প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। ছিলেন বাংলাদেশ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন আর্ট গ্যালারি ‘শিল্পাঙ্গন’। প্রগতিশীল পাঠাগার ‘সমাজতান্ত্রিক পাঠাগার’-এর প্রতিষ্ঠাতা। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রথম প্রধান সম্পাদক অকৃতদার এই কবি ও ছড়াকার মারা যান ২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ ঘটাতে চিন্তা পাতায় ছাপা হলো তার লেখা উপসম্পাদকীয়
চীনানে সন্ধ্যায় পৌঁছানোর পরই ডিনারে যেতে হলো। সানতুং প্রদেশটা হচ্ছে চীনের পূর্বাঞ্চলে, তারই রাজধানী চীনান। স্থানীয় পার্টি কর্মকর্তা ও মেয়র ছিলেন এই ডিনারে। তারা আমাকে তিন দিনব্যাপী এখানকার সফরের একটি তালিকা দিলেন। আর কথা বলার সময় সানতুং প্রদেশের নানা গৌরবের কথা প্রসঙ্গে জানালেন যে, মহাদার্শনিক কনফুসিয়াসের জন্মভূমি এই সানতুং প্রদেশেই। আমি চমকে উঠে বললাম, বলেন কী! তার শহর চ্যু ফুতে আমাকে তো যেতেই হবে। আমরা তো ভাবিনি যে, আপনার এই দার্শনিকের প্রতি আকর্ষণ আছে। তা ছাড়া এখনো পথঘাট হয়নি। আমার অন্য প্রোগ্রাম কেটে চ্যু ফুতে যাওয়ার ব্যবস্থা করলে ভালো হয়। কালকে আপনাকে বলব। আমি গ্রামের একটা ঘরে থাকতে পারব। পরের দিন সকালে তারা এসে বললেন, একটু পরেই আমরা চ্যু ফুতে যাব। তবে এসেই আপনাকে যেতে হবে শিয়ানে, ট্রেনে সারারাত। আমি চ্যু ফুতে যাত্রা করলাম গাড়িতে। অসম্ভব দুর্গম সেই পাহাড়ি কাঁচা রাস্তা। বিকেলে গিয়ে চ্যু ফুতে পৌঁছলাম। অতি প্রাচীন প্রাসাদ এলাকার মধ্যে কোর্টইয়ার্ডের দুদিকে সারিবদ্ধ কক্ষ। বাঁ দিকে ছেলেদের স্থান ও ডান দিকটা নির্ধারিত ছিল মেয়েদের জন্য। অতি প্রাচীনকালের ব্যবস্থা। দেশ-বিদেশ থেকে কনফুসিয়াসের দর্শন পাঠের জন্য যারা আসতেন, তাদের জন্যই এ ব্যবস্থা। একমাত্র আমি তখন অশিক্ষার্থী অতিথি। বহু কর্মচারী এ প্রাসাদ-অতিথিশালা দেখাশোনার জন্য রয়েছে। আমার জন্য নির্দিষ্ট হলো ২১৬ নম্বর কক্ষ। সব কয়টি কক্ষই ক্ষুদ্র, পুরনো এবং এখন সারাই চলছে।
কনফুসিয়াসের মূল প্রাসাদ এলাকার প্রথম গেট অতিক্রম করলেই দর্শকদের সম্মুখস্থ ইমারতের গাত্রে সতর্কবাণীরূপে একটি বোর্ডে লিখিত উদ্ধৃতিটি কারও চোখ এড়াতে পারে না ‘এটি হচ্ছে সম্ভ্রান্ত সামন্ত জমিদারদের আদর্শ জমিদারি’ মাও সে তুং। তথাপি ভাববাদী দর্শনের এই চিন্তাবিদের শিক্ষাসংক্রান্ত প্রাপ্ত সমস্ত পুস্তকাদি প্রস্তরলিপি এবং তার প্রাসাদ, মন্দির ও গোরস্তান চীনা ঐতিহাসিক-সাংস্কৃতিক নিদর্শনরূপে সংরক্ষণের জন্য ১৯৬১ সালে প্রবর্তিত এক আইনে সরকার সকল ব্যবস্থা অবলম্বন করেছেন। প্রাচীন চীনের চিন্তানায়ক ও দার্শনিক শিক্ষক কনফুসিয়াসের প্রভাব জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও পূর্ব এশিয়ার অনেকগুলো দেশে এখনো ব্যাপকভাবে দেখা গেলেও, তার মাতৃভূমি আজকের সমাজতান্ত্রিক চীনে সেই প্রভাব অতীব নগণ্য। প্রায় আড়াই হাজার বছরব্যাপী এই সামন্ততান্ত্রিক ধারার সমর্থক পন্ডিত চীনে তার দর্শনের প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। তার সেই মতবাদ বর্তমানে প্রধানত গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় (১৯৬৬-৭৬) তরুণ লালবাহিনী কনফুসিয়াসকে সামন্ততন্ত্রের প্রবক্তা ও ভাববাদী দর্শনের প্রচারক