পিকে-বাচ্চুর দেখানো পথেই বেনজীর!

কয়েকটি আর্থিক খাতকে পথে বসিয়ে প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পিকে হালদার সারা দেশে আলোচনার ঝড় তুলে ২০১৯ সালে ২৩ অক্টোবর আকস্মিক ভোজবাজির মতো হাওয়ায় মিলিয়ে যান। এর প্রায় আড়াই বছর পর তিনি ভারতে গ্রেপ্তার হন। অন্যদিকে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চু প্রায় চার হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি ও আত্মসাতের ঘটনা ঘটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে লাপাত্তা। এই দুই অভিযুক্তকে দীর্ঘদিনেও আইনের মুখোমুখি করা যায়নি। এ প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার অপব্যবহার, ভয়াবহ দুর্নীতি ও বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদও তাদের দেখানো পথ ধরেই হাঁটছেন। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও আর্থিক গোয়েন্দাদের অনেকেই এমন আশঙ্কা করছেন।

তাদের ধারণা, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের ভয়াবহ দুর্নীতির খবর প্রকাশ পাওয়ার পর দাম্ভিকতার সঙ্গে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেও তিনি মূলত তখনই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেন। তবে এর আগে তিনি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা সরানো এবং গোপনে সম্পত্তি বিক্রি করাসহ নানা আটঘাট বাঁধেন। তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও সহযোগীরা যাতে তার ফেলে যাওয়া সম্পত্তি কিছুটা হলেও কব্জায় রাখতে পারেন এর গাইড লাইন তৈরি করেন। যদিও এসব ফন্দি কোনো কাজে লাগবে না, শেষ সময়ে বেনজীর আহমেদ তা নিজেই বুঝতে পারেন।

জানতে চাইলে বেনজীর আহমেদের অ্যাডভোকেট শাহ মঞ্জুরুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেনজীর স্যার দুদকে যাবেন কি না এখনো নিশ্চিত না। বিষয়টি সরাসরি বেনজীর স্যার দেখছেন। তারচেয়ে বেশি কোনো তথ্য আমার কাছে নেই।

এদিকে, বেনজীর আহমেদও যে আবদুল হাই বাচ্চু ও পিকে হালদারের মতো একই ছক কষে সামনের দিকে এগোচ্ছেন এ ব্যাপারে দুদকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও অনেকে একমত। তাদের ভাষ্য, সাবেক এই আইজিপি শুধু নিজের ভয়াবহ দুর্নীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহালই নন, তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ প্রমাণিত হলে কী সাজা হতে পারে সে বিষয়টিও ভালোভাবে জানেন। তাই আগামীকাল ৬ জুন বেনজীর আহমেদ এবং ৯ জুন তার স্ত্রী ও তিন কন্যা যে দুদকে উপস্থিত হচ্ছেন না তা তারা (দুদক কর্মকর্তারা) অনেকটা আগেভাগেই ধরে নিয়েছেন। এমনকি নির্ধারিত দিনে তার আইনজীবী দুদকে হাজির হয়ে সময় চাইতে পারেন এমনটাও আশা করছেন তা দুদক কর্মকর্তা অনেকেই জানেন।

