সরকার বিব্রত, প্রতিক্রিয়ায় সেটারই বহিঃপ্রকাশ

দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। সম্প্রতি সাবেক সেনাপ্রধান ও সাবেক পুলিশপ্রধানের দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন নিয়ে সারা দেশে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি, ভারতে খুন হওয়া এক সংসদ সদস্যের অবৈধ কর্মকান্ড নিয়েও অনেক খবর প্রকাশিত হচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী

দেশ রূপান্তর : সম্প্রতি সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ এবং সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদ নেতিবাচক খবরের শিরোনাম হচ্ছেন। তারা নেতিবাচক খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন আগেও। প্রশ্ন হচ্ছে, আগে তাদের বিষয়ে সরকার এক রকম প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, কিন্তু এবার অন্য রকম প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। সরকারের এই বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়াকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? 

ইফতেখারুজ্জামান : আমি মনে করি এ ক্ষেত্রে ঘটনাগুলো প্রকাশ পাওয়াতে সরকার বিব্রত হয়েছে, প্রতিক্রিয়া সেটারই বহিঃপ্রকাশ। বিব্রতবোধ থেকেই এই ধরনের প্রতিক্রিয়া করেছে বলে আমি মনে করি। কারণ এদের নিয়ে বিব্রত হওয়া ছাড়া তো উপায় নেই। যা কিছু ঘটেছে দুটি ক্ষেত্রেই কিন্তু সরকারের যোগসূত্র আছে। সেটা হচ্ছে এখানে শুধু দুইটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নয়, বাস্তবে চারটা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। একদিক থেকে সেনাবাহিনী, বিজিবি আবার অন্যদিকে পুলিশ এবং র‌্যাব তাদের শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত থাকা দুজন ব্যক্তি। যদিও তারা দুজনই এখন অবসরপ্রাপ্ত। দুটি ক্ষেত্রেই আরেকটা সামঞ্জস্য হচ্ছে যে ক্ষমতার প্রভাব এবং সেই ক্ষমতাটা কিন্তু উভয়ক্ষেত্রেই সরকার কর্র্তৃক নিয়োজিত অবস্থায় তারা ব্যবহার করেছেন। এছাড়াও সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য রয়েছে। কারণ উভয় ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে তাদের উত্থান, সংশ্লিষ্ট পদে নিযুক্তির বিষয়টা এর সঙ্গে বিবেচ্য। কাজেই এখানে ক্ষমতায় যারা অধিষ্ঠিত, অর্থাৎ সরকারের কিন্তু এখানে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।

দেশ রূপান্তর : প্রথম যখন অভিযোগ ওঠে বা খবর প্রকাশিত হয়, তখন তো তাদের একধরনের রক্ষা করার প্রয়াস দেখা গিয়েছিল। কিন্তু এবার সরকারের দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে বলা হয়েছে দুদক এবং সেনাবাহিনী অভিযোগগুলো দেখবে।

ইফতেখারুজ্জামান : এই ধরনের ঘটনায় অন্তত আমাদের দেশে কোনো সরকারের পক্ষেই দায় মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সমালোচনা সইবার যে সৎ সাহসিকতা বা নিজেদের ত্রুটি চিহ্নিত হলে সেটাকে মোকাবিলার যে সৎসাহস সেটা আমাদের রাজনীতির সংস্কৃতিতে নেই। কাজেই এ তথ্যগুলো যখনই প্রকাশিত হয় বা হয়েছে তখন একটা বিব্রতবোধ থেকে একটা অবস্থান নিতে দেখা যায়। এই দুজনের ক্ষেত্রে প্রথম অভিযোগ ওঠার পর আমরা দেখেছি সেটাকে বিপরীতমুখী করে দেখিয়ে একসময়ে অস্বীকার করা হয়। কিন্তু বর্তমানে আমরা দেখছি বিষয়টা অস্বীকার করা হচ্ছে না, কিন্তু দায়টা দুদক বা সেনাবাহিনীর ওপর অর্পণ করা হচ্ছে। সেটা অবশ্যই দুদক বা সেনাবাহিনীর ওপরেই অর্পণ করার কথা, ঠিক আছে। কিন্তু সেটি কতটুকু শুধুমাত্র দুদকের দায়িত্ব, কতটা কেবল সেনাবাহিনীর দায়িত্ব সেটা নিয়ে তো প্রশ্ন আছে।

দেশ রূপান্তর : এই দুই ঘটনার প্রভাব অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে কতদূর যাবে বলে মনে করেন?

