আরও চাপে জীবন আরও কঠিন

গ্রামের মানুষ অবসরে পান চিবিয়ে চিবিয়ে একটু গল্প করেন, রসিকতা করেন প্রতিবেশীর সঙ্গে। সামনের অর্থবছর থেকে এই পান খাওয়ার খরচ বাড়বে। শুধু কি তাই!! মানুষ স্বাভাবিকভাবে বিয়েটা জীবনে একবারই করেন। সেই বিয়ে করতে কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করা প্রয়োজন হয়, এখন সেখানেও দেখাতে হবে আয়কর রিটার্নের রসিদ!

ডলারের কারণে এবার আমদানি সংকোচন নীতির মধ্যে রয়েছে সরকার। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বাজারে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা আবারও সংকটে পড়বে। পণ্য সরবরাহ কম থাকলে বাজারে যেকোনো পণ্যের দাম স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। তাই এবারও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে থাকবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য।

বিদ্যুতের দাম বাড়ার ফলে দেশের মানুষের খরচের খাতায় আরেক ধাপ ব্যয় বাড়বে। বিদ্যুতের দাম সরাসরি প্রভাব ফেলে শিল্প ও কৃষি উৎপাদনে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেশি দামে পণ্য উৎপাদন করলে সেটির ব্যয় সাধারণ মানুষের ঘাড়েই পড়বে। তা ছাড়া সেচে বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, কৃষি উৎপাদনে ব্যয় বেড়ে গেলে কৃষিপণ্যেও প্রভাব ফেলবে।

দুই বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষ অতিমাত্রায় মূল্যস্ফীতির চাপে আছে। মজুরির চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি ১৭ মাস ধরে। এই মুহূর্তে গণদাবি ছিল করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো। কিন্তু সামনের অর্থবছরও করমুক্ত আয়সীমা আগের মতোই থাকছে, অর্থাৎ ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থাকছে করমুক্ত আয়সীমা।

সাধারণ মানুষের যেসব জায়গায় অংশগ্রহণ বেশি, সেখানেই ভ্যাট বসিয়ে মূল্যস্ফীতির এ বাজারে সাধারণের কষ্ট আরও বাড়বে। বিশেষ করে মেট্রোরেলের ওপর ভ্যাট মওকুফের কোনো চিন্তা করা হয়নি এবারের বাজেটে। ফলে মেট্রোরেলের টিকিটে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বসছে। এটি সাধারণ যাত্রীদের ওপর খরচের চাপ আরও বাড়াবে।

রাজধানীসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শহরে বিশুদ্ধ পানি পান করানোর দায়িত্ব ছিল ওয়াসার। তারা ব্যর্থ হওয়ায় মানুষ ফিল্টার মেশিনের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছিল, সাধারণ মানুষ আগামী অর্থবছরের বাজেটে পানির ফিল্টারেও গুনতে হবে বেশি টাকা।

এবারের বাজেটে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কেমন পড়বে, এমন প্রশ্নের জবাবে পিআরআইর নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, সুদহার অনেক বেড়ে যাবে। যদিও সুদহার বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতিতে তা কিছুটা সহায়ক ভূমিকা রাখবে। তবে সাধারণ মানুষের জন্য আগামী ছয় মাস স্বস্তির কিছু থাকবে না। দ্রব্যমূল্য যেটা বেড়েছে, সেটা কমবে না। তবে ছয় মাস পরে আস্তে আস্তে কমতে পারে।

খেলার মাঠের এ দুর্দশার দিনে মানুষ সাধারণত অবসরে বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরতে যান পার্কে। এবার সেখানেও বসছে করের বোঝা। অ্যামিউজমেন্ট পার্ক ও থিম পার্কে প্রবেশ এবং রাইডে চড়তে আরোপ করা ভ্যাট দ্বিগুণ করা হয়েছে। আগে এই ভ্যাটের পরিমাণ ছিল সাড়ে ৭ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে এটি বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হচ্ছে। এতে বিনোদনের খরচ আরও বাড়বে।

ফোনে কথা বলার ওপরও পড়বে করের খড়গ। ইন্টারনেট সেবা ও মোবাইল ফোনের কলরেটে সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এখন টকটাইম ও ইন্টারনেট সেবায় ১৫ শতাংশ চালু থাকা ভ্যাট আরও ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ২০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ফোনে রিচার্জ করার সময় এই অর্থ কেটে রাখা হয়।

প্রতি ১০০ টাকার টকটাইম পেতে হলে ১৩৩ টাকা ২৫ পয়সার জায়গায় এখন ১৩৯ টাকা রিচার্জ করতে হবে। ১০০ টাকা রিচার্জ করলে সরকার ২৮ টাকা শুল্ক-কর পাবে। ফলে সাধারণ গ্রাহক ৭২ টাকা ব্যবহার করতে পারবেন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে মোবাইল ফোনে কথা বলার ওপর প্রথমবার ৩ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়। পরে কয়েক দফা বাড়িয়ে তা ১৫ শতাংশ করা হয়েছিল। এখন তা বাড়িয়ে করা হলো ২০ শতাংশ।

অবশ্য গতকাল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় দেশের সবচেয়ে বড় গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘একটা চ্যালেঞ্জিং সময়ে বাজেটটি হলো। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, এই বাজেট অনেক উদ্ভাবনী হবে। এখানে সৃজনশীল ও কিছু সাহসী পদক্ষেপ থাকবে। কারণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জিং সময়ে গতানুগতিক বাজেট কোনো ধরনের সমস্যার সমাধান দিতে পারবে না। নতুন বাজেট আমাদের কাছে অতীতের বাজেটের মতোই মনে হয়েছে। বর্তমান সময়ের সমস্যা, ক্রান্তিকালীন সংকট দেখা দিয়েছে অর্থনীতিতে, সেগুলো সমাধানে এই বাজেট যথোপযুক্ত পদক্ষেপ বা দিকনির্দেশনা দিতে পারেনি।’