দেশে ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো ৪ হাজার ১৮০টি জেনেরিকের ৩৫ হাজার ২৯০টি ব্র্যান্ডের ওষুধ উৎপাদন করে। এর মধ্যে মাত্র ১১৭টি জেনেরিকের ওষুধের মূল্য সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। বাকি ৪ হাজার ৬৩ জেনেরিকের ওষুধের মূল্য ঠিক করে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। সরকারের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় কোম্পানিগুলো বিভিন্ন অজুহাতে দাম বাড়িয়ে চলছে। অপরদিকে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের বেঁধে দেওয়া ১১৭টি ওষুধের অধিকাংশই এখন চিকিৎসকরা লিখেন না, রোগ ও এর ধরন পরিবর্তনের কারণে বিকল্প ওষুধ লিখতে হচ্ছে।
এছাড়া তালিকা থেকে কমপক্ষে ৬০ শতাংশ ওষুধ তৈরির বাধ্যবাধকতা কোম্পানিগুলোর ওপর থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠান এসব ওষুধ তৈরি করছে না। আবার তালিকায় থাকা অনেক ওষুধ এখন চিকিৎসকরা না লিখে একই জেনেরিকের অন্য ওষুধগুলো লিখছেন।
গত ২৯ এপ্রিল ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেছে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। রিটের পর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের সব ধরনের ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি রোধকল্পে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয় আদালত।
ওষুধ বিক্রেতা ও রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি বছর ধাপে ধাপে ওষুধের দাম বেড়েছে। বাজারে বহুল বিক্রি হওয়া ৫০ ধরনের ওষুধের দাম সর্বোচ্চ ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। দামবৃদ্ধির তালিকায় ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ক্যানসারের মতো জটিল ওষুধের নাম যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে জ্বর-সর্দির ট্যাবলেট-ক্যাপসুল ও সিরাপের দামও। সরকার যে ১১৭টি ওষুধের দাম বেঁধে দেয় তার মধ্যে হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য নিফিডিপিন নাম লেখা আছে। কিন্তু বর্তমানে এর পরিবর্তে অ্যামলোডিপিন জেনেরিকের ওষুধের সুপারিশ করছেন চিকিৎসকরা। ফলে রোগীদের অতিরিক্ত দামেই ওষুধ কিনতে হচ্ছে। একইভাবে ক্লক্সাসিলিন অ্যান্টিবায়োটিক ট্যাবলেটের পরিবর্তে ফ্লুক্লক্সাসিলিন, অন্যান্য ওষুধের মধ্যে ডায়াজিপামের পরিবর্তে ক্লোনাজিপাম, থায়োপেনটালের পরিবর্তে প্রোপফল (ইনজেকশন) ব্যবহার হচ্ছে। শুধু তাই নয় এই তালিকায় থাকা অধিকাংশ ওষুধই এখন রোগীদের অগ্রাধিকার তালিকায় নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ আইন দিয়েই দেশের ওষুধ শিল্প চলছিল। ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে ১৯৮২ সালে ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়। অধ্যাদেশের ১১ ধারার ১ উপধারা অনুসারে, যে কোনো ওষুধের বিক্রয়মূল্য সরকার গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রকাশ করবে। ফলে ইচ্ছেমতো দাম বাড়ানোর সুযোগ ছিল না কোম্পানিগুলোর হাতে। কিন্তু ১৯৯৪ সালে তৎকালীন সরকার ১১৭টি জেনেরিকের ওষুধের তালিকা প্রণয়ন করে মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। এই তালিকার বাইরে সব ওষুধের দাম নির্ধারণ করার দায়িত্ব দেওয়া হয় সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে। ফলে তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করছে। এরপর কেটে গেছে ৩০ বছর। কিন্তু সরকার ওষুধের তালিকার হালনাগাদ করেনি। দিনে দিনে ওষুধের বাজার বড় হয়েছে, মানুষের নতুন নতুন রোগ দেখা দিয়েছে কিন্তু সরকার সেই ওষুধগুলোর মূল্য নির্ধারণ করেনি।
একসময় আমাদের দেশের ৯০ শতাংশ ওষুধই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো। অথচ বর্তমানে দেশে উৎপাদিত ওষুধ ১৫৭টি দেশে রপ্তানি হয়। দেশের মোট চাহিদার ৯৮ শতাংশ ওষুধ এখন দেশেই উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে ওষুধের বাজার প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার। চলমান বাস্তবতায় সরকার ওষুধ ও কসমেটিকস আইন ২০২৩ সংসদে পাস করেছে। এই আইনের ৩০ (১) (২) ধারায়ও বলা হয়েছে শুধু গেজেটে প্রকাশিত তালিকাভুক্ত ওষুধগুলোর খুচরা মূল্য সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দাম বাড়িয়েই চলেছে ওষুধ কোম্পানিগুলো।