বিজ্ঞানীরা যখন রাষ্ট্রক্ষমতায়

পৃথিবীর ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনে বসেছেন বিজ্ঞানীরা। রাষ্ট্র পরিচালনায় তারা কেমন? নেচার ডটকম অবলম্বনে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

মেক্সিকোর ইতিহাসে প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে যিনি  নির্বাচিত হয়েছেন তিনি একজন বিজ্ঞানী। পদার্থবিদ্যা এবং পরিবেশগত প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা করা ক্লডিয়া শিনবাউম পারডো মনে করিয়ে দিচ্ছেন আরও কয়েকজন বিজ্ঞানীর কথা, যারা সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হন। এ বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে নেচার ডটকম দেখাতে চেষ্টা করেছে বিজ্ঞানীরা রাষ্ট্রক্ষমতায় বসলে কেমন আচরণ করেন অথবা তারা কতটা সফল। এ তালিকায় শিনবাউম পারডো ছাড়াও নাম রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হার্বার্ট হুভার (১৯২৯-৩৩), যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার (১৯৭৯-৯০), ভারতের রাষ্ট্রপতি এ.পি.জে. আবদুল কালাম (২০০২-০৭), জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল (২০০৫-২১), জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইউকিও হাতোয়ামা (২০০৯-১০)।

সিটি কলেজ অব নিউ ইয়র্কের পদার্থবিদ মাইক লুবেল বলেন, বিজ্ঞানীরা যারা তাদের দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে সফল হয়েছেন, তারা রাজনীতিবিদদের মতো চিন্তা করার প্রবণতা রাখেন। তবে তার মতে, রাজনীতিতে বিজ্ঞান শেষ কথা নয়। বিভিন্ন বিজ্ঞানীর শাসনকালের অভিজ্ঞতা বলছে, কেউ কেউ বিজ্ঞানীর মতো যুক্তি-তথ্য ও নীতি মেনে কাজ করেছেন। তবে বেশিরভাগ রাজনৈতিক পক্ষ ও মত দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তাদের শাসনের ভেতরও সেসব পরিলক্ষিত হয়। তাদের মধ্যে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে সফল ছিলেন অ্যাঙ্গেলা মেরকেল। তিনি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কাজ করেছেন। যার কারণে তার সাফল্য এবং জনপ্রিয়তা দুই-ই বেশি। আবার ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পান আবদুল কালাম। রাষ্ট্র পরিচালনায় তার তেমন ভূমিকা রাখার সুযোগ ছিল না। তবে দেশটির বিজ্ঞান খাতে অবদান রাখার কারণে তিনি ছিলেন সবার প্রিয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিজ্ঞানের দক্ষতা একটি দ্বিধারী তলোয়ার। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদ সায়াকা ওকি বলেন, বিজ্ঞানীরা সমাজের বিভিন্ন অংশ থেকে কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়, তা খুব ভালোভাবে জানেন। কিন্তু একই সময়ে যদি তারা অন্যদের কথা শোনার পরিবর্তে তাদের নিজের বুদ্ধির ওপর খুব বেশি নির্ভর করেন, তাহলে বিপত্তি ঘটতে পারে।

হার্বার্ট হুভার

হার্বার্ট হুভার ১৮৯০-এর দশকে ক্যালিফোর্নিয়ার তৎকালীন স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে ভূতত্ত্ব অধ্যায়ন করেন। একটি আন্তর্জাতিক খনি প্রতিষ্ঠানের পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে লন্ডনে থাকার সময় তিনি জার্মান-অধিকৃত বেলজিয়ামে একটি ত্রাণ কর্মসূচি স্থাপন করে খ্যাতি অর্জন করেন। যুদ্ধের শেষ দিকে মার্কিন খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন তাকে আমন্ত্রণ জানান। হুভার ১৯২১ সালে মার্কিন বাণিজ্য সচিব হন এবং দ্রুত একজন দক্ষ টেকনোক্র্যাট হিসেবে খ্যাতির শিখরে চলে যায়। কিন্তু এই খ্যাতি তার বিড়ম্বনার কারণ হয়। নিজের বিশ্বাস ও লোকজনের প্রতি পক্ষপাত তাকে বৃহত্তর সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক উদ্বেগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে। যা যুক্তরাষ্ট্রে ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’ বা মন্দার কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়। পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়ার বিজ্ঞান ইতিহাস ইনস্টিটিউটের সভাপতি ডেভিড কোল বলেন, সেই মন্দা, মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ ছিল। যা ১৯২৯ সালে রিপাবলিকান দলের সদস্য হুভার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরপরই শুরু হয়।

