এইবার পবিত্র ঈদুল আজহায় রাজধানীতে সব থেকে বেশি পশু কোরবানি হয়েছে। রাজধানীতে পশু কোরবানির জন্য খোলা স্থান না থাকায় রাস্তাতেই বেশিরভাগ পশু কোরবানি করা হয়। কোরবানির পর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রতি বছরই বাড়তি প্রস্তুতি রাখে দুই সিটি কর্পোরেশন। নির্দিষ্ট সময়ে বর্জ্য অপসারণে দুই সিটি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
অতীতের ঈদগুলোতে সময়মতো বর্জ্য অপসারণ সম্ভব না হলেও এই ঈদে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বিষয়টি সত্যতা পাওয়া গেছে। এদিকে তাড়াতাড়ি বর্জ্য অপসারণ হওয়ায় স্বস্থির কথা জানিয়েছে নগরবাসী। তবে কিছু এলাকায় বর্জ্য অপসারণ করা হলেও রক্তের দুর্গন্ধ রয়েই গেছে। পর্যাপ্ত পানি ও ব্লিচিং পাউডার না ছিটানোয় এই দুর্গন্ধ বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী। এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের চেয়ে বর্জ্য অপসারণে এগিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন।
আজ বুধবার ধানমন্ডি লেকে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, কোরবানি হওয়া পশুর বর্জ্য নিদিষ্ট সময়েই অপসারণ করা হয়েছে। কিন্তু পশুর রক্ত লেকের পাশেই জমাট বেঁধে ছিল। ফলে তা থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। সকালে লেকে হাঁটতে আসা অনেকেই বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এছাড়াও কয়েকটি এলাকা ঘুরে বর্জ্য অপসারণ চিত্র দেখা গেলেও রক্তের দুর্গন্ধ রয়েই গেছে।
গত ১৬ জুন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম ছয় ঘণ্টার মধ্যে কোরবানির বর্জ্য অপসারণের ঘোষণা দেন। অন্যদিকে ২৪ ঘণ্টার আগেই কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণের ঘোষণা দেন দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস।
এদিকে পূর্ব ঘোষিত ছয় ঘণ্টার মধ্যেই শতভাগ কোরবানির বর্জ্য অপসারণের দাবি করেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম। মেয়র আতিকুল সাংবাদিকদের বলেন, 'সবার সহযোগিতায় পূর্ব ঘোষিত ছয় ঘণ্টায় ঢাকা উত্তর সিটির কোরবানির বর্জ্য শতভাগ অপসারণ করা সম্ভব হয়েছে। সচেতন নাগরিকদের আন্তরিক সহযোগিতায় এটি করতে পেরেছি। আমি নগরবাসীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আগামী দিনেও ঢাকা শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখতে জনগণ ও সিটি করপোরেশনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।'
তিনি আরও জানান, দুপুর ২টা থেকে বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম শুরু করে রাত ৮টায় নির্ধারিত ছয় ঘণ্টায় সবগুলো ওয়ার্ডের শতভাগ বর্জ্য অপসারণ শেষ করে ডিএনসিসি। ডিএনসিসির সবগুলো ওয়ার্ড থেকে সোমবার রাত ৮টা পর্যন্ত ২ হাজার ১০১ ট্রিপে প্রায় ১০ হাজার ৩৭৪ (দশ হাজার তিনশত চুয়াত্তর) মেট্রিক টন বর্জ্য অপসারণ করা হয়।
ডিএনসিসির বর্জ্য বিভাগ জানায়, ৫৪টি ওয়ার্ডের সব এলাকার শতভাগ বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বর্জ্য অপসারণে ১০ হাজারের অধিক কর্মী কাজে নিয়োজিত ছিল।
মিরপুর-১০ বাসিন্দা আদনান আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে কোরবানির ঈদের পর দিনের পর দিন রাস্তার পাশে বর্জ্যের স্তুপ হয়ে থাকতো। দুর্গন্ধে রাস্তা দিয়ে হাঁটা যেত না। কিন্তু এবার নির্দিষ্ট সময়ে বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। তবে রক্ত পুরোপুরি পরিস্কার করা হয়নি। পর্যাপ্ত ব্লিচিং পাউডার না ছিটানোয় এই দুর্গন্ধ। তবে সর্বোপুরি আমরা খুশি। এই ধারা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে বলে প্রত্যাশা করি।’
