খুশবন্ত সিংকে জিজ্ঞেস করা হলো, পাকিস্তান নিয়ে এত লিখছেন কেন? ভারতে লেখার বিষয়ের আকাল চলছে নাকি?
খুশবন্ত সিং বললেন, এ বয়সে আর জেল খাটতে চাই না।
অন্য একটি জবাব, ভারত সরকারের বিরুদ্ধে উগরানোর মতো আমার বিষের কোনো কম পড়েনি, তবু সরকারটা তো আমাদেরই।
খুশবন্ত সিং (১৫ আগস্ট ১৯১৫-২০ মার্চ ২০১৪) ১০ বছর আগে প্রয়াত। বিভিন্ন কারণে ওপার থেকেও তিনি তাকে স্মরণ করতে বাধ্য করেন। তিনি নিজেই লিখেছেন, এক পাঠকের গালাগালপূর্ণ চিঠি পেয়েছেন, খামে ঠিকানা লেখা ছিল খুশবন্ত সিং, দ্য বাস্টার্ড, নয়াদিল্লি। তখনকার প্রায় ৩ কোটি মানুষের শহরে খুশবন্ত সিংকে খুঁজে পেতে ডাক বিভাগকে বিচলিত হতে হয়নি। বাংলাদেশের ঢাকাবাসী কোনো লেখকের নামের পাশে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিশেষণ যোগ করে একটি চিঠি পাঠিয়ে দেখুন চিঠি গন্তব্যে পৌঁছে কিনা? আমরা যথেষ্ট রসবোধসম্পন্ন জাতি নই বলে গালাগাল করে লেখা চিঠির কথা বলিই না, বাস্টার্ড লিখলে পত্রলেখকের খবর আছে। আদালতে নালিশ করলে ভালো, ক্ষমা চেয়ে বাঁচা যাবে, কিন্তু লেখক যখন নিজস্ব মাস্তান পাঠাবেন তখন কী হবে গুম না অন্য কিছু, সেটা নির্ভর করবে মাস্তানদের মুডের ওপর।
রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে ইউএনও পর্যন্ত কাউকে একটা খোঁচা দিয়ে দেখুনই না, কদিন জেল খাটতে হয়। বারাক ওমাবা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় বলেছিলেন, হোয়াইট হাউজে প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশ করে যত চিঠি আসে তার অর্ধেকের বেশি চিঠিতে আমেরিকার নাগরিকরা তাকে গালাগাল দিয়ে থকে। তিনি যত গাল খেয়েছেন তার মধ্যে সবচেয়ে ভালোটা হচ্ছে : মাথামোটা গাধা। খারাপগুলো কী অনুমেয়। বাংলাদেশে এমন একটা চিঠি লেখার ঝুঁকি কেউ নেবেন? জাস্ট একটা এক্সপেরিমেন্ট!
আমরা নিজেদের নিয়ে ঠাট্টা-মশকারা নাই করি, অন্যদের দুর্বলতা ও পাগলামি নিয়ে অট্টহাসি দিতে তো আমাদের তেমন অসুবিধে নেই।
খুশবন্ত মনে করেন, জনপ্রিয়তার দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে শাসকের বিরুদ্দে কৌতুক। রাজা-রানী, মন্ত্রী-জেনারেল এবং ক্ষমতাসীনদের নিয়ে কৌতুক করার একটি ঐতিহ্য রয়েছে। মধ্যযুগীয় দরবারে বিদূষক ও ক্লাউনদের সহ্য করা হতো, কথা বলার সুযোগের প্রশ্নে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হতো, কারণ রাজা সম্পর্কে প্রজারা কী বলছে তাদের মাধ্যমেই রাজা জানতে পারতেন। একালে মন্ত্রীরা সবাই কমবেশি ক্লাউন, সবাই ভাঁড়, সরকার বাহাদুর কার কথা যে আমলে নেবেন ভেবেই দিশেহারা। ঐতিহাসিক সত্য হচ্ছে, ঐতিহ্যবাহী লোকরস সাধারণত আহাম্মক বাদশাহ ও তার মন্ত্রীদের নিয়ে, দুশ্চরিত্র স্ত্রীদের কমান্ডার স্বামীদের নিয়ে। শাসন যত স্বৈরাচারী, তত বেশি আন্ডারগ্রাউন্ড হিউমার সৃষ্টি হয়ে থাকে। ঐতিহ্য ও ইতিহাসের পথ ধরে এডলফ হিটলার, বেনিতো মুসোলিনি এবং জোসেফ স্টালিন থেকে পাকিস্তানের জিয়াউল হক পর্যন্ত সবাই কৌতুকের পাত্র হয়েছেন। জরুরি আইন জারি করে এবং হাজার হাজার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কারাগারে ঢুকিয়ে মিসেস ইন্দিরা গান্ধীও কৌতুকের পাত্রী হওয়ার দাবি করতে পারেন। হয়েছেনও তাই।
ভিসার জন্য প্রেসিডেন্ট : পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউল হক তার গাড়িবহরে ইসলামাবাদ শহরে ঘুরছেন; তিনি দেখলেন বিদেশি দূতাবাসগুলোর সামনে পাকিস্তানিদের বিশাল লম্বা লাইন। খোঁজ নিয়ে জানলেন সবাই সেসব দেশে যাওয়ার জন্য ভিসা ও এন্ট্রি পারমিটের জন্য লাইন ধরেছে। তিনি গাড়ি থেকে নেমে একটি লাইনে দাঁড়িয়ে গেলেন। তার উদ্দেশ ভিন্ন, কোন দুঃখে মানুষ পাকিস্তান ছেড়ে বিদেশ যাচ্ছে তিনি তা উদঘাটন করবেন। তিনি লাইনে দাঁড়িয়েছেন এটা টের পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সামনের লাইন পুরোটাই ফাঁকা হয়ে গেল। তারা সানন্দে বাড়ি চলে যাচ্ছেন।
এবার প্রেসিডেন্ট খুব আগ্রহী হয়ে জানতে চাইলেন ভিসা না নিয়ে তারা কেন চলে যাচ্ছেন।
তাদের একজন জবাব দিলেন, ‘স্যার, আপনিই যদি পাকিস্তান ছেড়ে চলে যান, আমাদের দেশ ছাড়ার কী দরকার?’
এই তিতকুটে কৌতুকটি খুশবন্ত সিং-এর খুশবন্তনামা থেকে তুলে এনেছি।
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের নিতম্ব : (১৭ আগস্ট ১৯৮৮ ঝুড়িতে রাখা আম বিস্ফোরিত হয়ে বিমান ধ্বংস হলে আরোহী পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউর হক ও তার সঙ্গে কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা ও আমেরিকার রাষ্ট্রদূতও নিহত হন।)
জেনারেল জিয়ার দাফনের পরপরই বেশ কিছু জিয়াবিরোধী কৌতুক বাজারে চলে আসে।
‘বিমানের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে কোনটা জেনারেল জিয়ার মরদেহ তা শনাক্ত করা হলো কেমন করে?’
‘বিমানের যে আসনে তারা বসেছিলেন তাদের মধ্যে একমাত্র তিনিই জোরে চেয়ার আঁকড়ে রেখেছিলেন।’
প্রতীকী এই পর্যবেক্ষণ আসলে বৈশ্বিক, ক্ষমতা ছাড়তে কেউই চান না।
জেনারেল জিয়াউল হককে নিয়ে আরও একটি নির্মম কৌতুক :
বিমান দুর্ঘটনার পর সবার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকৃত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। চেনার উপায় নেই কোনটি কার।
শেষকৃত্যের জন্য প্রত্যেকের সঙ্গে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যোগ করতে হবে। কারও মাথা, কারও বুক, কারও পা এভাবে জোড়াতালি দিয়ে মানুষগুলো মর্যাদার সঙ্গে বিভিন্ন কবরে শুইয়ে দেওয়া হলো। অনেক বছর পর পৃথিবীতে করা পাপের শাস্তি-সভায় সৃষ্টিকর্তা রায় দিলেন, ‘জেনারেল জিয়াউল হকের নিতম্বে চাবুকের একশত ঘা।’
যথারীতি তাকে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নিতম্বের কাপড় সরিয়ে ফেলা হলো। শুরু হলো চাবুক চালানো। একটা করে ঘা পড়ে আর জেনারেল হাসিতে ফেটে পড়েন।
তার আচরণে ক্ষিপ্ত স্রষ্টা জিজ্ঞেস করলেন, ‘মার খেয়েও এত হাসছেন যে ক্যান মিস্টার প্রেসিডেন্ট?’