কোল বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশকে হতাশা থেকে বের করে আনার জন্য সরকারি অনেক পদক্ষেপই আসলে হুভারের অধীনে শুরু হয়েছিল। কিন্তু তিনি জনসাধারণের সঙ্গে বোঝাপড়ায় ঘাটতি মেটাতে সক্ষম হননি। ভোটাররা তাকে এক মেয়াদের পরে ক্ষমতাচ্যুত করে। কোল বলেন, দেশকে হতাশা থেকে বের করে আনার জন্য হুভার প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তিনি রাজনৈতিকভাবে একদেশদর্শী ছিলেন।

মার্গারেট থ্যাচার

মার্গারেট থ্যাচার একজন রসায়নবিদ। তিনি সম্ভবত ব্রিটেনের সবচেয়ে পরিচিত এবং আলোচিত প্রধানমন্ত্রীদের একজন। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন অধ্যয়নের সময় তিনি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী রসায়নবিদ ডরোথি হজকিনের গবেষণাগারে কাজ করেছেন। কাজটি ছিল অ্যান্টিবায়োটিকের গঠন নিয়ে। রাজনীতি করতে গিয়ে গবেষণা ছেড়ে দেওয়ার আগে থ্যাচার একটি প্লাস্টিক কোম্পানিতে এবং তারপর একটি খাদ্য কোম্পানিতে রসায়নবিদ হিসেবে চাকরি করেন।

তার নেতৃত্বে কনজারভেটিভ পার্টি ১৯৭৯ সালে নির্বাচনী বিজয়ী হয়। তার আগে একটি আন্দোলন হয় যুক্তরাজ্য জুড়ে। চার মিলিয়নের বেশি শ্রমিক বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনে নামেন। সেই আন্দোলনের ফলাফল হিসাবে থ্যাচার ক্ষমতায় আসেন। ১১ বছরের প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় থ্যাচার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প এবং পাবলিক পরিষেবা যেমন পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেন। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং আবাসনের ব্যয় হ্রাস করেন। তবে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং সরকারি তহবিল হ্রাস তার জনপ্রিয়তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কিন্তু ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে যুদ্ধে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের জয়ে ১৯৮২ সালে তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির অর্থনীতিবিদ জন মুয়েলবাউয়ার বলেন, ক্ষমতায়

থাকাকালীন থ্যাচার তার বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণের জ্ঞানের তুলনায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব বেশি প্রয়োগ করেছেন বলে মনে হয়। তার মতে, থ্যাচার একজন আত্মবিশ্বাসী রাজনীতিবিদ ছিলেন। তিনি প্রচলিত নীতির পরিবর্তে আদর্শ এবং সরল বিশ্বাসের ওপর আস্থা রাখতেন।

আবদুল কালাম

রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে আবুল পাকির জয়নুল আবেদিন (এ. পি. জে.) আবদুল কালাম জাতীয়ভাবে স্বীকৃত বিজ্ঞানী ছিলেন। ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশনের মহাকাশ বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি প্রথম ভারতীয় স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ যান তত্ত্বাবধান করেন। ১৯৮০ সালে রোহিনী স্যাটেলাইট-১ পৃথিবীর কক্ষপথ ভ্রমণ করে। সিডনির নিউ সাউথ ওয়েলস ইউনিভার্সিটির গবেষক ভেনি কৃষ্ণ আবদুল কালামের এ কাজকে ‘অসাধারণ’ বলে অভিহিত করেন। আবদুল কালাম পরে ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থায় যোগ দেন। যেখানে তিনি দেশের কৌশলগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন। ২০০২ সালে তিনি ভারতের ১১তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ভারতে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা মূলত আনুষ্ঠানিক। দেশটিতে প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধান। তবে সংসদে পাস করা বিলগুলো প্রত্যাখ্যানের ক্ষমতা রয়েছে ভারতের রাষ্ট্রপতির। বেঙ্গালুরুতে অবস্থিত ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের পদার্থবিদ রোহিনী গডবোলে বলেন, কালামের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক, বিশেষ করে তরুণ বিজ্ঞানীদের জন্য। তিনি বলেন, আবদুল কালাম এমন এক প্রজন্মের বিজ্ঞানী ছিলেন, যারা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে সদ্য স্বাধীন হওয়া ভারতকে গড়ে তুলেছিলেন। দেশের উন্নয়নকে চালিত করার জন্য তিনি স্বদেশে তৈরি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহারের স্বপ্ন দেখেন এবং দেশীয় বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থার প্রতি ভারতীয়দের আস্থা নির্মাণ করেন।

