রেফারেল সম্পর্কে জানেন না ৫৮% রোগী

উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল পরিবর্তনের ক্ষেত্রে দেশে ৬৮ শতাংশ রোগীর পছন্দ বেসরকারি হাসপাতাল। অর্থাৎ বেসরকারি হাসপাতালে আসা মোট রোগীর ৬৮ শতাংশই আসছেন নিজ উদ্যোগে। বাকি ৩২ শতাংশ রোগী আসছেন আগের হাসপাতালের পরামর্শে। অন্যদিকে, সরকারি হাসপাতালে আসা মোট রোগীর ৫৬ শতাংশই আসছেন নিজ উদ্যোগে ও আগের হাসপাতাল থেকে রেফার হয়ে আসছেন ৪৪ শতাংশ রোগী। 

সে হিসেবে উন্নত চিকিৎসায় হাসপাতাল পরিবর্তনের ক্ষেত্রে রোগীদের কাছে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে বেসরকারি হাসপাতাল। অর্থাৎ সরকারি হাসপাতালের চেয়ে বেসরকারি হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা ১২ শতাংশ বেশি। কিন্তু আগের হাসপাতাল থেকে রোগী রেফারের ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন সরকারি হাসপাতালকে। অর্থাৎ আগের হাসপাতালের পরামর্শে বেসরকারি হাসপাতালের চেয়ে সরকারি হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা ১২ শতাংশ বেশি। আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা স্প্রিঙ্গার নেচারের বিএমসি হেলথ সার্ভিসেস রিসার্চ সাময়িকীকে প্রকাশিত সর্বশেষ এক গবেষণায় এই বাংলাদেশে রেফারেল পদ্ধতির এই চিত্র উঠে এসেছে। ২১ মে প্রকাশিত গবেষণার শিরোনাম - ‘পেসেন্ট সেলফ-রেফারাল প্যাটার্নস ইন আ ডেভেলপিং কান্ট্রি: ক্যারেক্টারস্টিকস, প্রিভেলেন্স, অ্যান্ড প্রেডিক্টরস’। দেশে বিদেশে কর্মরত দেশের ১৬ জন গবেষক এই গবেষনাটি করেছেন। 

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৬২৬ জন রোগী ও বেসরকারি ডেলটা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ১৯৬ জন রোগীর ওপর গবেষণাটি করা হয়। এসব রোগী ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এই দুই হাসপাতাল ভর্তি হয়েছিলেন।

গবেষকরা বলছেন, দেশে রেফারেল পদ্ধতি না থাকায় একদিকে যেমন রোগীদের সঠিক চিকিৎসা পেতে দেরি হচ্ছে, তেমনি চিকিৎসায় ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। অনেকক্ষেত্রে সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছে না। 

এ ব্যাপারে এই গবেষণা দলের একজন ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর এর সিংহেল্থ ডিউক-এনইউএস গ্লোবাল হেল্থ ইন্সটিউটের সহযোগি অধ্যাপক ও জনস্বাস্থ্যবিদ ড. তৌফিক জোয়ার্দার সিঙ্গাপুর থেকে দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই গবেষণার মধ্য দিয়ে দুটি বিষয় স্পষ্ট। একটি হলো সরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার প্রতি মানুষের আস্থা কম। দ্বিতীয়টি হলো দেশের মানুষ রেফারেল পদ্ধতি সম্পর্কে জানেন না। প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য এক চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে অন্য চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানোর যে প্রাতিষ্ঠানিক ‘রেফারেল পদ্ধতি’, দেশে সেটার কোন প্রতিষ্ঠানিক রূপ নেই। এটি প্রয়োগে নীতিনির্ধারকদেরও কোন উদ্যোগ নেই। রেফারেল পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত করতে হলে সরকারকে প্রাথমিক পর্যায়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় মান বাড়াতে হবে। তা না হলে রোগীদের সেখানে নেওয়া যাবে না, তারা নিজ উদ্যোগে অন্য জায়গায় চলে যাবে। 

রেফারেল সম্পর্কে জানে না ৫৮% রোগী

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫৮ শতাংশ রোগীর রেফারাল পদ্ধতি সম্পর্কে কোন ধারণা নেই। ৫৯ শতাংশ রোগী নিজ উদ্যোগে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ভর্তি হন। বাকি ৪১ শতাংশ রোগী ভর্তি হন আগের হাসপাতালের চিকিৎসকদের পরামর্শে। 