বলে অভিহিত করে তার প্রাসাদ ও মন্দির এলাকায় পর্যটক এবং সাধারণ দর্শকদের প্রবেশ বন্ধ করে দিয়েছিল। এক বছর হয়, বর্তমান সরকার কনফুসিয়াসের এলাকা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করেছে। পূর্ব চীনের সানতুং প্রদেশের অন্তর্গত চ্যু ফু কাউন্টি ও শহর হচ্ছে কনফুসিয়াসের এলাকা। সাধারণ চীনারা কনফুসিয়াসের জন্মভূমি এই শহরকে কঙ শহর বলে আখ্যায়িত করেন। এ বছরের আগস্ট মাসে আমন্ত্রিত হয়ে আমার চীন ভ্রমণের কর্মসূচি শুরু হয়েছিল পেইজিংকে কেন্দ্র করে পূর্ব প্রান্তের সানতুং প্রদেশের রাজধানী চীনান শহর থেকে। এই সানতুং-এর ঐতিহাসিক প্রান্ত শহর চ্যু ফু পুরাকাল থেকেই কনফুসিয়াসের জন্মভূমি হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। ইতিহাসবেত্তাদের কাছে সুপ্রমাণিত না হলেও সাধারণভাবে চীনারা বিশ্বাস করেন যে, চীনাদের পূর্বপুরুষ রাজা শাও হাও-এর রাজধানীও ছিল চ্যু ফুতে এবং তিন হাজার বছর পূর্বে ল্যু রাজ্যের রাজধানীও এই প্রাচীন শহর। রাজা শাও-এর স্মৃতিসৌধ শহর থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে দশ হাজার প্রস্তর খন্ড দিয়ে পিরামিডের আকারে নির্মিত সে কারণে এই সৌধকে ‘চীন দেশের পিরামিড’ বলা হয়ে থাকে।
চীনাদের কাছে কনফুসিয়াস কঙচিউ বা কঙচি নামে পরিচিত। কিন্তু পাশ্চাত্য এই প্রকৃত নামকে ল্যাটিনাইজড করে উচ্চারণ করছে কনফুসিয়াস। জীবিতকালেই তার সম্পর্কে অনেক অলৌকিক ও উপকথা প্রচারিত হতে থাকে। প্রচলিত আছে যে, জন্মের পরই তার মাতা তাকে নিকটবর্তী একটি জঙ্গলে ফেলে দিয়েছিলেন; কারণ তিনি দেখতে ছিলেন অতি কুৎসিত। কোনো এক ব্যক্তি এই শিশুকে জঙ্গল থেকে তুলে নিয়ে লালন-পালন করে বড় করেন। তার যৌবন ও শিক্ষা জীবন সম্পর্কে নানা গল্প থাকলেও ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে সেগুলো এখনো প্রমাণ করা যায়নি। তবে এ কথা ঠিক যে, অতি গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাধারার প্রবর্তকরূপে তিনি মধ্য বয়সে একটি বেসরকারি বা ব্যক্তিগত শিক্ষালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এখানে তিনি শিষ্যদের নিকট (এক সময় ৭২ জন সম্ভবত) রাজনৈতিক, সামাজিক, শাসন সংক্রান্ত ও ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে দার্শনিক মতবাদ প্রকাশ করতেন। এ সমস্ত বিষয়ের ওপর তার মতবাদকেই কনফুসিয়াসবাদ বা কঙ্ মতবাদ বলা হয়ে থাকে। পরবর্তীকালে তিনি চীনের প্রাচীন সংস্কৃতিকে রক্ষা ও তার প্রচারের উদ্দেশ্যে ‘বুক অব পোয়েট্রি’ ও ‘বুক অব হিস্ট্রি’ সংশোধন ও পরিবর্ধন করেছিলেন। এক সময় কনফুসিয়াসের চিন্তাধারা সমগ্র চীনকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছিল যে, সাধারণ মানুষ তাকে দেবতার পর্যায়ে তুলে ধরে এবং এমনকি একজন ধর্মগুরুরূপেও গণ্য করতে থাকে। এর প্রধান কারণই হচ্ছে সামন্তবাদ ও রাজতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতা। কনফুসিয়াস সামন্তবাদে বিশ্বাস করতেন এবং তার মতে, উত্তরাধিকার মেনে নিয়ে সম্পত্তি রক্ষার ব্যবস্থা বাঞ্ছনীয়। এই মতামত রাজতন্ত্র রক্ষার সহায়ক। তার দার্শনিক মতবাদকে এক সময় ‘চীনের সর্বপ্রাচীন দার্শনিক ও মহাজ্ঞানীদের প্রজ্ঞার সারবাক্য’ বলে অভিহিত করা হতো। সে জন্যই চেয়ারম্যান মাও এক প্রবন্ধে কনফুসিয়াস সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত অথচ পরিপূর্ণ মন্তব্য করেছেন : ‘কনফুসিয়াস হচ্ছেন সামন্ততান্ত্রিক সমাজের শিক্ষক, চিন্তানায়ক ও সংস্কৃতিবান পুরুষ।’ কনফুসিয়াসের পুত্র ও তৎপরবর্তী বংশধরগণ নিয়মিতভাবে সকল সম্রাটেরই পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছেন। সে কারণে তাদের সম্পত্তি ও প্রতিপত্তি এমনই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে কর সংগ্রহ করে প্রজা পালন বা শাসন পরিচালনার উদ্দেশ্যে প্রত্যেক সম্রাটই কঙ বংশধরদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছেন এবং কঙ বংশের পুত্রসন্তানরা রাজসম্মান পেয়েছেন। শাসনতান্ত্রিক অধিকার বলেই চীনা নাগরিকগণ যে কোনো ধর্মে বিশ্বাস স্থাপন অথবা ধর্মে অবিশ্বাস করতে পারেন। ১৯৭৮ সালের ৫ মার্চ গণকংগ্রেসের গৃহীত তৃতীয় শাসনতন্ত্রের ছেচল্লিশ নম্বর ধারায় ‘নিরীশ্ববরাদ’ (নাস্তিকতা) প্রচারের অধিকার ছিল। উক্ত ধারায় বলা হয়, ‘নাগরিকগণ কোনো ধর্মে বিশ্বাস বা কোনো ধর্মে বিশ্বাস না করার এবং নিরীশ্বরবাদ প্রচারের অধিকার ভোগ করে।’ কিন্তু ১৯৮২ সালের ৪ ডিসেম্বর সংশোধনের পর যে চতুর্থ শাসনতন্ত্র গণকংগ্রেসে গ্রহণ করে কার্যকর করা হয়েছে, তাতে ‘নিরীশ্বরবাদ প্রচারের অধিকার’ সংক্রান্ত অংশটি সংযোজন করা হয়নি। (জনৈক কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে এই প্রশ্নে আলোচনার সময় বলেন যে, চীনা সমাজের বর্তমান অবস্থার কথা বিবেচনা করেই শাসনতন্ত্র থেকে নিরীশ্বরবাদ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে।) নতুন এই চতুর্থ শাসনতন্ত্রের ৩২ ধারায় বলা হয়েছে ‘চীন গণপ্রজাতন্ত্রের নাগরিকগণ ধর্মবিশ্বাসের স্বাধীনতা রয়েছে বলে উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, ধর্মবিশ্বাসের প্রশ্নে কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি কাউকে বাধ্য করতে পারবে না এবং ধর্মে বিশ্বাস করুক বা না করুক কোথাও বৈষম্য চলবে না। কিন্তু এই নতুন শাসনতন্ত্রের উক্ত ধারায় একটি সুস্পষ্ট বক্তব্য সংযোজন করা হয়েছে ‘রাষ্ট্র ধর্মীয় স্বাভাবিক কর্মকান্ড রক্ষা করে।’
সরকার ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে পেইজিং-এর সর্ববৃহৎ লামা বৌদ্ধ মন্দির ইয়ং হায় গোঙ-এর মেরামতের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন এবং বর্তমানে জনসাধারণ ও পর্যটকদের জন্য মন্দিরটি উন্মুক্ত। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় এই মন্দিরের দ্বার বিদেশি পর্যটকদের জন্য বন্ধ ছিল। তবে উপাসনায় কোনো বাধা ছিল না। অতীতে লামাবাদে বিশ্বাসী মাঞ্চু ও মঙ্গল সম্রাটগণই এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। এই লামামন্দিরে আমি ২০ বছরের যুবক সন্ন্যাসী ছি কোও চোয়ানকে দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম। অতীতে চীনে সাধারণত আমি মন্দির-মসজিদে বৃদ্ধদেরই কেবল দেখেছি; তরুণদের নয়। সমাজতান্ত্রিক প্রভাবে শাসনতন্ত্র মোতাবেক ধর্ম গ্রহণ করা বা না করার অধিকারের ব্যবস্থাই এর প্রধান কারণ এই মন্দিরের ৬৬ জন সন্ন্যাসীর মধ্যে বর্তমানে ২০ জন নবনিযুক্ত যুবক। এরা গত দুবছরে লামা সন্ন্যাসী হয়েছেন। কনফুসিয়াস ও তার