ইফতেখারুজ্জামান : আন্তর্জাতিকভাবে কী হলো সেটা নিয়ে আমাদের খুব একটা উদ্বেগের বিষয় নেই। তবে উভয়ক্ষেত্রেই, উভয় প্রতিষ্ঠানের বিষয়েই আন্তর্জাতিক ভূমিকা আছে। তাছাড়া একটি প্রধান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুনামটা যেকোনো দেশের ক্ষেত্রে অপরিহার্য, আমাদেরও তাই। বিশেষ করে বাংলাদেশ যেহেতু পিস কিপিংয়ে অংশগ্রহণ করে। সেটাতে পুলিশের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম হলেও সেনাবাহিনীর ভূমিকা ও অংশগ্রহণ সেখানে আরও বেশি। উভয় ক্ষেত্রেই এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি সম্পর্কে নেতিবাচক তথ্য প্রকাশ পেল। যদিও প্রথম স্যাংশনের কারণ ছিল মানবাধিকার লঙ্ঘন। উভয়ক্ষেত্রেই কিন্তু চিত্রটা একই। তথ্যগুলো আন্তর্জাতিকভাবে বিব্রতকর এবং শুধুমাত্র তথ্য প্রকাশিত হয়েছে তাই নয় এর পরবর্তী সময়ে স্যাংশন হয়েছে, সে কারণে আরও বেশি বিব্রতকর। কিন্তু এটার কারণে আমাদের দেশের সঙ্গে বিদেশি দেশের সম্পর্কের অবনতি হবে সে রকম আমি মনে করি না। এটা আমাদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিব্রতকর। এই ধরনের সংস্থাগুলোতে শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিতদের ক্ষমতা ব্যবহারের এক ধরনের স্বাভাবিকতা দেখা যায়, যা নতুন নয় সেটা দেশবাসীও জানে। কিন্তু এটা এমনভাবে প্রকাশিত হয়েছে যে, দেশবাসী যেটুকু জানে ভলিউমটা তা থেকে অনেক বড়। বড় বললেও কম বলা হবে। একই সঙ্গে বলব যে, এগুলো কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এখানে যে শুধুমাত্র এই দুটি ঘটনাই বিরাজ করছে সেটা বলাটাও সঠিক হবে না। পাশাপাশি, উভয়ক্ষেত্রে একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় তারা কোনো অবস্থায়ই এককভাবে এসব কাজ করেননি। তাদের সহায়ক শক্তি ছিল বা আছে, সুযোগ সৃষ্টিকারী ছিল, তাদের সুরক্ষাকারী ছিল যারা ক্ষমতা বলে লাভবান হচ্ছিলেন তারা এসব করছিলেন। এই জিনিসগুলো এখন দেশবাসী উপলব্ধি করছে।

দেশ রূপান্তর : বর্তমানে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে যারা আছেন তাদের ওপর কি এর প্রভাব পড়বে?

ইফতেখারুজ্জামান : তাদের জন্য যে বার্তাটা আমি যেটা বলতে চাচ্ছি একদিকে যেমন দেশবাসী ইন্টারনেটের মাধ্যমে যা জানত বা ধারণা করত সেই তথ্যই প্রকাশিত হয়েছে। আর সরকারও বিব্রত হয়েই বিভিন্ন কথা বলছে। সে কারণেই কিন্তু দেশবাসীর প্রত্যাশা যে এ দুটি ঘটনায় কোনোভাবে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা হবে। তাই যদি হয় এটা কতটুকু হবে, সেটা আলোচনা করতে পারি। যদি হয় তাহলে সেটা অন্য যারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বা যারা পদে আছেন তাদের জন্য একটা স্ট্রং মেসেজ হবে। যেটা আমাদের সমাজে নেই ক্ষমতাধর লোক হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকলে, অনিয়ম করলে, দুর্নীতি করলে, ক্ষমতার অপব্যবহার করলে বিচারের সম্মুখীন হতে হয়, জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হয়। এই বার্তাটার প্রয়োজন আছে। একইভাবে এই সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে সরকারের হাতে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হাতে বিরাট সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে জবাবদিহি সৃষ্টির। এখন কতটুকু পারবে বা সম্ভব হবে সেটা আমি জানি না। তবে, সুযোগ সৃষ্টির এই ব্যাপারে আমি কিছুটা হলেও আশাবাদী। তার কারণ সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারে স্পষ্ট ঘোষণা আছে। কিন্তু বাস্তবতা তো অত্যন্ত কঠিন। সেটা একটু আগে বললাম, যে অপরাধগুলো সংঘটিত করতে সেখানে এককভাবে কোনো ক্ষমতাধর ব্যক্তি নয় এরমধ্যে যোগসাজশকারী, সুযোগ সৃষ্টিকারী, সুরক্ষাকারী অনেকেই ছিলেন। যে কারণে শেষ পর্যন্ত আমরা ন্যায়বিচার বলতে যা বোঝায় সেটা পাব, নাকি সিম্বলিক কিছু হবে, নাকি লোক দেখানো কিছু দৌড়ঝাঁপের পর ফোকাস চাপা পড়ে যায় কি না দেখতে হবে।

