চীনা নাগরিক লি সি জাং। তিনি পেশায় একজন চিকিৎসক। গত (২৩ জুন) প্রেমের টানে সুদূর চিন থেকে নাটোরের প্রত্যন্ত গ্রামে ছুটে এসেছেন। ওই চীনা নাগরিক নিজের বৈাদ্ধ ধর্ম ত্যাগ করে ফাতেমাকে বিয়ে করেছেন। এদিকে গত (১৯ জুন) ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক তারাডা বার্লিয়েন মেগানেন্দা নামের এক তরুণী প্রেমের টানে দেশ ছেড়ে জয়পুরহাটে আসেন। কিছুদিন আগে জয়পুরহাটের শাকিউল ইসলাম নামের এক যুবকের সঙ্গে ওই তরুণী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। অথচ এই ইন্দোনেশিয়ার তরুণী পেশায় একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।
ভিনদেশি দুই নাগরিকই সন্মানজনক পেশায় চাকরি করেন। তবুও তাদের একজন ছাত্রী এবং অন্যজন বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের ক্যাশিয়ার পদে কর্মরত যুবককে বিয়ে করেছেন। তাদের এই বিয়ে দীর্ঘস্থায়ী হোক এই প্রত্যাশা সবার। কিন্তু অতীত ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। অতীতে ভিনদেশীদের বাংলাদেশে আসা অনেকেই দেশে ফিরে গেছেন। বেশিরভাগেরই আর যোগাযোগ নেই। কেউ কেউ বিয়ে করার পর স্ত্রী বা স্বামীকে নিয়ে নিজ দেশে ফিরেছেন। তবে বিদেশে গিয়ে কেমন আছেন তারা, সে বিষয়ে খোঁজ পাওয়া যায় না। আবার দেশে রেখে যাওয়া অনেকের সঙ্গেই পরে আর যোগাযোগ রাখা হয়নি।
কয়েক বছর যাবৎ ভিনদেশি তরুণ-তরুণীরা প্রেমের টানে বাংলাদেশে ছুটে আসছেন। এমনকি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধও হচ্ছেন। এসব ঘটনা স্যোশাল মিডিয়ার কল্যাণে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু এসব প্রেমের বিয়ের পর আদৌ কি তারা সুখে আছেন, টিকে রয়েছে কি তাদের সংসার? এমন প্রশ্নও আবার অনেকেরই মনে। এছাড়াও কেন বাংলাদেশিদের জন্য ভিনদেশিদের এত প্রেম? এটি নিয়েও রয়েছে নানা তর্ক-বিতর্ক।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ‘বর্তমানে ইন্টারনেটের কারণে পারস্পরিক যোগাযোগ খুবই সহজতর হয়েছে। দেশের তরুণ-তরুণীরা এখন স্যোশাল মিডিয়ার বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে থাকেন। বিশেষ করে ম্যাসেঞ্জার, টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিনোদনমূলক বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে মূলত ভিনদেশীদের সঙ্গে আমাদের তরুণ-তরুণীদের যোগাযোগ হচ্ছে। সেই যোগাযোগ থেকেই প্রেম তারপর বিয়ের পর্যায়ে গড়াচ্ছে। তবে এসব প্রেম বা বিয়ের স্থায়ীত্ব খুবই কম। কারণ কিছুদিন পরেই ভিনদেশীরা নিজ দেশে ফিরে গিয়ে আর খোঁজখবর রাখেন না।’
২০১৭ সালের এপ্রিল মাসের ঘটনা। রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির জামালপুর বাজারের মিষ্টির দোকানি বলাই ঘোষের ছেলে শ্যামলী পরিবহনের সুপারভাইজার সঞ্জয় ঘোষের সঙ্গে ফেসবুকে প্রেম হয় ব্রাজিলের জেইসা ওলিভেরিয়া সিলভারের। দীর্ঘ দেড় বছর প্রেম করার পর ওই বছরের ৩ এপ্রিল ঢাকায় আসেন ব্রাজিলিয়ান ওই তরুণী। পরে ওই বছরের ৬ এপ্রিল তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের ৪ দিন পরেই ওই তরুণী ঢাকা ছেড়ে ব্রাজিলে পাড়ি জমান।
