করোনা কালের কাণ্ড

প্রশিক্ষণের নামে টাকা ব্যয় ছাড়াও দিবস পালন নিয়েও বিস্তর অভিযোগ

সংক্রমণ ছড়ানো ঠেকাতে একদিকে সীমিত অফিস। অন্যদিকে সে অফিসেই প্রশিক্ষণের নামে জমায়েত। এমন স্ববিরোধী ঘটনা ঘটেছে করোনা মহামারীর চরম প্রতিকূল সময়ে। নথিপত্র অনুযায়ী ফরিদপুরের জেলা প্রশাসকের (ডিসি) অফিসে ২০২০ সালের ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বর ওই প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ‘তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের দক্ষতা উন্নয়ন’ শীর্ষক ওই প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে ব্যয় দেখানো হয় ১ লাখ ৭৩৫ টাকা। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর ২৬ এবং ১৬ সেপ্টেম্বর ৪৩ জনের মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়েছিল।

নথিপত্র অনুযায়ী, একই অফিসে ‘তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের ই-নথি বেসিক প্রশিক্ষণ’ হয় ওই বছরের ১৮ ও ১৯ অক্টোবর। ওই প্রশিক্ষণে ব্যয় দেখানো হয় ১ লাখ ৮ হাজার ৮১০ টাকা। অথচ দেশে ১৮ অক্টোবর ২৩ এবং ১৯ অক্টোবর ১৪ জনের করোনায় মৃত্যু হয়েছিল।

নথিপত্র বলছে, ৫৫ হাজার ১১৪ টাকা ব্যয়ে একই অফিসে ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দক্ষতা উন্নয়ন-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া একই বছরের ১৬ ও ১৮ মার্চ তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের বেসিক অফিস ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ হয়। এতে ব্যয় দেখানো হয় ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৬৬ টাকা। অথচ ১৬ মার্চ তিন মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল করোনাভাইরাসে। ১৮ মার্চ আরও ১১ জনের মৃত্যু হলে আবার দেশ জুড়ে লকডাউন চায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের অফিস ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আরও একটি প্রশিক্ষণ হয় ওই বছরের ১০ জুন। ওইদিন দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণে ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

প্রশিক্ষণের নামে টাকা ব্যয় ছাড়াও করোনাকালীন বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালন নিয়েও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। ২০২০-২১ সালের বিজয় দিবসে ফরিদপুর ডিসি অফিসের ব্যয় হয়েছে ৬০ হাজার টাকা। ওই বছরের শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে ১৫ হাজার, গণহত্যা দিবসে ৩০ হাজার। পুরো অর্থবছরের বিভিন্ন দিবস উদযাপনের জন্য সরকারি এই দপ্তরের ব্যয় দেখানো হয় ৬ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। এসব প্রশিক্ষণ ও জাতীয় দিবস উদযাপন হয়েছে করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে সরকারের নানা বিধিনিষেধের মধ্যেই।

করোনা সংক্রমণ বাড়ায় দ্বিতীয় দফায় সারা দেশ লকডাউনে যেতে বাধ্য হয় সরকার। ২০২১ সালের ৫ এপ্রিল দ্বিতীয় দফা লকডাউন দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ওই লকডাউনে গণপরিবহন বাস, ট্রেন, লঞ্চ ও উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ ছিল। তবে সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত জরুরি প্রয়োজনে সীমিত পরিসরে খোলা রাখার কথা বলা হয়েছিল প্রজ্ঞাপনে। সে অনুযায়ী সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত অফিস ও আদালত এবং বেসরকারি অফিস শুধু জরুরি কাজ সম্পাদনের জন্য সীমিত পরিসরে প্রয়োজনীয় জনবলকে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থাপনায় অফিসে আনা-নেওয়া করেছিল। শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পরিবহন ব্যবস্থাপনায় আনা-নেওয়া করা হয়। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএকে শিল্প-কারখানা এলাকার কাছাকাছি সুবিধাজনক স্থানে তাদের শ্রমিকদের জন্য ফিল্ড হাসপাতাল বা চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছিল।

জনপ্রশাসনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যখন অফিস সীমিত পরিসরে খোলা রাখা হয়, তখন বোঝাই যাচ্ছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ২০২১ সালের এপ্রিলে যদি এই অবস্থা হয়, তখন তার আগে পরিস্থিতি খুব একটা ভালো ছিল বলে মনে হয় না। এই অবস্থায় জেলা প্রশাসন কীভাবে প্রশিক্ষণের আয়োজন করল, তা বিস্ময়কর। আর তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির প্রশিক্ষণ আয়োজন করা কী এমন জরুরি বিষয় ছিল, তা বোঝা যাচ্ছে না। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির প্রশিক্ষণ আয়োজন করে এমন কী সুবিধা পাওয়া যাবে, তাও বোধগম্য নয়। আর যেখানে সবকিছু বন্ধ এবং সরকারই বলেছে, সীমিত পরিসরে অফিস করতে সেখানে দিবসগুলো পালনের আনুষ্ঠানিকতা কীভাবে আয়োজন করা হয়েছিল, তা রহস্যজনক। যাই হোক, বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত হওয়া দরকার।’

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এমন চিত্র শুধু ফরিদপুরেরই নয়, সারা দেশে একই অবস্থা। কন্টিজেন্সি ফান্ড ব্যবহারেও নানা অনিয়ম হয়েছে। মহামারীকালীন কেনাকাটায়ও অসম ব্যয় হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে যা যা অফিসে লাগে সেসব নিশ্চয়ই সীমিত পরিসরের অফিসে লাগেনি। কিন্তু প্রায় সব অফিসই স্বাভাবিক সময়ের মতো ব্যয় দেখিয়েছে। ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অফিসের নামে ২০২০-২১ অর্থবছরে কন্টিজেন্সি খাতে বরাদ্দ ছিল ১১ লাখ টাকা। খাতা-কলমে যার পুরোটাই ব্যয় দেখানো হয়েছে।

দেশের স্বাধীনতার আগে থেকেই জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এই কন্টিজেন্সি ফান্ড বিদ্যমান, যা নিয়ে বিভিন্ন সময় বিতর্ক দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সর্বোচ্চ অভিভাবক এবং সরকারের প্রতিনিধি (কমিশনার) হিসেবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ঘটনা, জনগণের প্রয়োজন ইত্যাদি মেটানোর জন্য এবং সরকারের প্রতিনিধির আগমনে দেখভাল করা, আদর আপ্যায়ন করা, উপঢৌকন দেওয়া ইত্যাদি প্রয়োজন মেটানোর জন্য স্থানীয়ভাবে আর্থিক তহবিল গঠন করা হয়, যা সরকার অনুমোদিত। এই তহবিলকে কন্টিজেন্সি ফান্ড বা স্থানীয় তহবিল বলা হয়। এই ফান্ড অডিট করার জন্য অডিট বিভাগের বেশ তোড়জোড় থাকলেও কার্যকর হয়নি। এই ফান্ড নিয়ে একসময় জাতীয় সংসদেও আলোচনা হয়েছে।