বংশধরদের জন্য নির্দিষ্ট গোরস্তানটি দুশ হেক্টর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এক লাখের ওপর কবর এই গোরস্তানে বক্ষ্যমাণ রয়েছে বলে বলা হয়। তার শিষ্যগণ চীনের সকল অঞ্চল থেকে দুষ্প্রাপ্য ও দীর্ঘজীবী বৃক্ষাদি সংগ্রহ করে কনফুসিয়াসের গোরস্তানে রোপণ করেছিলেন। এখনো সাইপ্রেস বৃক্ষের মতো হাজার বছরের পুরনো বৃক্ষ এই গোরস্তানে রয়েছে। পত্রশোভিত ২০ হাজার প্রাচীন বৃক্ষ এতে দেখা যাবে। সে কারণে প্রথমদিকে এই গোরস্তানকে মহাজ্ঞানীর অরণ্য বলা হতো। কনফুসিয়াসের মৃত্যুর পরপরই (খ্রিস্টপূর্ব ৪৭৮) প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে ল্যু রাজ্যের ডিউক এই জ্ঞানতাপসের বাসস্থানে প্রথমে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। তাকে কেন্দ্র করে পরবর্তী রাজা ও সম্রাটগণ মন্দির এলাকা ক্রমে ক্রমে বর্ধিত করার ফলে (২০ হেক্টর) উত্তর-দক্ষিণে দেড় কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। উজ্জ্বল টালিযুক্ত শ্রেণিবদ্ধ চীনা ঐতিহ্যবাহী অট্টালিকার প্রাসাদতুল্য মন্দির এলাকায় বহুসংখ্যক কক্ষে কনফুসিয়াস জাদুঘর (পুস্তক-প্রস্তরলিপি ইত্যাদি) স্থাপিত রয়েছে। তার ক্ষুদ্র গৃহ অঞ্চলটিও সুরক্ষিত। চীন, সুং, হান, মিং, চিং-সহ সব রাজবংশের সম্রাটগণই কনফুসিয়াসের প্রাসাদ, মন্দির ও গোরস্তান এলাকার পরিবর্ধন, সংস্কার ও শ্রীবৃদ্ধি সাধন করেছেন।
কনফুসিয়াস ও তার দর্শন সম্পর্কে চীনে নতুন করে গবেষণা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি নানচিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অবৈতনিক প্রেসিডেন্ট ও বিশিষ্ট গবেষক বলেছেন যে, গত দু’হাজার বছরব্যাপী যে দার্শনিক-সাধকের প্রভাব চীনের ওপর বিস্তার লাভ করেছিল তার দর্শনকে বিশ্লেষণ করে দেখা বাঞ্ছনীয় বর্তমান চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে কনফুসিয়াসের চিন্তাধারার বিশেষ অংশ বা কোনো বক্তব্য এখনো গ্রহণযোগ্যতার দাবি রাখে। কারণ, কনফুসিয়াস চীনা প্রাচীন ঐতিহ্যেরই গৌরবজনক অধ্যয়। কনফুসিয়াস একজন উচ্চাকাক্সক্ষী রাষ্ট্রশাসনকার্যের দার্শনিক ছিলেন। নিজের রাজনৈতিক ও শাসন সংক্রান্ত বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি চীনের বহু শাসকের দরবারে উপস্থিত হয়েছিলেন। কিন্তু নানা কারণে তিনি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাজকৃপা লাভে ব্যর্থই শুধু হননি, অনেক সময় বাধার সম্মুখীন হন। তার রাজ্যশাসন দর্শনের মূল বক্তব্য ‘সদাশয়তা’ ও ‘মহাসমন্বয়ের বিশ্ব’কে পরবর্তীকালের সমাজতান্ত্রিক ব্যাখ্যায় সামন্ততন্ত্রের দর্শন বলেই উল্লেখ করা হয়েছে। এবং বলা হয়েছে যে, সামন্ত সমাজে সচেতনভাবে অসমতাকে সমন্বয়ের নামে লুক্কায়িত রাখার প্রচেষ্টাই তার এ সমস্ত শাসনসংক্রান্ত দর্শনে প্রকাশ পায়। তবুও বর্তমানে কনফুসিয়াসের চিন্তাধারা থেকে বিশেষ বিশেষ বক্তব্য যা সমাজতান্ত্রিক দর্শনের পরিপন্থী নয়, অনেকে উদ্ধৃত করছেন। সে ধরনের একটি উদ্ধৃতি এখানে উপস্থাপন করা যেতে পারে : ‘কোনো প্রকার চিন্তাভাবনা ব্যতিরেকে জ্ঞান আহরণের চেষ্টা প-শ্রম মাত্র; জ্ঞান আহরণের চেষ্টা না করে চিন্তা বিপজ্জনক।’ (ঈষৎ সংক্ষেপিত)
লেখক: বরেণ্য সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব