মুফতি মামুন আব্দুল্লাহ কাসেমী তরুণ গবেষক আলেম হিসেবে ইতিমধ্যে সারা দেশে খ্যাতি অর্জন করেছেন। কওমি মাদ্রাসার সূতিকাগার ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দে দাওরায়ে হাদিস পড়ার পর একে একে ইফতা, উলুমুল হাদিস ও আদব, উচ্চতর এই তিনটি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে দেশে এসে শিক্ষকতায় যোগ দেন রাজধানীর জামিয়া ইসলামিয়া লালমাটিয়াতে। বেশ কিছুদিন প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা সচিবের দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি নিজেও একটি উচ্চতর ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাসহ আনুষঙ্গিক নানা বিষয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন অভিজ্ঞ এ শিক্ষাবিদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বেলায়েত হুসাইন।
দেশ রূপান্তর : বড় একটি মাদ্রাসার শিক্ষা সচিবের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে আপনার, পাশাপাশি একটি মাদ্রাসার পরিচালকও আপনি। সেই অবস্থান থেকে বর্তমান কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা কতটা সময়োপযোগী?
মুফতি মামুন আব্দুল্লাহ কাসেমী : কওমি শিক্ষাব্যবস্থা দারুল উলুম দেওবন্দ আন্দোলনের আদর্শস্নাত একটি সম্পূর্ণ ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা। সে হিসেবে এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পরকালীন চিন্তামুখিতা, নৈতিক-মানবিক উৎকর্ষ সাধন এবং ধর্মীয় রক্ষণশীলতার লালন ও সংরক্ষণ। আর উদেশ্য হলো, সামগ্রিকভাবে মুসলিম উম্মাহর দ্বীন ও ইমানের রক্ষণাবেক্ষণ। কওমি মাদ্রাসা বুনিয়াদিভাবে সমাজের অপরিহার্য চাহিদা ও প্রয়োজন পূরণের নিয়ামক হিসেবেই ভূমিকা পালন করে আসছে এবং এ ক্ষেত্রে তার অবদান অপরিসীম ও অনস্বীকার্য। এ জন্য এখানে কেন প্রকৌশলী, ডাক্তার ইত্যাদি হলো না, এমন প্রশ্ন তোলা অযৌক্তিক ও অবান্তর। তবে হ্যাঁ, কওমি মাদ্রাসার যে বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তা বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা, এই দৃষ্টিকোণ থেকে এর পাঠ্যক্রম ও সিলেবাস বিচার-বিশ্লেষণের সুযোগ অবশ্যই আছে এবং থাকতেই হবে।
দেশ রূপান্তর : কওমি মাদ্রাসাগুলোতেও একাধিক সিলেবাস এবং একই সঙ্গে পাঠ্যপুস্তকেও ভিন্নতা রয়েছে। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?
মুফতি মামুন আব্দুল্লাহ কাসেমী : মৌলিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ঠিক রেখে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত একাধিক সিলেবাস, এমনকি পাঠ্যপুস্তকের ভিন্নতা কোনো সমস্যার নয়। কারণ, এ স্তর পর্যন্ত মূলত মূল বিষয়বস্তু ধারণে সক্ষমতা সৃষ্টি করাই আসল উদ্দেশ্য। এটা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কারিকুলামেও লক্ষ্য করা যায়। তবে এরপরের শ্রেণিগুলোতে সিলেবাস ও পাঠ্যপুস্তকে বড় ধরনের তারতম্য থাকাটা অবশ্যই সমস্যা সৃষ্টিকারী। বিশেষ করে সেন্ট্রাল এক্সেমিনেশন লেভেলগুলোতে।
দেশ রূপান্তর : কওমি শিক্ষাসমাপনকারী অনেক আলেম পেশা হিসেবে শিক্ষকতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এটার কারণ কী?
মুফতি মামুন আব্দুল্লাহ কাসেমী : কওমি আলেমদের প্রধান কর্মক্ষেত্র মাদ্রাসায় শিক্ষকতা, এটি বাদ দিয়ে তাদের অনেকের ভিন্ন পেশা বেছে নেওয়ার মৌলিক কারণ যদি বলি, তা হচ্ছে মহান এ পেশার প্রাতিষ্ঠানিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক যথাযথ মূল্যায়নের অভাব। অর্থনৈতিক সীমাহীন সমৃদ্ধি কাম্য না হলেও সামাজিক সম্মানের সঙ্গে চলনশীল একটি বেতন কাঠামো মৌলিক প্রয়োজন। কিন্তু কওমি শিক্ষকরা সেটা পান না। পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসার একজন শিক্ষককে গভর্নিং বডি ও প্রিন্সিপালদের অপ্রয়োজনীয় এবং অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও ব্যক্তি আক্রোশের শিকার হওয়ার বিষয়টি কে অস্বীকার করবে? এ রকম নানাবিধ প্রতিকূলতার কারণে তারা শিক্ষকতাবিমুখ হচ্ছে। আর বর্তমানে কওমি মাদ্রাসার মেধাবী ও প্রতিভাবান আলেমদের মধ্যে শিক্ষকতার হার যেভাবে আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে, এটি প্রলয়ঙ্করী ভয়াবহতার পূর্বাভাস বললে অতুক্তি হবে না।
দেশ রূপান্তর : সামনে কোরবানির ঈদ। এ উপলক্ষে মাদ্রাসাগুলো পশুর চামড়া কালেকশন করে থাকে। আমরা যেমনটা জানি যে, এখান থেকে মাদ্রাসা আর্থিকভাবে বেশ উপকৃত হয়। এরপরও ঈদের মতো আনন্দঘন একটি দিনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দিয়ে এভাবে কালেকশনের বিষয়টি অনেকে ভালো চোখে দেখেন না। আপনি এটাকে কীভাবে দেখেন?
