের অধিকাংশরই টিকিট হয়নি। দালাল ও এজেন্সি টাকা নিলেও তাদের টিকিট করেনি।
বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, গত ২১ মে পর্যন্ত প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ৮৩৪ জন কর্মীকে মালয়েশিয়া যাওয়ার অনুমোদন দেয়। ২১ মের পর আর অনুমোদন দেওয়ার কথা না থাকলেও বিএমইটির তথ্য বলছে, মন্ত্রণালয় আরও এক হাজার ১১২ জন কর্মীকে দেশটিতে যাওয়ার অনুমোদন দিয়েছে। অর্থাৎ বৃহস্পতিবার (৩০ মে) পর্যন্ত পাঁচ লাখ ২৪ হাজার ৯৪৬ জন কর্মীকে মালয়েশিয়া যাওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশটিতে চার লাখ ৯১ হাজার ৭৪৫ জন কর্মী মালয়েশিয়ায় গেছেন।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তথ্য বলছে, আজ বাংলাদেশ থেকে মাত্র এক হাজার ৫০০ জন কর্মী মালয়েশিয়ায় যেতে পারবেন। অর্থাৎ অনুমোদনকৃত ৩১ হাজার ৭০১ জন কর্মীর যাত্রা বাতিল হয়ে যাচ্ছে।
কুয়ালালামপুরের দুটি আন্তর্জাতিক বিমান টার্মিনালের ফ্লোরে গতকাল পর্যন্ত ১৪টি দেশ থেকে আসা প্রায় ২০ হাজার কর্মী অবস্থান করছিলেন। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার কর্মী বাংলাদেশের।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুক্রবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সাতটি ফ্লাইট মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যাবে। এর মধ্যে বিমান বাংলাদেশের দুটি, ইউএস-বাংলার দুটি, মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনসের একটি, এয়ার এশিয়ার একটি এবং বাতিক এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট মালয়েশিয়ায় যাবে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধের সময় ঘনিয়ে আসায় বাড়তি দামে টিকিট বিক্রির অভিযোগ করেছে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো। বিমান বাংলাদেশের বিশেষ ফ্লাইটের টিকিটের দামও এক লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগপ্রক্রিয়ার দুর্নীতি নিয়ে গত ২৮ মার্চ মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ সরকারকে চিঠি দেয় জাতিসংঘের চারজন স্বাধীন বিশেষজ্ঞ। তবে দুই দেশের সরকারই এই চিঠির কোনো উত্তর দেয়নি বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।
চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশি কর্মীদের জনপ্রতি সাড়ে চার থেকে ছয় হাজার ডলার পর্যন্ত নিয়োগ ফি দিতে হচ্ছে, যা ২০২১ সালে এই দুই দেশের মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) খেলাপ। ওই এমওইউ অনুযায়ী, এই ফি হবে ৭২০ ডলার পর্যন্ত।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা উভয় সরকারের কাছে এ বিষয়ে তদন্ত, অপরাধীদের বিচার এবং নৈতিক নিয়োগের নীতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চেয়েছেন। তবে ৬০ দিনের মধ্যে কোনো সরকার থেকে জবাব না আসায় এই চিঠি মানবাধিকার কাউন্সিলে উপস্থাপন করা হবে বলে জানানো হয়।