দেশ রূপান্তর : জাতীয় নির্বাচনের আগে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে এক রকম আলোচনা ছিল এবং নির্বাচনের পরে সেটা অন্য রকম ভাবা হচ্ছিল। কিন্তু সাবেক সেনাপ্রধানের ওপর নিষেধাজ্ঞায় ফের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। এটা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী? 

ইফতেখারুজ্জামান : যেকোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতি, বৈদেশিকনীতি কিন্তু তাদের জাতীয় স্বার্থের প্রতিফলন। আমরা বাইরের দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কী চাই? আমরা চাই নিজেদের স্বার্থটা বাস্তবায়ন করতে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রও তাই করবে। বাংলাদেশের মতো দেশের সঙ্গে কী কী মানদন্ডের ওপর তাদের পলিসি তৈরি হয় সেটা দেখার বিষয়। বিজনেজ আছে, ইনভেস্টমেন্ট আছে, তাদের বিভিন্ন রিলেশন আছে, রিজিওনাল ইন্টারেস্ট আছে, নিজস্ব স্ট্র্যাটেজিক ইন্টারেস্ট আছে, এর পাশাপাশি আইনগতভাবে মানবাধিকারের প্রতি তাদের কমিটমেন্টের একটা বিষয় আছে।  এগুলোর সংমিশ্রণে এটা হয়। সে কারণেই কোনো কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রসহ, ইউউ, পশ্চিমারা নির্বাচন নিয়ে কথা বলে। কিন্তু মোটা দাগে, নির্বাচনকেন্দ্রিক আচরণের ক্ষেত্রে এদেশের মানুষ যেটা চেয়েছিল সেটাই হয়তো যুক্তরাষ্ট্র অন্যভাবে বলেছিল। কিন্তু আমার বিবেচনায় তারা কী বলল তাতে কিছু আসে যায় না, বাংলাদেশের মানুষ কী চায় সেটার প্রতিফলন ঘটেছে কি না নির্বাচনে সেটাই দেখার বিষয়। সেই বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রাকনির্বাচনী অবস্থানটা ছিল তাদের রাষ্ট্রীয় নীতিমালার প্রতিফলন, এর বাইরে কিছু না। কিন্তু অনেকেই এ রকম আশা করেছিল যে এটার মাধ্যমে বাংলাদেশে একটা চেঞ্জ চলে আসবে। না হলে, মানে যুক্তরাষ্ট্রের মনমতো না হলে তারা কিছু একটা করে ফেলবে; যারা এটা চিন্তা করেছে তাদের জন্য এটা একটা বিরাট সমস্যার কারণ হয়েছে। আমি কিন্তু কখনই বিশ্বাস করিনি। যেকোনো দেশেরই একটা লিমিটেশন আছে, যার বাইরে তারা যেতে পারে না বা যাবে না। ওরা তাদের প্রত্যাশা পূরণের জন্য কিছুটা দৌড়ঝাঁপ করেছে, যেটা দৃষ্টিকটু ছিল। আমি সবসময়ই মনে করেছি নির্বাচন শেষ হয়ে যাবে এরপরে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্য দেশগুলো যারা নির্বাচন সুষ্ঠু হোক এই দাবি করে এসেছে, তারা নতুন সরকারের সঙ্গেই তাদের বিজনেস শুরু করবে, আগেও যেমন হয়েছিল। কারণ তাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার্থে এই সরকারের সঙ্গে কাজে আপত্তি নেই। আরেকটা বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা দেশগুলো কৌশলগতভাবে চায়, এমনকি আমাদের প্রতিবেশী ভারত এদের সবারই প্রত্যাশা বাংলাদেশের টেরিটোরিতে যেন কোনোভাবে মৌলবাদ, উগ্রবাদের উত্থানের সুযোগ না হয়। এটাতে তাদের ইন্টারেস্ট আছে। সেই অর্থে আমি যেটা মনে করি এখানে যে রাজনৈতিক দল বা যদি রেজিমও বলি- যারা তাদের ওই ইন্টারেস্ট পুরণ করবে, তাদেরকেই তারা পছন্দ করবে। এই ফ্যাক্ট কেউ পছন্দ করুক বা না করুক, আমাদের যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো আছে তার মধ্যে ক্ষমতাসীনরা বেশি গ্রহণযোগ্য। এটাই বাস্তবতা।

দেশ রূপান্তর : দীর্ঘসময় ধরে পার্বত্য অঞ্চলের সাবেক এক সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে সরাসরি ড্রাগ কার্টেলে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে। সমালোচনাটা এমন পর্যায়ে গেছে যে তখন তাকে মনোনয়ন না দিয়ে তার স্ত্রীকে দিল। কিন্তু কার্যত ক্ষমতা তার হাতেই থেকে গেল। তারপর আমাদের ব্যাংকিং সেক্টরের অবস্থা নিয়ে তো অভিযোগের শেষ নেই। এ নিয়ে কথা উঠলেই বেসিক ব্যাংকের কথা আসে এবং যে নামটা সবার সামনে আসে তিনি তো এক রকম দায়মুক্তি নিয়েই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না কেন?

ইফতেখারুজ্জামান : এটা দুর্ভাগ্যের বিষয় যে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিশেষ করে সাম্প্রতিককালে, বলতে গেলে রাজনীতির সঙ্গে ব্যবসা, তার সঙ্গে মানি এবং মাসল ওতপ্রোত জড়িত হয়ে গেছে। এমনভাবে সম্পর্কটা জড়িয়ে গেছে যে, যেটা ব্যবসা সেটাই রাজনীতি। স্বাধীনতার পরে প্রথম জাতীয় সংসদের জনপ্রতিনিধির মধ্যে ব্যবসায়ী ছিলেন ১৭.৫ শতাংশ কিন্তু বর্তমান সংসদে সেটা ৬৫.২ শতাংশ। এটা বিশাল পরিবর্তন। যারা ব্যবসায় যুক্ত তারা রাজনীতিতে আসবেন, সেটাতে স্বাভাবিকভাবে বাধা দেওয়ার কিছু নেই। বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে, এই যে রাজনীতিতে ব্যবসা এবং মুনাফা রাজনীতির মধ্যে মুনাফা অর্জনের যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে সেটা কি স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় হয়েছে কি না।  রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের অনুপ্রবেশ কি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হয়েছে, নাকি অর্থ এবং পেশিশক্তির বলে হয়েছে! যে দৃষ্টান্তগুলোর কথা আপনি বলেছেন সেগুলোতে হয় অর্থ অথবা পেশি অথবা অর্থ ও পেশি দুটোর সংমিশ্রণে হয়েছে। আলোচিতদের বাইরেও, রাজনৈতিক পরিম-লেই এটা এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। উচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত মনে করা হচ্ছে রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পারলেই আমি এক ধরনের লাইসেন্স পেয়ে যাব নিজের সম্পদ বিকাশের। সেই কারণে রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে প্রকটভাবে। এখন এমন এক ধরনের অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে যে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো চাইলেও এর থেকে বের হয়ে আসার সুযোগটা তাদের কাছ থেকে হাতছাড়া হয়ে গেছে। নারকোটিকস থেকে শুরু করে আর্থিক খাত বা বড় যে কোনো সহিংসতা, সাম্প্রতিক এক সাংসদের ভারতে খুন হওয়া প্রতিটা ক্ষেত্রেই মূলত ব্যবসার সঙ্গে রাজনীতি। কুয়েতে একজন সাবেক সাংসদ মানবপাচারের দায়ে সাজা খাটছেন। কিন্তু দেশে থাকলে বাস্তবে তার শাস্তি হতো কি না সেখানেও প্রশ্ন আছে। এগুলো হচ্ছে মোটামুটি রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের নেতিবাচক প্রভাব। রাজনীতিতে, শাসন প্রক্রিয়ায়, সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে, সামাজিক সংস্কৃতিতে এমনকি আমাদের যে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মধ্যেই এটার প্রভাব প্রকটভাবে দাঁড়িয়েছে।

দেশ রূপান্তর : কিন্তু তাদের জনপ্রিয়তার কথা তো বললেন ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক। দুর্বৃত্তদের জনপ্রিয়তার বিষয়টা কীভাবে দেখছেন?

