কে হচ্ছেন ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক ব্রিটেনের বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ছয় মাস আগে আগাম জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। নানা জল্পনা-কল্পনার পর মে মাসের ২২ তারিখ ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট থেকে আগামী ৪ জুলাই জাতীয় নির্বাচনের এই ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু হঠাৎ কেন আগাম নির্বাচন চাইছেন ঋষি সুনাক? তবে অনেকের মনে আশা ছিল, জাতীয় নির্বাচন সময় মেনে আগামী শরৎকালে অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী সুনাক দুই বছর তার দপ্তরে থাকতে পারবেন। সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক অগ্রগতির বড় সুযোগ পাবেন সুনাক। কিন্তু সেই প্রত্যাশা অধরাই রয়ে গেল। তবে এটা স্পষ্ট যে, সিদ্ধান্তটা অনেকটা যেন ছুরির ফলার ওপর ঝুলেছিল। চাপে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী সুনাক। আগাম নির্বাচন দ্রুত আয়োজনের বিষয়ে যারা প্রধানমন্ত্রীকে চাপ দিচ্ছিলেন, তাদের মধ্যে উপপ্রধানমন্ত্রী অলিভার ডওডেন নিজেও ছিলেন। আগাম নির্বাচনের পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের যুক্তি, পরিস্থিতি এখনকার চেয়ে আরও ভালো নাও হতে পারে। তাই যত বিলম্ব হবে, কনজারভেটিভ সরকারের ওপর থেকে ভোটারদের আস্থা কমতে পারে। এতে করে ক্ষমতাসীনদের ঝুঁকি আরও বাড়বে। আগাম নির্বাচন করলে প্রধানমন্ত্রী সুনাক তার কিছু আপাত সফলতার কথা প্রচারের সুযোগ পাবেন। এর একটি হলো মুদ্রাস্ফীতির এখনকার হার। যদিও এটা সরকারের কাজের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে না। আরেকটি বিষয় আছে অভিবাসন প্রত্যাশীদের নিয়ে। বেশ কিছু আশ্রয়প্রার্থীকে রুয়ান্ডায় পাঠাতে চায় যুক্তরাজ্য সরকার। এই প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি। তবে শিগগিরই তা শুরু হতে পারে। এমনকি নির্বাচনী প্রচারের ডামাডোলেও পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা হতে পারে। বলা হচ্ছে, ভোটের লড়াইয়ে এই পরিকল্পনা প্রতিবন্ধক হয়ে উঠতে পারে। তাই হয়তো নির্বাচনের ডামাডোলে এটা নিয়ে নতুন করে ভাববে সরকার।

নির্বাচনী প্রচার শুরুর আগে ও পরে লেবার পার্টিসহ অন্যরা বারবার বলছেন, পরিবর্তন দরকার। আর এটা পরিবর্তনের জন্য উপযুক্ত সময়। এর বিপরীতে কনজারভেটিভরা বারবার ভোটারদের একটি কথাই বলছেন। গত ২ মে ২০২৪-এ অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ব্যাপক ভরাডুবি হয় ঋষি সুনাকের কনজারভেটিভ পার্টির। এতে লেবার পার্টির আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে জনমত জরিপের ফল সত্য প্রমাণ করে সরকার বদলে যেতে পারে। এবং তারা ভুল প্রমাণিত হতে পারেন। আর সেটা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের একটি হতে পারে। যুক্তরাজ্যে গত ৪০ বছরের ইতিহাসে এমন বিপর্যয়ে পড়েনি সুনাকের কনজারভেটিভ পার্টি। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর পার্লামেন্টে প্রথম প্রশ্নোত্তর পর্বে বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতার আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছিল ঋষি সুনাককে, যেখানে অর্থনৈতিক সংকটের জন্য শাসক দলের তীব্র সমালোচনার পাশাপাশি নতুন সাধারণ নির্বাচনের দাবি উঠেছিল প্রথম থেকেই। সুনাক এর জবাবে বলেছেন, তার দল ভোটে জয়ী হয়েই ক্ষমতায় এসেছে বলে কনজারভেটিভ পার্টির নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের ম্যান্ডেট তার আছে এবং তিনি সবসময়ই জনগণের সুরক্ষায় কাজ করে যাবেন। প্রায় পাঁচ বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার ধারাবাহিকতায় যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির এমপিদের সমর্থনে দলের নেতা নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছিলেন ঋষি সুনাক। কিন্তু তার পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই এক ধরনের বাধ্যবাধকতার মধ্যেই ঘোষণা দিলেন আগাম নির্বাচনের। এই সুবাদেই চলছে প্রচার-প্রচারণা। এরই অংশ হিসেবে একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে যোগ দেওয়ার কথা ছিল প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের ডি-ডে স্মরণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠান থেকে আগেভাগে চলে যান তিনি। এতে হিতে বিপরীত হয়েছে। সমালোচনার মুখে অনুষ্ঠান ত্যাগের জন্য ক্ষমা চাইতে হয়েছে তাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪৪ সালের ৬ জুন ফ্রান্সের নরম্যান্ডি দ্বীপে হামলা চালায় মিত্রপক্ষের সেনারা। দিনটিকে ডি-ডে বলা হয়। দ্বীপটিতে জার্মান নেতৃত্বাধীন অক্ষশক্তির সঙ্গে তুমুল লড়াই হয় তাদের। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দ্বীপটিতে সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছায় মিত্রপক্ষ। ঘুরে যায় যুদ্ধের মোড়। এই লড়াইয়ের এক বছর পর পরাজয় স্বীকার করে জার্মানি। নরম্যান্ডি থেকে ফিরে ব্রিটিশ টেলিভিশন চ্যানেল আইটিভিতে প্রচারণা-সংক্রান্ত একটি সাক্ষাৎকার দেন সুনাক। আইটিভি তার সাক্ষাৎকারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সুনাক ক্ষমা চাইলেও এর আগেই দেশবাসীর মনে তার বিরুদ্ধে অবিশ্বাসের জন্ম নিয়েছে। এ ঘটনায় তারা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় বড় ভুল করলেন তিনি। এ বিষয়ে বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা জোনাথন অ্যাশওর্থ বলেন, আমাদের দেশের সেবায় যারা নিয়োজিত ছিলেন, তাদের সবার সাহসিকতা স্মরণে ডি-ডে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। আমাদের প্রবীণ সেনাদের চেয়ে নিজের টেলিভিশনে উপস্থিতিকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন ঋষি সুনাক। এ থেকে বোঝা যায়, তার কাছে কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অপরদিকে ব্রিটেনের রাজনীতিতে বেশ পরিচিত এক নাম। নাইজেল ফারাজ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া ব্রেক্সিটের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহায়তার কারণে তিনি বেশ আলোচিত। এখন টিভি শো উপস্থাপনা করছেন তিনি। নতুন করে আলোচনায় এসেছেন ৬০ বছর বয়সী ফারাজ। সম্প্রতি তিনি জানিয়েছেন, আগামী মাসের সাধারণ নির্বাচনে লড়বেন তিনি। নেতৃত্ব দেবেন ডানপন্থি রিফর্ম পার্টির। দলটি রিফর্ম ইউকে নামেও পরিচিত। বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, ফারাজের ভোটে দাঁড়ানোর ঘোষণা চাপে ফেলতে পারে প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাককে। কেননা, নিজেদের প্রভাবশালী প্রার্থী না থাকলে সচরাচর ডানপন্থি ভোটারদের ভোট কনজারভেটিভ পার্টির পক্ষে যায়। ডানপন্থি ভোটাররা লেবার পার্টিকে খুব একটা ভোট দিতে চান না। এ পরিস্থিতিতে ফারাজ নির্বাচনে দাঁড়ালে কনজারভেটিভদের ভোট ভাগ হয়ে যেতে পারে।