এদিকে কোরবানির পশুর বর্জ্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অপসারণের ঘোষণা দিয়েছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। মেয়রের ঘোষণা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের আগেই ঈদের দিনে কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণ করতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করেছেন ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে পুরান ঢাকার কিছু এলাকায় ঈদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনেও পশুর বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা গেছে। যা থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। তবে বুধবার (১৯ জুন) রাতের মধ্যেই সেগুলো অপসারণ করবে বলে জানিয়েছে ডিএসসিসি।
তবে বুধবার (১৯ জুন) সকালে দক্ষিণ সিটির ওয়ারি, দয়াগঞ্জ, ধোলাইখাল ও দক্ষিণ বনশ্রীসহ বেশকিছু এলাকাতে গিয়ে দেখা গেছে, রাস্তার পাশে আজও বর্জ্য স্তুপ করে রাখা আছে। কোরবানির বর্জ্য অপসারিত না হওয়ায় দুর্গন্ধে টেকা দায় হয়ে পড়েছে সেখানকার বাসিন্দাদের।
দক্ষিণ সিটির ধোলাইখাল এলাকার বাসিন্দা আবু জাফর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখনও কিছু কিছু জায়গায় কোরবানির বর্জ্য দৃশ্যমান। তবে তা আগের বছরের তুলনায় খুবই কম। আগে ঈদের কয়েকদিন পরেও কোরবানির বর্জ্য ময়লার ভাগাড় হয়ে থাকতো। কিন্তু এবছর তেমনটি নেই। আশা করি আগামীবছর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই সকল বর্জ্য অপসারণ করা হবে।’ তবে ডিনসিসি কর্মকর্তাদের দাবি, ঈদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনেও অনেকে কোরবানি করে থাকেন তাই এই বর্জ্য রয়ে গেছে। সেগুলো পরিষ্কার করা হচ্ছে।
ডিএসসিসির জনসংযোগ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এবার কোরবানির হাট ও কোরবানির জবাই করা পশুর বর্জ্য অপসারণে ১০ হাজার ২৪৭ জন জনবল কাজ করেছে। আর কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণে ২৪ ঘণ্টার লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হলেও প্রথম দিনে তা ১০ ঘন্টা ১৫ মিনিটে সম্পন্ন করা হয়েছে এবং দ্বিতীয় দিনে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সময়ে ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৫৯টি ওয়ার্ডের বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। সব মিলে গতকাল মঙ্গলবার (১৮ জুন) বিকেল ৫টা পর্যন্ত ৩ হাজার ৬৫৫টি ট্রিপের মাধ্যমে ১৭ হাজার ৬৯২ মেট্রিক টন বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সংযুক্ত হয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন শেখ ফজলে নূর তাপস। এ সংবাদ সম্মেলনে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপনে উৎপন্ন বা সৃষ্ট বর্জ্য অপসারণে সামষ্টিক কার্যক্রম নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
এসময় নগরের বেশ কয়েকটি জায়গায় বর্জ্য পড়ে থাকা নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তাপস বলেন, কোরবানির পশু জবাই বিভিন্ন সময়ে হয়ে থাকে। একেকজন একেক সময়ে তা করে থাকে। সুতরাং আমরা পরিষ্কার করে আসার পরে অনেকেই জবাইকৃত সেসব পশুর বর্জ্য বিভিন্ন জায়গায় ফেলে রাখেন। এ ধরনের বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা থাকে। এছাড়াও অনেকেই কোরবানির পশুর বর্জ্যের সাথে হাটের বর্জ্য মিলিয়ে ফেলেন। এছাড়া দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনেও অনেকেই কোরবানি থাকে। কিন্তু শতভাগ পরিষ্কার হওয়ার পরেই আমরা তা ঘোষণা দেই এবং প্রথম দিনের বর্জ্য বেশ কয়েকটি জায়গায় পড়ে ও তা অপসারণ করা হয়নি, সে বিষয়টি সঠিক নয়।'