‘কারণ যে নিতম্বে চাবুকের ঘা পড়ছে, ওটি আমার নয়, আমেরিকার রাষ্ট্রদূতের।’
জরুরি অবস্থা : ঘটনাটা ১৯৭৫ সালের, মিসেস ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা জারি করেছেন।
বাপুজি মহাত্মা গান্ধী স্বর্গে থেকে বিচলিত বোধ করছেন, দেশের জন্য তিনি এতকিছু করেছেন, কিন্তু দেশের মানুষ তার নাম মনে রাখেনি। তিনি জওহরলাল নেহরুকে ডেকে পাঠালেন। বললেন, নেহরু ব্যাটা, তুমি এত বছর ভারত শাসন করলে কিন্তু বাপু গান্ধীর স্মৃতি মানুষের মনে জাগিয়ে রাখতে তুমি কী করেছ?
‘বাপু আমার পক্ষে যা যা করা সম্ভব সবই করেছি। যেখানে আমরা আপনার মরদেহ দাহ করেছি, সেখানে সমাধি নির্মাণ করে দিয়েছি। আপনার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা আপনার সমাধিতে জমায়েত হই এবং রামধুন এবং বৈষ্ণব গীত করি। এর বেশি আমি কী-ই বা করতে পারতাম।’
বাপু জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার পরে কে ক্ষমতায় এসেছে?’
নেহরু বললেন, ‘আমাকে জানিয়েছে আমার মৃত্যুর পর লাল বাহাদুর শাস্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়েছিল।’
সুতরাং বাপু গান্ধী লাল বাহাদুরকে ডেকে পাঠালেন এবং একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন।
শাস্ত্রী জবাব দিলেন, ‘বাপু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি খুব কম সময় পেয়েছি, কেবল দেড় বছর, এর মধ্যে আমি সব শহর ও গ্রামে আপনার মূর্তি বসিয়ে দিয়েছি। আপনার ভাষণ ভারতের সব ভাষায় ছাপিয়ে বিনামূল্যে বিতরণ করেছি। আমি আর এর চেয়ে বেশি কী করতে পারতাম।’
বাপু জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার পর কে আসে?’
‘নেহরুর ছোকরি ইন্দিরা। সে-ই এখন ভারত শাসন করছে।’
তিনি ইন্দিরা গান্ধীকে ডেকে পাঠালেন। তিনি কেবল দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন তার সামনেও একই প্রশ্ন রাখলেন?
