বাংলাদেশ কোড, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ এবং আইন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে আইন আছে ১ হাজার ২০৭টি। কিছু বিতর্কিত আইন নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও আইনগুলোর লক্ষ্য ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ও ভুক্তভোগীকে প্রতিকারের ব্যবস্থা করে অপরাধের সাজা নিশ্চিত করা। কিন্তু এত আইন থাকার পরও মানুষের সত্যিকারের সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, যত আইন আছে অনেক ক্ষেত্রে মানুষের কল্যাণে প্রয়োগ নেই। অনেক ক্ষেত্রেই আইন যত না কল্যাণমূলক তারচেয়ে বেশি শোষণমূলক।
এসব আইনে ঔপনিবেশিক শাসনামলে প্রণীত ফৌজদারি অপরাধের বিচারসংক্রান্ত ফৌজদারি কার্যবিধি, শাস্তিসংক্রান্ত দন্ডবিধি, দেওয়ানি কার্যবিধি, সাক্ষ্য আইনের মতো অপরিহার্য আইন যেমন আছে, তেমনি কিছু আইন আছে কাগজে-কলমে আর সংখ্যায়, যেসবের প্রায়োগিকতা এখন নেই।
খাল খনন ও এর রক্ষণাবেক্ষণে ১৬০ বছর আগে ‘দ্য ক্যানালস অ্যাক্ট, ১৮৬৪’ নামে একটি আইন করেছিল ব্রিটিশ সরকার। বাংলাদেশে এ আইন এখন অচল, অপ্রয়োজনীয়। নৌযান, নদী ও খালের সুরক্ষায় আইন আছে। মৎস্য, মৎস্যপণ্য ও উপকারী জীবাণুর আন্তর্জাতিক পরিবহন এবং রোগজীবাণুর অনুপ্রবেশ ও বিস্তার ঠেকাতে ‘মৎস্য সংগ নিরোধ আইন, ২০১৮’ নামে আইন আছে। এতে দোষী সাব্যস্ত হলে অন্যূন এক বছর কারাদন্ড ও অর্থদন্ডের বিধান আছে। তবে এ আইনের পরিচিতি তেমন নেই। দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ নিয়ে ‘টর্ট আইন’ থাকলেও এর ব্যবহার প্রায় নেই।
উচ্চ ও অধস্তন আদালতের অন্তত পাঁচজন আইনজীবী এ প্রতিবেদককে বলেন, ওইসব আইনে কোনো মামলা এখনো তাদের কাছে আসেনি। তারা বলেন, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক আইনের মাধ্যমে মানুষকে শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনে অভ্যস্ত করতে অনেক আইনই আছে। এসবের কার্যকারিতা তেমন নেই।
১৭ শতকের শেষ দিকে ‘দ্য হুইলস অ্যান্ড ইনটেসটিসি রেজল্যুশন, ১৭৯৯’ নামে প্রণীত একটি আইন থাকলেও এর ব্যবহার এখন নেই। ১৮ শতকে ব্রিটিশ আমলে আইন হয়েছে ৮২টি। ১৯ শতকের শুরু থেকে ১৯৪৭-এ ব্রিটিশ শাসনের অবসান পর্যন্ত আরও ১৩৪টি আইন হয়েছে। ১ হাজার ২০০-এর বেশি আইনের মধ্যে ব্রিটিশরা তৈরি করেছে ২১৭টি আইন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত (বাংলাদেশ সৃষ্টির আগে) পাকিস্তান আমলে আইন হয়েছে ১৪০টি। অর্থাৎ ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে আইন হয়েছে ৩৫৭টি।
আইন ও বিচারবিষয়ক বিশ্লেষকরা বলেন, বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় আটগুণ বেশি জনসংখ্যা, ২৮টি অঙ্গরাজ্য ও ৮টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল নিয়ে গঠিত ভারত চলে মাত্র সাড়ে ১ হাজার ২০০ আইন দিয়ে। ফৌজদারি আইনবিদদের মতে, বাংলাদেশের আইনগুলোর কাঠামোতে সমস্যা নেই। তবে এগুলো সংশোধনমূলক নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে নিপীড়নমূলক। আটক, গ্রেপ্তার, রিমান্ড কিংবা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত করে এমন নিবর্তনমূলক আইনও আছে। আইন না মানা এবং আইনের প্রয়োগের ঘাটতির কারণে সমঅধিকার, ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ও সাম্য স্থাপনে এসবের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে প্রায়ই।