অ্যাঙ্গেলা মেরকেল

কোয়ান্টাম রসায়নবিদ হিসেবে প্রশিক্ষিত অ্যাঙ্গেলা মেরকেল জার্মানির চ্যান্সেলর হওয়া প্রথম নারী। ২০০৫ সালে তিনি দেশটির সর্বোচ্চ পদে নির্বাচিত হন। মধ্য-ডান  ডেমোক্র্যাটদের নেতা হিসেবে এ দায়িত্ব পালন করেন ১৬ বছর। মেরকেল ১৯৮৬ সালে কোয়ান্টাম রসায়নে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তখনকার পূর্ব জার্মানিতে তিনি বার্লিন-অ্যাডলারশফের অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সে গতিবিদ্যা অধ্যয়ন করেন। যুক্তরাজ্যের কভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাট কিউভার্টুপ বলেন, একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে মেরকেল ইউরোপীয় ঋণ সংকট থেকে শুরু করে জার্মানিতে পারমাণবিক শক্তির উপস্থিতি, কোভিড-১৯ মহামারী পর্যন্ত সমস্যা মোকাবিলায় বাস্তব জ্ঞানের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি যেভাবে রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো মোকাবিলা করেছেন তাতেও এক ধরনের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ব্যবহার দেখা গেছে। তিনি কোন তত্ত্বগুলো কার্যকর হতে পারে আর কোনগুলো ব্যর্থ হতে পারে তা পরীক্ষা করে দেখতেন। মেরকেল সামগ্রিকভাবে বিজ্ঞানের পটভূমিতে কাজ করতেন। এর মাধ্যমে সম্ভবত অন্যদের সঙ্গে তার সহযোগিতার সম্পর্ক বজায় রাখতেন, যা তার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করেছে। তিনি নীতির ওপর নির্ভর করতেন। যেমন কীভাবে একটি সমস্যার সমাধান করা যায় তা রাজনৈতিকভাবে না ভেবে যৌক্তিকভাবে ভাবতেন। তার কাছে সবসময় যুক্তি জয়লাভ করত। ফলস্বরূপ জার্মানির মানুষের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা অটুট ছিল।

ইউকিও হাতোয়ামা

জাপানের সরকারের প্রধান হিসেবে ইউকিও হাতোয়ামা অল্প সময় দায়িত্বে ছিলেন। এর জন্য বিজ্ঞানীদের মধ্যে যে আদর্শবাদ কাজ করে তাকে দায়ী করেন অনেকে। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ওকি বলেন, হাতোয়ামা একজন বামপন্থি, যুক্তির বেলায় খুব ‘শুদ্ধ’ থাকতেন এবং তাত্ত্বিক ছিলেন। 

হাতোয়ামা স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিল্প প্রকৌশলে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি রাজনৈতিক জীবন শুরুর আগে প্রথমে টোকিও ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে এবং পরে টোকিওর সেনশু বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ফলিত সম্ভাব্যতা’র গবেষক হিসেবে কাজ করেন। জাপানের নিগাতা ইউনিভার্সিটিতে বিজ্ঞাননীতি অধ্যয়নরত ইয়াসুশি সাতো বলেন, হাতোয়ামা রাজনৈতিক পরিবার থেকে আসা। তিনি  ‘রাজনৈতিক বংশের’ লোক। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে ডেমোক্রেটিক পার্টি নির্বাচনে জয় পেলে হাতোয়ামা দেশটির ৯৩তম প্রধানমন্ত্রী হন। ক্ষমতায় এসে তার দল বিজ্ঞান কর্মসূচির জন্য তহবিলসহ সরকারি ব্যয় হ্রাসের কাজ শুরু করে। ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র আট মাস পর ওকিনাওয়া দ্বীপ থেকে একটি বিতর্কিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থানান্তরের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়ে হাতোয়ামা পদত্যাগ করেন। তিনি ওই ঘাঁটি কম জনাকীর্ণ দ্বীপে স্থানান্তরে সম্মত হন, যা সেখানকার স্থানীয়দের ক্ষুব্ধ করে। জনসাধারণ হাতোয়ামাকে অবশ্য ‘নিষ্পাপ’ এবং বিশে^র হালচাল বোঝে না এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করে।