স্বাস্থ্য খাতে চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের চেয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাজেট বরাদ্দ ৮ শতাংশ বাড়ছে। আগামী অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ৪১ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৫ দশমিক ২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৩৮ হাজার ৫১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে বরাদ্দ বেড়েছে ৩ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা।
এ ছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় ২ হাজার কোটি টাকা এবং সমন্বিত স্বাস্থ্যবিজ্ঞান গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিলের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। করোনা মহামারীর সময় থেকে সরকার স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে আসছে। অন্যদিকে, দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানের মৌলিক ও প্রায়োগিক গবেষণার অবকাঠামো তৈরি, গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা, স্বাস্থ্য খাতের নতুন উদ্ভাবনের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে সরকার এই তহবিল গঠন করেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য বাজেট প্রস্তাব করেন।
স্বাস্থ্য খাতের প্রস্তাবিত বাজেটকে গতানুগতিক বলে মনে করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ। তিনি বলেন, কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও বাজেট গতানুগতিক, বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন নেই।
স্বাস্থ্য অর্থনীতির এই বিশ্লেষক বলেন, স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় এবারও ২ হাজার কোটি টাকা এবং গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিলের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। যেখানে চলতি অর্থবছরের চেয়ে জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে, সেখানে স্বাস্থ্য খাতে গত বছরের চেয়ে বেড়েছে ৮ শতাংশ। এসবই টুকিটাকি পজিটিভ দিক। কিন্তু মোট বাজেটের তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ খুব বেশি বাড়েনি। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ৫ শতাংশ। এবার ৫ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। এটা খুব বেশি নয়।
প্রস্তাবিত বাজেটের নেতিবাচক দিক তুলে ধরে অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, রেফারেল হাসপাতালের চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও উপকরণ আমদানি শুল্ক ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার যে প্রস্তাব করা হয়েছে, সেটা ঠিক হয়নি। এতে বেসরকারি হাসপাতালে মানুষের চিকিৎসা ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরের চেয়ে আগামী অর্থবছরের বাজেটে যে ৩ হাজার কোটি টাকার মতো বেড়েছে, সেটাও খুবই সামান্য। কারণ এই টাকার বড় অংশ চলে যাবে হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের শিক্ষক, চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায়। স্বাস্থ্যসেবায় খুব বেশি খরচ হবে না।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগের অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক ও স্বাস্থ্য অর্থনীতির বিশ্লেষক ড. নাজমুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাজেটের কত শতাংশ স্বাস্থ্যের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে, সেদিক বিবেচনা করলে প্রস্তাবিত বাজেটে খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু যা বরাদ্দ করা হয়েছে, সেটাও যদি ঠিকমতো বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে মানুষ সঠিক স্বাস্থ্যসেবা পাবে।
সেবায় বেড়েছে ২%, শিক্ষা-কল্যাণে ৩১% : প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য ৩০ হাজার ১২৫ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের জন্য ১১ হাজার ২৮২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগে বরাদ্দ বেড়েছে ২৪ শতাংশ এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে বরাদ্দ বেড়েছে মাত্র ২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগে বরাদ্দ ছিল ৮ হাজার ৬২১ কোটি টাকা ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে ২৯ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা।
নিডলে শুল্ক ৫% ও অ্যাম্বুলেন্সের দৈর্ঘ্য ৯ ফুট : বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ওষুধ, চিকিৎসাসামগ্রী ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী উৎপাদনে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান রেয়াতি সুবিধা অব্যাহত রাখা হয়েছে।
চিকিৎসায় ব্যবহৃত স্পাইনাল নিডলের নতুন করে এইচএস কোড যুক্ত করে পণ্যটির আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এত দিন এই পণ্যের সুনির্দিষ্ট কোনো কোড না থাকায় আমদানি পর্যায়ে শুল্কায়নে জটিলতা দেখা দিচ্ছিল।
আমদানির ক্ষেত্রে অ্যাম্বুলেন্সের প্যাসেঞ্জার কেবিনের ন্যূনতম দৈর্ঘ্য ৯ ফুট নিরূপণের প্রস্তাব করা হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স আমদানিতে শুল্ক সুবিধা অব্যাহত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ প্রস্তুতে যেসব কাঁচামাল আমাদানি করা হয়, সেই তালিকায় নতুন কিছু কাঁচামালের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ওষুধের কাঁচামাল অ্যাজিথ্রোমাইসিন আমদানির তালিকায় সংযুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া নামের বানান ভুল সংশোধন ও নতুন কাঁচামালের নাম সংযুক্ত করে আমদানি করা কাঁচামালের নতুন তালিকা জারি করারও প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাজেটে কিডনি রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ডায়ালাইসিস ফিল্টার ও ডায়ালাইসিস সার্কিটের আমদানি শুল্ক ১০ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি ডেঙ্গু রোগ নির্ণয়ের কিট আমদানির ওপর রেয়াতি সুবিধা দেওয়ারও প্রস্তাব করা হয়েছে।