এরপর থেকে ওই তরুণী রাজবাড়ীর ওই যুবকের সঙ্গে পুরোপুরি যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। সিলভা ব্রাজিলে ফিরে তার সেই ফেসবুক আইডি বন্ধ করে দেন। এমনকি যে সিম ব্যবহার করতো সেই সিমও বন্ধ করে রাখেন। ফলে সঞ্জয়ের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আর যোগাযোগ করতে পারেনি সিলভার সাথে। ফেসবুকে প্রেম এরপর বিয়ে। তারপর বিচ্ছেদ! সংসার জীবন মাত্র ৪ দিনের। এখন পুরোটাই বিচ্ছিন্ন তাদের যোগাযোগ।
ওই তরুণী চলে যাওয়ার পর গ্রামবাসীরা গণমাধ্যমে বলেন, ‘সিলভা নামের ব্রাজিলিয়ান যে তরুণী এসেছিলেন তিনি সঞ্জয়কে ভালোবেসেই এসেছিলেন এবং তাদের বিয়ে হয়েছিল এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু কয়েকদিন থাকার পর সে নিজ দেশে ফিরে গিয়ে আর কোন যোগাযোগ রাখেননি। কেন রাখেননি তা জানি না। তবে আমাদের ধারণা এরা লোভী প্রকৃতির একটি চক্র। ওরা বিভিন্ন দেশের ধনী ছেলে-মেয়েদের টার্গেট করে। টার্গেট মিস হলে ওরা আবার নিজ দেশে ফিরে যায়। সঞ্জয়ের ক্ষেত্রেও এমন ঘটতে পারে।’
এই ঘটনার মতো অনেকেই প্রেমের টানে বাংলাদেশে এসে নিজ দেশে ফিরেছেন। পরে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখা হয়নি। এতে দেশের তরুণ-তরুণীদের পরে বিপাকে পড়তে হয়েছে। অনেক পরিবারের আবার আর্থিক ক্ষতিও হয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. এ আই মাহবুব বলেন, ‘বহু বছর ধরেই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এ ধরনের প্রেম ও বিয়ের সংস্কৃতি প্রচলিত রয়েছে। তবে বর্তমানে ইন্টারনেটের কারণে এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটতে দেখা যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এছাড়াও অভিবাসন ও উন্নত দেশে নাগরিকত্বের আশায় ভিনদেশি কাউকে বিয়ের ঘটনা তো এ দেশে যুগ যুগ ধরেই প্রচলিত। শুধু নাগরিকত্ব কিংবা উন্নত জীবনযাপনের সুযোগের আশায় অনেকে কাগজ-কলমেও বিয়ে করে থাকেন। এ ধরনের বিয়েগুলো থেকেই পরবর্তী সময়ে বিবাহবিচ্ছেদের মতো ঘটনাগুলো ঘটতে দেখা যায়।’
এই অধ্যাপকের মতে, ‘আমাদের মতো দেশ, অর্থাৎ দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোতে মূলত ভিনদেশি মেয়েদের সম্পর্ক গড়তে দেখা যায়। এর পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে, উন্নত দেশগুলোর ধারণা, এই অঞ্চলের পুরুষেরা বিশ্বস্ত হন। জীবনসঙ্গী হিসেবেও দক্ষিণ এশীয় পুরুষেরা তাদের দেশের পুরুষদের তুলনায় যোগ্য হন। তাই এই আকর্ষণ।’
মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক তাজুল ইসলাম বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা দরকার। সেখানে এসব সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভাষাগত বাধা, সাংস্কৃতিক বাধা থাকে। দূরবর্তী জানাশোনার মধ্য দিয়ে সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ায় এবং বাংলাদেশের মফস্বলের জীবনের সম্পর্কে বাইরের নাগরিকদের তেমন ধারণা না থাকায় তারা স্বাভাবিকভাবেই আসার পরে আর সম্পর্ক ধরে রাখতে চান না। এ কারণে অল্পদিনেই বিচ্ছেদ হয় বা বন্ধুত্ব ভেঙে যায়।’