এর আগে ফারাজ বলেছিলেন, যুক্তরাজ্যে আগামী জুলাইয়ের নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হবেন না; বরং আগামী নভেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জয়ী হতে ভূমিকা রাখতে চান তিনি। এখন ইউটার্ন নিয়েছেন তিনি। বলেছেন, মত বদলে ফেলেছেন। কেননা, রাজনীতির মাঠে যেসব মানুষ দীর্ঘদিন ধরে তাকে সমর্থন করছিলেন, তাদের জন্য ভোটের লড়াইয়ে না নেমে মনঃপীড়ায় ভুগেছেন তিনি। এক সংবাদ সম্মেলনে ফারাজ বলেন, আমরা বিরোধী কণ্ঠস্বর হতে চলেছি। ফারাজের মতে, যুক্তরাজ্যে এখন আর কোনো সরকারি পরিষেবা ঠিকঠাক কাজ করছে না। এমনকি স্বাস্থ্যসেবা এবং সড়ক পরিবহনের মতো সেবা নানা সমস্যায় জর্জরিত। তিনি যুক্তরাজ্যে একটি রাজনৈতিক সংস্কার আনতে আগ্রহী। একসময় কনজারভেটিভ পার্টির রাজনীতি করেছেন ফারাজ। এখনো তিনি তার প্রজন্মের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্রিটিশ রাজনীতিকদের একজন। অভিবাসী মোকাবিলা ও ইইউর বিষয়ে আরও কঠোর নীতি নেওয়ার বিষয়ে তিনি বরাবর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীদের ওপর চাপ দিয়ে এসেছেন। 

অন্যদিকে, লেবার পার্টির নেতা কেয়ার স্টারমারও থেমে নেই। দুই নেতাই ভোটারদের নিজের দলে ভোট দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করছেন। কিন্তু আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে খানিকটা বিপদেই রয়েছেন ঋষি সুনাক। কারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর তার দল কনজারভেটিভ পার্টির ৭৮ জন সংসদ সদস্য জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা নির্বাচনে অংশ নেবেন না। তারা চাইছে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া হোক। এ নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যেই এক ধরনের কোন্দল সৃষ্টি হয়েছে। গত আট বছরে ঋষি সুনাকের দলের ভেতর কোন্দল শেষই হচ্ছে না। যেটা এই মুহূর্তে লেবার পার্টির জন্য একটি বড় সুযোগ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। প্রধানমন্ত্রী সুনাক এমন একটা সময়ে নির্বাচনের ডাক দিয়েছেন যখন কনজারভেটিভ পার্টির জনপ্রিয়তা এখন বলতে গেলে তলানিতে এসে ঠেকেছে। অন্যদিকে, লেবার পার্টি মনে করে, ব্রিটেনে এখন নির্বাচনের প্রয়োজন ছিল। আর ৬১ বছর বয়সী বামনেতা স্টারমার নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য যোগ্য নেতা। গত চার বছর ধরে স্টারমার বিরোধী নেতা হিসেবে আছেন। ভোটারদের কাছে একটাই বার্তা, লেবার সরকার দেশের পরিবর্তন আনবে আশ্বাসের সঙ্গে। আর দেশের এই বেহাল পরিস্থিতিতে শুধু তারাই দেশটিকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্বস্তি থেকে বের করে আনতে পারবেন।

জনমত জরিপ বলছে, কনজারভেটিভ পার্টি বিরোধী লেবার পার্টির চাইতে প্রায় ২০ পয়েন্টে পিছিয়ে আছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে তাদের প্রয়োজন ৩২৬ আসন। আবার, গার্ডিয়ানে প্রকাশিত জরিপ বলছে, লেবার পার্টি অন্তত ৪৭২টি আসন পাবে। ক্ষমতায় থাকা কনজারভেটিভ পার্টির পাওয়ার কথা ৮৫টির মতো আসন। লিবারেল ডেমোক্রেট ও স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি যথাক্রমে ৫০ ও ১৯টির মতো আসন পেতে পারে। বাকি ছোট দলগুলো মিলে পেতে পারে ২৪টির মতো আসন। যেখানে ২০১৯ সালের নির্বাচনে লেবার পেয়েছিল ২০২টি আসন ও কনজারভেটিভ পার্টি ৩৬৫টি। লিবারেল ডেমোক্রেট ও স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি যথাক্রমে ১১ ও ৪৮টি আসন পায়। অন্য ছোট দলগুলো পেয়েছিল ২৩টির মতো আসন। যুক্তরাজ্যের নিয়ম অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন কার্যক্রম শেষ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী কে হবেন তা নিয়ে এখনই বলা না গেলেও, দলগুলোর জনপ্রিয়তা, নিজেদের দলের ঐক্যতা ও কোন্দল সব কিছু পর্যবেক্ষণ করলে একটা প্রশ্ন থেকেই যায় যে, সুনাক কি পারবে আবারও প্রধানমন্ত্রী হতে? নাকি নির্বাচনের দৌড়ে এবার স্টারমারই আসন পাবেন? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে আরও কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক

raihan567@yahoo.com