ইন্দিরা বললেন, শাস্ত্রী বা আমার বাবা আপনার স্মৃতির বিস্তার করতে যা না করেছেন আমি তার চেয়ে অনেক বেশি করেছি। আমি দেশের সব মানুষকে আপনার মতো করেছি। আমি এমন অবস্থা করেছি এখন তাদের নেংটি ছাড়া আর কিছু নেই।’
বাপু আতঙ্কিত হলেন ‘বেটি এটা তো ঠিক নয়। মানুষকে বঞ্চিত করার অভিযোগ তারা তো তোমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে।’
ইন্দিরার জবাব : ‘বাপু চিন্তার কোনো কারণ নেই, আমি সব দিকেই খেয়াল রেখেছি। আমি তাদের হাতে নেংটি তুলে দিয়েছি আর পাছায় ডা-া।’
ভাষা শিক্ষা (একটি খুশবন্তাশ্রিত রঙ্গ) : মরণাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি হওয়া এক বাঙালি বৃদ্ধ রাজনীতিবিদের জ্ঞান ফিরলে তিনি ডাক্তারের অনুমতি চাইলেন, ‘অনুগ্রহ করে, মৃত্যুর আগে আমাকে উর্দু শেখার সুযোগ দিন।’
ডাক্তার এমন অনুরোধ জীবনে এই প্রথম শুনে হতভম্ব হয়ে গেলেন। তিনি রোগীকে এই উদ্ভট অনুরোধের কারণ জিজ্ঞেস করলেন।
‘উর্দু হচ্ছে ফেরেশতাদের ভাষা। আমার মৃত্যুর পর বেহেশতে যখন তাদের সঙ্গে এবং হুরিদের সঙ্গে দেখা হবে, প্রাণ খুলে মনের দুটো কথা বলতে পারব।’
ডাক্তার বললেন, ‘কিন্তু আপনি যে বেহেশতে যাবেন তা নিশ্চিত হলেন কেমন করে। যদি দোজখে যান, তাহলে তো কষ্ট করে এই বয়সে যে উর্দু শিখবেন সে শিক্ষাটা কোনো কাজেই লাগবে না।’
‘তাতে সমস্যা নেই, শয়তানের ভাষাটা আমার জানাই আছে। আমি স্বাচ্ছন্দ্যে বাংলা বলে যেতে পারি। আমার নির্বাচনী বক্তৃতা শোনেননি?’
রাজনীতিবিদের দয়াদাক্ষিণ্য : একটি শিশুকে কোলে নিয়ে এক ভিখারিনী রাস্তার ধারে বসে কেঁদে চলেছে।
রাজনীতিবিদ জিজ্ঞেস করলেন : ‘কী ব্যাপার, তুমি কাঁদছ কেন?
ভিখারিনী বলল : আমি ও আমার সন্তান দুজনই না খেয়ে আছি। পয়সাকড়ি না থাকায় গত দুদিন আমরা কোনো খাবার কিনতে পারিনি।
রাজনীতিবিদ বললেন, অসম্ভব, তা হতে পারে না। তারপর পকেট হাতড়ে একটি ১০০০ টাকার নোট বের করলেন।
বললেন : আপতত এই একটি নোটই আছে। এটা নিয়ে যাও। তোমার এবং তোমার বাচ্চার দুদিন চলার মতো খাবার ও দুধ কিনে বাকি টাকাটা আমাকে ফেরত দাও। আমি এখানে অপেক্ষা করছি। তোমার বাচ্চাকে দেখে রাখব, যাও।
কথামতো ভিখারিনী তার সন্তানের ও নিজের খাবার কিনে বাকি ৬০০ টাকা ফেরত দিল।
রাজনীতিবিদ টাকাটা পকেটে ঢুকিয়ে নিজেকেই শোনালেন : দয়াদাক্ষিণ্য বড় চমৎকার একটি ব্যাপার। বাচ্চাটা দুধ পেয়েছে, মহিলাটি খাবার পেয়েছে আর আমি আমার পুরনো ব্যবসার একটি ১০০০ টাকার নোটের হাত থেকে রেহাই পেয়েছি। তার ওপর নগদ ৬০০ টাকা!
খুশবন্ত সিং-এর সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় তার জোক বুকস। তিনি লিখেছেন : যে দেশের মানুষের সেন্স অব হিউমার- রসবোধ নেই, সে দেশের সবচেয়ে বড় কৌতুক হচ্ছে : জোক বইগুলোই বেস্ট সেলার্স।
আমাকে যদি কেউ প্রশ্ন করেন, খুশবন্ত সিংকে নিয়ে লিখছেন কেন? বাংলাদেশে কি বিষয়ের আকাল পড়েছে নাকি? আমি কালা হয়ে যাওয়ার ভান করে বলব, কী বললেন, আমি শুনতে পাচ্ছি না।
লেখক: সাহিত্যিক ও অনুবাদক