তারা মনে করেন, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ যেসব দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে, তা প্রমাণ করা মোটেই কঠিন হবে না। আর এসব প্রমাণিত হলে তাকে দীর্ঘমেয়াদি কারাদন্ড ভোগ করতে হবে। তাই এসব বিষয় মাথায় রেখে সুচতুর বেনজীর আগেভাগেই তার পালানোর পথ উন্মুক্ত করে রেখেছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় দেশ ছেড়ে পালিয়ে তিনি যাতে নির্বিঘ্নে উন্নত কোনো দেশে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে নির্বিঘ্নে জীবন-যাপন করতে পারেন এ জন্য সেকেন্ড হোম তৈরি করে রেখেছিলেন। বেনজীর আহমেদের তুরস্কে এবং তার স্ত্রী জিশান মির্জার স্পেনে সেকেন্ড হোম রয়েছে বলে গুঞ্জনের ডালপালা মেলেছে। তবে এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্যপ্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশ জুড়ে হোয়াইট কলার ক্রাইম বা সচ্ছল মানুষের অপরাধের প্রবণতা বাড়ছে। এর সবচেয়ে বড় কারণ দুর্নীতি ও অপরাধ করেও নির্বিঘ্নে পার পেয়ে যাওয়ার ভয়াবহ সংস্কৃতি। পাশাপাশি অপরাজনীতির দাপটও এ জন্য অনেকাংশে দায়ী। আবদুল হাই বাচ্চু ও পিকে হালদার যেভাবে ব্যাপক দুর্নীতি করে নির্বিঘ্নে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে পেরেছেন, তাতে বেনজীরের মতো অভিজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তা সে পথ ধরবেন, এটাই স্বাভাবিক।

বেনজীর আহমেদ এবং তার স্ত্রী ও সন্তানদের দুদকে তলব প্রসঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কমিশনার জহুরুল হক সাংবাদিকদের বলেছেন, দুদক কাউকে নোটিস করলে তিনি আসতে বাধ্য কি না, সেটা আইনে সুস্পষ্ট বলা নেই। না এলে ধরে নিতে হবে তার কোনো বক্তব্য নেই। তবে তার সুযোগ আছে সময় চাওয়ার। সময় চাইলে দুদক ১৫ দিন সময় দিতে পারবে। এই এখতিয়ার কমিশনারের রয়েছে।

দুদক কমিশনার জহুরুল হক আরও বলেন, নথিপত্র দেখে যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে প্রমাণিত, না হলে নাই। অনুসন্ধানের স্বার্থে যা যা করণীয়, সবই করা হচ্ছে। তিনি বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতেও বিচার হবে, এতে কোনো বাধা নেই। এটা আদালত বুঝবে।

দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনুদ্দিন আবদুল্লাহ বলেন, ‘দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে বেনজীর আহমেদের বক্তব্য চেয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছে। তিনি আসবেন এবং তার পক্ষে বক্তব্য দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। ‘আমরা আসলে জানি না তিনি এই মুহূর্তে কোথায় আছেন। আমরা তার বা তার পরিবারের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করিনি। তিনি আরও বলেন, তদন্ত দল বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করছে। যদি তারা মনে করে তার বক্তব্য জানতে তাকে আবার তলব করা দরকার, তাহলে তারা তা করতে পারে। তদন্ত কমিটি সম্পূর্ণ স্বাধীন।

দুদকের একটি সূত্র জানিয়েছে, বেনজীর ও তার স্ত্রী-কন্যাদের নামে যে সম্পত্তির পাহাড় রয়েছে তার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এর বাইরেও আরও বিশাল সম্পদ আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্ত্রী-কন্যা ও নিজের নামের বাইরে আত্মীয়-স্বজন, এমনকি অনাত্মীয় অনেকের নামে তিনি সম্পদ রেখেছেন এমন অভিযোগও মিলেছে। তবে এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ এখনো দুদক পায়নি। তদন্তে অন্য কারও হেফাজতে বেনজীর কিংবা তার পরিবারের কোনো সম্পদ পাওয়া গেলে তা-ও জব্দ করা হবে। তবে এর সবই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন করবে দুদক।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বেনজীর ও তার পরিবার স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে দুদকে হাজির হবেন, এমন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। আর তিনি এবং তার স্ত্রী-সন্তানরা অন্য কোনো দেশে সেকেন্ড হোম করে থাকলে সেখান থেকে তাদের ফিরিয়ে এনে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো খুবই কঠিন। তাই এ পরিস্থিতিতে তিনি আবদুল হাই বাচ্চু কিংবা পিকে হালদারের দেখানো পথ ধরেই হাঁটবেন, সেটিই স্বাভাবিক।