বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ। বাজেটের আকার ছোট হয়েছে ব্যয় কিন্তু কমেনি। বাজেটের অনেক বরাদ্দ আছে যেটা কোনো কাজে লাগবে না। হাসপাতাল করলে মেশিনপাতি থাকবে না, ডাক্তার থাকবে না। ব্রিজ করবে কিন্তু সেখানে রাস্তা নেই। কালভার্ট করবে কিন্তু রাস্তা নেই। স্কুল করবে ছাত্র থাকবে না। এসব প্রকল্প অহেতুক। এসব প্রকল্পই কালো টাকা সৃষ্টি করে। নতুন করে কিছু করার দরকার নেই। যেগুলো আছে সেগুলো সুসংহত করুন। তারপর এনবিআরের সংস্কার দরকার। এখানে জনবল না থাকলে জনবল দিতে হবে। এটা কঠিন কিছু না। এরপর জীবিকা ও ব্যবসা। এই বাজেটে এগুলোরও প্রত্যাশিত কিছু নেই। এছাড়া সংস্কার করতে হবে বাজার ব্যবস্থা ও ব্যাংক। আর ব্যবসা-বাণিজ্যের সুষ্ঠু পরিবেশের জন্য দেশে সামগ্রিক স্থিতিশীলতা থাকা দরকার।
গতকাল বৃহস্পতিবার ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত বাজেট শীর্ষক এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, এটা গতানুগতিক বাজেট। বাজেটের যে সেøাগান সেখানে সুখী হওয়ার কিছু নেই। গরিবদের সুখী হওয়ার মতো কিছু নেই। বড় বড় কুমড়া কারা খাচ্ছে? মানুষ ভাতের সঙ্গে কলার ঝোল খাচ্ছে। এটা হলো সুখ। পঞ্চাশ বছর হলো আমরা পতাকা, ভূখ-, জাতীয় সংগীত পেলেও ভেতরের পিলার নড়েবড়ে। আমাদের পিলার হলো বাজার ও স্টক মার্কেট।
তিনি বলেন, এনবিআরের সংস্কার দরকার। এখানে জনবল না থাকলে জনবল দিতে হবে। এটা কঠিন কিছু না। এরপর জীবিকা ও ব্যবসা। এই বাজেটে এগুলোরও প্রত্যাশিত কিছু নেই। এছাড়া সংস্কার করতে হবে বাজারব্যবস্থা ও ব্যাংক। আর ব্যবসা-বাণিজ্যির সুষ্ঠু পরিবেশের জন্য দেশে সামগ্রিক স্থিতিশীলতা থাকা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের যথেষ্ট ক্ষমতা আছে। সব কিছু যে তাদের ওপর চেপে বসে আছে এমন না। তারা চাইলে কিছু করতে পারে।
তিনি বলেন, উন্নত দেশ, আমরা কতটুকু উন্নত, ১২৫টি দেশের মধ্যে ১০৫। পাকিস্তানও আমাদের চেয়ে ইন্টারনেটে এগিয়ে। ইন্টারনেট, মোবাইল টেলিফোন সব জায়গায় ট্যাক্স। স্পিড নেই, ব্যান্ডউইথ নেই। কীসের উন্নত-স্মার্ট বাংলাদেশ। বাজেটে কিছু প্রায়োরিটি সেট করা দরকার ছিল। মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভ। এসব বিষয়ে লক্ষ দেওয়া দরকার ছিল।
সালেহউদ্দিন বলেন, সরকার ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা লোন নেবে। এটা হলে বেসরকারি খাত ব্যবসা করতে পারবে না। পরে দেখা যাবে গুলশানের রেস্টুরেন্টগুলোতে ভিড় বাড়বে। ট্যাক্স আসবে কোন জায়গা থেকে? সামর্থ্যবানদের থেকে ট্যাক্স নেন। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ কর বাড়ান। ভ্যাট বাড়ালে সবার ওপর এর প্রভাব পড়ে।
সভায় সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত দুই বছরে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। এমন অবস্থায় আগামী অর্থবছরের জন্য জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে। দেশে এখন ৯ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতি চলমান। আর আগামী বাজেটে মূল্যস্ফীতি ধরা হয়েছে ৬ দশদিক ৫ শতাংশ। যেটা অর্জন সম্ভব নয়। কারণ এক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে। আর দুই বছর ধরেই মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী। তারপর রয়েছে বাজার ব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেট। এছাড়া ডলারের বিনিময় হার বাড়ার কারণে আমাদের আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যাবে। এই পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব নয়।
ব্যাংকিং খাত নিয়ে তিনি বলেন, বাজেটে তিন পৃষ্ঠায় ব্যাংকিং খাত নিয়ে বলা হয়েছে কিন্তু এটার সংস্কার নিয়ে কিছুই বলা হয়নি। যদি একটি খাতকে ধরতে হয় তাহলে সেটা হচ্ছে ব্যাংকিং খাত। যেটা খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। খেলাপি ঋণ নিয়ে তারা এখন গর্ব করে। ঋণ ফেরত দেবে না, কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করবে এটা একটা নীতি-নৈতিকতাহীন কালচারে পরিণত হয়েছে। যারা ঋণখেলাপি তারাই ব্যাংকের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। তারাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নজরদারি করে এবং বিভিন্ন বিষয় চাপিয়ে দিচ্ছে।
ইআরএফ সভাপতি মোহাম্মদ রেফায়েত উল্লাহ মীরধার সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এ কে এনামুল হক, বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. মনজুর হোসেন, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকনসহ ইআরএফের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।