ইফতেখারুজ্জামান : এটা যিনি বলছেন, তিনি যেহেতু দলের একটা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছেন, আমি কোনো ব্যক্তির মন্তব্য হিসেবে দেখছি না। কিন্তু ওই যে আগেই বললাম একটা বিব্রতকর অবস্থান থেকে বিভ্রান্তিমূলক প্রতিক্রিয়া আসছে, এই মন্তব্যও এর বাইরে কিছু না। কারণ এই কথাটার মধ্যেই প্রশ্নটা আছে। জনপ্রিয়তার মানদণ্ডটা কোথায়? বলা হচ্ছে যে, তিনি কোনো অপরাধে জড়িত বা জড়িত নন সেটা মুখ্য নয়, জনপ্রিয়তা মুখ্য। তাহলে কি আমরা জনপ্রিয়তাটাকে অপরাধের মানদণ্ডের বাইরে বিচার করব? এটা তো হয় না। আমি বলব রাজনীতিতে অর্থ এবং পেশির প্রভাব মেনে নেওয়ার প্রতিফলনই হচ্ছে এই মন্তব্যটা করা।

দেশ রূপান্তর : একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। সর্বশেষ এমপি খুন হওয়ার ঘটনাসহ বিভিন্ন সময়ে পুলিশ যেভাবে অপরাধের বর্ণনা দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এবং বিভিন্ন ইস্যুতে, সেটা হোক তারকাদের পারিবারিক বিরোধ কিংবা ভাইরাল ব্যক্তির কোনো ইস্যু পুলিশ কর্মকর্তারা যেভাবে মিডিয়ামুখী হয়ে পড়ছেন এই বিষয়টা কীভাবে দেখছেন?

ইফতেখারুজ্জামান : এটা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কাছ থেকে কোনোভাবেই প্রত্যাশিত না। তারা এভাবে সংবাদ সম্মেলন করার একটা সংস্কৃতি চালু করেছে, মোটামুটি প্রতিষ্ঠাই করে ফেলেছে। এটা আইনের লঙ্ঘন বলা যায়। এখানে জনপ্রিয়তা এবং লোক দেখানোর এবং আমরা অনেক কিছু করছি এমন প্রচারের বিষয় আছে। কিন্তু যেই জিনিসটা তারা অবজ্ঞা করেছে, সেটা হচ্ছে যে এই প্রতিটা ঘটনাই কিন্তু বিচারাধীন বিষয়। একটা অবস্থান নিয়ে তারা যখন ঘটনাটা প্রকাশ করেন, সেটা জনগণের মধ্যে একরকম প্রতিষ্ঠা পায়; যা ট্রায়াল প্রসেসকে একধরনের ইনফ্লুয়েন্স করে। এটা আইনগতভাবে কোনো সংস্থা করতে পারে না। কিন্তু আমাদের দেশে সেটা হরহামেশাই করা হচ্ছে। এটা খুবই অগ্রহণযোগ্য একটি বিষয়। তথ্য প্রকাশ করার ক্ষেত্রে কতগুলো মানদণ্ড রয়েছে। এমনভাবে প্রকাশ করা ঠিক না যেটা পক্ষপাতিত্ব করতে পারে বা বিচারিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। এখানে সবাই আবার এসব করছে না। এর মাধ্যমে লোক দেখানোর একটা বিষয় আছে।

দেশ রূপান্তর : যেসব পরিস্থিতি নিয়ে আমরা আলোচনা করলাম সেটা কি সুশাসন আর জবাবদিহির অভাবের ফল? অনেকের কথায় এ রকম মনে হয় যে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এগুলোর সমাধান হয়ে যেত। আপনার কী মনে হয়?