মুফতি মামুন আব্দুল্লাহ কাসেমী : ঈদে চামড়া কালেকশনকে ভালো চোখে দেখা তো দূরের কথা, চলমান এই প্রক্রিয়াকে শরীয়তের মেজাজ ও মনোভাবের আনুকুল্যসিদ্ধ বলার কোনো সুযোগ নেই। আর সমাজের মুসলমানদের সহিহ-শুদ্ধভাবে জবাই ও কোরবানি করার যে সেবার কথা বলা হয়, এর জন্য ছাত্র-শিক্ষকের প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতার কোনো প্রয়োজন নেই। আলহামদুলিল্লাহ, এখন প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ স্থানীয় আলেম-ওলামাদের পর্যাপ্ততা সবার সামনেই রয়েছে। এ ছাড়া মাদ্রাসা ছুটি হয়ে গেলে এই শিক্ষার্থীরাই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এই সমাজসেবার কাজটি আঞ্জাম দিতে পারবে। দারুল উলুম দেওবন্দের মূলনীতি অষ্টকে অর্থনৈতিক স্থায়ী উৎসের পরিবর্তে সাধারণ মুসলমানদের দান-দক্ষিণাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হলেও চামড়া কালেকশনের চলমান হীন প্রক্রিয়ার কোনোই উল্লেখ নেই। দেওবন্দে কোনোকালেই প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতার এই প্রক্রিয়ায় চামড়া কালেকশনের নজির ছিল না, এখনো নেই। দেওবন্দ চামড়া কালেকশনের জন্য পারিশ্রমিক দিয়ে শ্রমিক নিয়োগ করে। তবে ছাত্রদেরও এখানে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ করার সুযোগ রাখা হয়। আমাদের দেশের মাদ্রাসাগুলোও এমনটি করতে পারে।
দেশ রূপান্তর : দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে তাকমিল (মাস্টার্স) সমাপ্ত করলে তাদের ‘কাসেমী’ উপাধি দেওয়া হয়। আমাদের দেশে কাসেমীর সংখ্যা অনেক। আসলে কাসেমী কি শুধু একটি উপাধি নাকি এটি একটি চেতনা?
মুফতি মামুন আব্দুল্লাহ কাসেমী : ‘কাসেমী’ নিছক কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উপাধি নয়, যা রসমিভাবে কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা সনদ নিলেই প্রাপক হওয়া যায়। বরং এটি একটি চিন্তা-চেতনার প্রতীক, একটি নীতি-আদর্শের বহিঃপ্রকাশ। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দেওবন্দ থেকে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেও দারুল উলুমের আকাবির ও আসলাফ থেকে অবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরায় প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত চিন্তাচেতনা ও নীতি-আদর্শ লালন-পালন না করলে বা করতে ব্যর্থ হলে কাসেমী উপাধি ব্যবহার করার নৈতিক অধিকার থাকে না। মুফতি সাঈদ আহমাদ পালনপুরী (রহ.) বলতেন, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে সনদ লাভ না করলেও যদি কেউ উক্ত চিন্তা-চেতনাকে সঠিক অর্থে সংরক্ষণ করে, তাহলে সেই আসল দেওবন্দি (কাসেমী)।
দেশ রূপান্তর : পড়াশোনা শেষে একজন কওমি আলেম পেশা হিসেবে কোনটা বেছে নেবেন? এ বিষয়ে কি দেওবন্দের কোনো নির্দেশনা আছে কি?
মুফতি মামুন আব্দুল্লাহ কাসেমী : দারুল উলুম দেওবন্দ তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শিক্ষার্থীদের বিশেষ কোনো পেশায় সীমাবদ্ধ করেনি এবং করেও না। মুসলিম উম্মাহর ইমান-আকিদা সংরক্ষণই দারুল উলুম দেওবন্দের মূল উদ্দেশ্য। দাওয়াহ-এর কাজ হিসেবে শিক্ষকতা, ইমামতি, তাবলিগ, লেখালেখি, প্রকাশনার সঙ্গে সঙ্গে মডার্ন টেকনোলজি, বৈশ্বিক টেকনিক্যাল এডুকেশনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। স্বয়ং দারুল উলুম দেওবন্দে এ ধরনের অনেক আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষা ফ্যাকালটিও রয়েছে। সুতরাং কোনো সুনির্দিষ্ট পেশায় সীমাবদ্ধ করা দারুল উলুম দেওবন্দের সঠিক ও দায়িত্বশীল প্রতিনিধিত্ব নয়।