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওষুধ ও কসমেটিকস আইনের খসড়া তৈরির সময় ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সরকারের হাতে ফিরিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ওষুধ শিল্প মালিকদের নানা তৎপরতায় তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। নতুন আইনেও তালিকাভুক্ত ওষুধগুলোর খুচরা মূল্য সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে বলা হয়েছে। তবে এখানে ইতিবাচক দিক হচ্ছে তালিকায় নতুন ওষুধের নাম যুক্ত করার সুযোগ আছে। বাজারে বিক্রি হওয়া ওষুধের ৩ ভাগের ২ ভাগের দাম যদি সরকার বেঁধে দেয় তাহলে রোগীরা স্বস্তি পাবে। এতে খরচের বোঝা কমে আসবে মানুষের, আবার ওষুধের দামও নিয়ন্ত্রণ হবে।
বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির কোষাধ্যক্ষ ও হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হালিমুজ্জামান বলেন, ১১৭টি তালিকাভুক্ত ওষুধই দরকারি। এসব ওষুধের দাম না বাড়ানোয় কোম্পানিগুলো উৎপাদন করছে না। যারা করেছে, তাদের ৭০-৮০ শতাংশ লোকসান দিয়ে বিক্রি করতে হয়েছে। এ কারণে এসব দরকারি ওষুধ ভারত থেকে পাচার হয়ে দেশে আসছে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সদ্য সাবেক উপপরিচালক ও আইন কর্মকর্তা ড. মো. নূরুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওষুধ ও কসমেটিকস আইন ২০২৩ এর ৩০ (১) (২) ধারা অনুযায়ী শুধু গেজেটে প্রকাশিত তালিকাভুক্ত ওষুধগুলোর খুচরা মূল্য সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। এখন এই তালিকায় যদি ৩ ভাগের ২ ভাগ ওষুধের দাম বেঁধে দেওয়া যায় তাহলে খুব ভালো হয়। এটা করতে হলে সরকারকে কঠোর হতে হবে। সদিচ্ছা থাকলে ওষুধের দাম কমাতে পারে কোম্পানিগুলো। কোম্পানিগুলো মোড়কের চাকচিক্য পরিহার করে ওষুধের দাম কমাতে পারে। হাসপাতালসহ বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১০০ বক্সের পরিবর্তে ১০০০ ট্যাবলেট/ক্যাপসুলের টিন বা প্লাস্টিক কনটেইনারে সরবরাহ করা হলে প্যাকেজিং খাতে খরচ কমে যাবে। ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে চিকিৎসকদের কাছে কোম্পানি উৎপাদিত ওষুধের প্রচার চালালে মার্কেটিং খরচ কমবে।
জনস্বাস্থ্যবিদরা মনে করেন, ওষুধ মানুষের জীবন রক্ষাকারী উপাদান। ওষুধ শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের ব্যবসায়িক মনোভাবের কারণে তারা উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক বেশি দামে ওষুধ বিক্রি করছেন। তাদের কাছে সেবার চেয়ে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যই মুখ্য। ঔষধ প্রশাসন কিংবা সরকার যাতে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ না করে কোম্পানিগুলোর হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় সে জন্য তারা প্রচুর বিনিয়োগ করে। সরকার যে ১১৭টি ওষুধের দাম বেঁধে দিয়েছে কোম্পানিগুলো সেই ওষুধ উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে এটা যেমন সত্য তেমনি এটাও সত্য যে সাড়ে ৪ হাজার জেনেরিকের মধ্যে ১১৭টার দাম বেঁধে দেওয়া একটা শুভঙ্করের ফাঁকি মাত্র। উৎপাদন খরচ সার্বিক ব্যয়ের হিসাব বিবেচনা করে সরকারের উচিত ওষুধের দাম বেঁধে দেওয়া।
তারা বলেন, কোম্পানিগুলো নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। নিজেদের ওষুধ লিখতে তারা চিকিৎসকদের প্রভাবিত করতে বিভিন্ন ধরনের নৈতিক-অনৈতিক সুবিধা দিয়ে থাকে। তাছাড়া ওষুধ কোম্পানি যেহেতু বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রচার করতে পারে না তাই তারা মার্কেটিংয়ে লোক নিয়োগ করে প্রচুর টাকা খরচ করে। আর এসব কিছুর হিডেন চার্জ গিয়ে পড়ে গরিব রোগীদের ওপর। উন্নত বিশ্বের মতো ট্রেড নামের পরিবর্তে জেনেরিক নাম (সব কোম্পানির ওষুধের একই নাম হবে) প্রেসক্রিপশনের নিয়ম করা যেতে পারে। এতে অসুস্থ মার্কেটিং প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে। তখন দাম অনেকাংশে কমে যাবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের দেশে একজন রোগীকে চিকিৎসার পেছনে যদি ১০০ টাকা খরচ করতে হয় তবে ৬৪ টাকা খরচ হয় ওষুধের পেছনে। ওষুধের দামের পেছনে অরাজকতা চলছে। যারা ওষুধ তৈরি করে ও আমদানি করে তারা বিপুল মুনাফা করছে। ফলে মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বেড়েই চলছে। আমাদের মতো দেশে সবদিক বিবেচনা করে সরকারের উচিত ওষুধের দাম বেঁধে দেওয়া।