গবেষণায় রোগীর নিজ উদ্যোগে হাসপাতাল পরিবর্তনের পেছনে মোটাদাগে চারটি কারণ বেরিয়ে এসেছে। এর মধ্যে ২৮ শতাংশ রোগী হাসপাতাল পরিবর্তন করেছেন চিকিৎসার ঘাটতি, ২৩ শতাংশ অপর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা, ১৪ শতাংশ জটিল পরিস্থিতি ও ৮ শতাংশ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে।
 
অন্যদিকে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রোগীদের অন্য হাসপাতালে রেফার করা হচ্ছে চারটি কারণে। এর মধ্যে ৫৩ শতাংশ রোগীকে রেফার করা হচ্ছে চিকিৎসার অপর্যাপ্ত সুযোগসুবিধার অভাবে, ৪৭ শতাংশ রোগীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাব, ৪৪ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে জটিল পরিস্থিতি ও ৩১ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব।

রোগীদের পছন্দ বেসরকারি হাসপাতাল

গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতাল পরিবর্তনের ক্ষেত্রে রোগীদের ৬৮ শতাংশ নিজ উদ্যোগে বেসরকারি হাসপাতালকে বেছে নিচ্ছেন। অন্যদিকে, সরকারি হাসপাতালে এই সংখ্যা ৫৬ শতাংশ।

প্রাতিষ্ঠানিক রেফার রোগীর ৪২% বেসরকারি ক্লিনিকের

গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রেফার করা সর্বোচ্চ ৪২ শতাংশ রোগী বেসরকারি ক্লিনিকের। এরপর ১০ শতাংশ রোগী পাঠানো হচ্ছে কমিউনিটি ক্লিনিক, ৬ শতাংশ ইউনিয়ন সাব-সেন্টার, ২৫ শতাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ২২ শতাংশ জেলা হাসপাতাল ও বাকি ২২ শতাংশ বিভিন্ন টারশিয়ারি পর্যায়ের হাসপাতাল থেকে। 

প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবায় অনাস্থা মুল কারণ

গবেষণার উপসংহারে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ রোগীর রেফারেল পদ্ধতিকে পাশ কাটিয়ে টারশিয়ারি বা তৃতীয় স্তরের হাসপাতালে চলে আসছেন। এসব রোগীদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার প্রতি কোন আস্থা নেই। এই সংকট কাটাতে গবেষণায় দুটি সুপারিশ করা হয়েছে- দেশে শক্তিশালী রেফারাল পদ্ধতি চালু করা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর দক্ষতা বাড়ানো।

এ ব্যাপারে ড. তৌফিক জোয়ার্দার দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিজের সিদ্ধান্তে বিভিন্ন হাসপাতালে যে সব রোগী আসছে, তারা প্রাথমিক পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেবায় যত্ন পাচ্ছে না। অথচ রেফারেল পদ্ধতি থাকলে রোগীদের বোঝানো যেত যে প্রথমে চিকিৎসার পরামর্শের জন্য ছোট জায়গায় যেতে হবে। সেখান থেকে চিকিৎসকরা তাকে সঠিক জায়গায় রেফার করবে। কিন্তু উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেবায় আস্থা না থাকায় রোগীরা সেখানে না গিয়ে সরাসরি বড় জায়গায় নিজ সিদ্ধান্তে চলে আসছে।

এই গবেষক আরও বলেন, দেশে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৭৯ শতাংশ শয্যায় রোগী ভর্তি থাকে। জেলা হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা শয্যার চেয়ে বেশি, অর্থাৎ ১৪৮  শতাংশ ও মেডিকেল কলেজ পর্যায়ে ১৩৮ শতাংশ। সে হিসেবে শয্যা বেশি ফাঁকা থাকে উপজেলা পর্যায়ে। অর্থাৎ প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবায় মানুষের আস্থা কম। যে সব রোগী নিজ সিদ্ধান্তে হাসপাতাল বাছাই করছেন, তাদের কাছে রেফারেল পদ্ধতির ব্যাপারে কোন তথ্য নেই। প্রথমে সে যেখানে যায়, সেখানে রেফারেলের ব্যাপারে কিছু বলা হয় না। এ অবস্থা চলতে থাকলে রোগীর নিজ সিদ্ধান্তে হাসপাতাল বেছে নেবে, চিকিৎসার খরচ ও দুর্ভোগ বাড়বে।