ইফতেখারুজ্জামান : নির্বাচন তো আর গণতন্ত্র না। নির্বাচন হচ্ছে গণতন্ত্রের একটা স্টেপ মাত্র। বাংলাদেশ ফরচুনেটলি এমন একটা দেশ যেটা অনেক কারণে বিরল, ঐতিহাসিকভাবেই। আমাদের গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে, আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি, দেশ স্বাধীন করেছি রক্তের বিনিময়ে। পাশাপাশি নির্বাচনে জনগণের রায়ের যে পাওয়ার সেটার বিশাল ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ’৭০-এর নির্বাচনে জনগণের রায় তারা মেনে নেয়নি, এর প্রতিবাদ কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত গড়িয়েছে। এর মধ্যে অন্য কিছু অবশ্যই ছিল, কিন্তু জনগণের নির্বাচনী রায় না মানার বিষয়টা সামনে ছিল। এই দেশেই আবার, ৫৩ বছর পর, নির্বাচন শব্দটার ওপরে মানুষের আস্থা টোটালি হারিয়ে গেল। যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। কাজেই যেভাবেই হোক নির্বাচন ও মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনতে হবে। তার মানে কিন্তু এটা নয় যে নির্বাচন করলেই গণতন্ত্র হয়ে গেল। দুর্ভাগ্যের বিষয় যে আমাদের দেশে নব্বইয়ের পরপরেই যেটা হয়েছে সেটা হচ্ছে আমাদের ক্ষমতায় থাকতে হবে, ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি এটাকে কেন্দ্র করেই সবকিছু হয়েছে। ফলে যেটা হয়েছে যে নির্বাচনে জিততে হবে, ক্ষমতায় থেকে যাব এবং এজন্য রাজনৈতিক এবং গভর্নেন্সের যে স্পেসগুলো আছে সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, একচ্ছত্র করতে হবে। সহায়ক হিসেবে সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে হবে দলীয়করণের মাধ্যমে। সেটি যেকোনো প্রতিষ্ঠানই হোক। যার ফলে আমরা এমন একটা পরিবেশের দিকে আস্তে আস্তে ধাবিত হচ্ছি যে আমাদের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ, নির্বাচন তো অবশ্যই, সার্বিকভাবে যেই স্বপ্ন নিয়ে আমাদের স্বাধীনতা সেটা এখন বড় ধরনের ঝুঁকির সম্মুখীন। সবচেয়ে বেশি কঠিন চ্যালেঞ্জ আমরা তৈরি করে ফেলেছি এই অর্থে যে প্রতিষ্ঠানগুলোর জনগণের কাছে জবাবদিহির জন্য সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত, সেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কিন্তু একেবারে ডিসফাংশনাল বা অকার্যকর করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে মানবাধিকার বলি, বাকস্বাধীনতা বলি, মৌলিক স্বাধীনতা বলি, গণতন্ত্রের চর্চার কথা বলি বা ন্যায়বিচারের কথা বলি সবই কিন্তু এখন করুণ অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। এর ফলে এদেশের বড় ধরনের সংকটময় একটা অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। যদি কোনোভাবে আমাদের দেশে এমন একটা নেতৃত্ব পাই বা বর্তমান নেতৃত্ব যদি মনে করে যে যথেষ্ট হয়েছে, আমরা এখন প্রতিষ্ঠানগুলো রি-বিল্ড করব, তাহলে কিন্তু হয়। কারণ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দলীয়করণ-কেন্দ্রিক অকার্যকরতা বিরাজ করছে। এই জায়গা থেকে উত্তরণের জন্য একটা বিশাল পরিবর্তন দরকার। সেই পরিবর্তনটা শুরু করতে যে প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সেটা হলো রাজনৈতিক দল। আমাদের দেশের সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা করতে হবে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে হবে যে আমরা যে রাজনীতি করছি এটা কি জনস্বার্থকেন্দ্রিক আছে? এই প্রশ্নটা যদি তারা শুরু করে তাহলে অবশ্যই তারা পারবে। কোনো দেশেই রাজনৈতিক সংস্কার রাজনৈতিক অঙ্গনের বাইরে থেকে হয় না, এটা রাজনৈতিক অঙ্গনের ভেতর থেকে হতে হবে। আমরা যেসব আলোচনা করলাম এর সবকিছুর কেন্দ্রে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জটার মোকাবিলা আমাদের রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে এবং এই দায়িত্বটা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে নিতে হবে।

দেশ রূপান্তর : সময় দেওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

ইফতেখারুজ্জামান : আপনাকেও ধন্যবাদ।

অনুলিখন : মোজাম্মেল হক হৃদয়