বছরে আইন হচ্ছে ১৭টি : স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ থেকে ২০২৪ (২০০৭ ও ২০০৮-এ কোনো আইন হয়নি) সালের মে মাস পর্যন্ত আইন হয়েছে ৮৫১টি। এ হিসাবে প্রতি বছরে গড়ে আইন হচ্ছে ১৭টি। সবচেয়ে বেশি আইন পাস হয়েছে ২০২৩-এ, ৬৬টি। ১৯৭২ সালে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে আইন হয় ৬৫টি। এ ছাড়া ২০১০-এ প্রণীত হয়েছে ৩২টি ও ২০২১-এ ৩১টি। লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের গত পাঁচ বছরের তথ্য বলছে, গত কয়েক বছরে আইন প্রণয়নের প্রবণতা বেড়েছে। ২০১৯-এ হয়েছে ১৯টি। ২০২০-এ ২৭টি, ২০২১-এ ৩১টি, ২০২২-এ ২১টি, ২০২৩-এ ৬৬টি আইন পাস হয়েছে সংসদে। চলতি বছর ১৪ মে পর্যন্ত আইন হয়েছে আরও তিনটি। অর্থাৎ পাঁচ বছরের কিছু বেশি সময়ে আইন হয়েছে ১৬৭টি, বছরে গড়ে প্রায় ৩৩টি। বাংলাদেশ লজ (রিভিশন অ্যান্ড ডিক্লারেশন) অ্যাক্ট, ১৯৭৩ অনুযায়ী, প্রচলিত সব আইন একত্র করে প্রকাশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ২০২২-এর ৩১ মার্চ পর্যন্ত ১ হাজার ১৭৭টি আইন একত্র করে ওই বছরের ২৩ অক্টোবর ৪৭ খন্ডে ‘বাংলাদেশ কোড’ প্রকাশ করেছিল আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
প্রয়োগ, কার্যকারিতা নেই তবু আছে : ব্রিটিশ আমলের সাটি রেগুলেশন অ্যাক্ট, ১৮২৯; দ্য ডিস্ট্রিক্ট অ্যাক্ট, ১৮৩৬; ফ্যাটাল অ্যাক্সিডেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৫৫; বিলস অব লেডিং অ্যাক্ট ১৮৫৬; দ্য ক্যারিয়ারস অ্যাক্ট, ১৮৬৫; দ্য ক্যাটাল- ট্রেসপাস অ্যাক্ট, ১৮৭১; ট্রেজারার-ট্রোভ অ্যাক্ট, ১৮৭৮; দ্য টাউটস অ্যাক্ট, ১৮৭৯; দ্য ভেক্সিনেশন অ্যাক্ট ১৮৮০; দ্য অবস্ট্রাকশন ইন ফেয়ারওয়েজ অ্যাক্ট ১৮৮১; স্মোক-নুইসেন্স অ্যাক্ট, ১৯০৫; সেল অব গুডস অ্যাক্ট, ১৯৩০; সুগার কেইন অ্যাক্ট, ১৯৩৪-এর মতো কিছু আইন আছে। এখনো রয়ে গেছে পাকিস্তান আমলে তৈরি প্রোটেকটিভ ডিউটিস অ্যাক্ট, ১৯৫০; এসেনশিয়াল কমোডিটিস অ্যাক্ট, ১৯৫৭-এর মতো অপ্রচলিত কিছু আইন। আইন কমিশন এবং আইন ও বিচার সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি ৮০টির বেশি আইন আছে যেগুলোর এখন কার্যকারিতা কিংবা প্রয়োগ নেই। এসবের বিকল্প আইন ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে।
অপ্রয়োজনীয় আইন বাতিলের সুপারিশে নজর নেই : ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ১৫১ বছর থেকে ১৭১ বছরের পুরনো, অপ্রয়োজনীয় ও অচল সাতটি আইন বাতিলের সুপারিশ করে আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ে পাঠায় জাতীয় আইন কমিশন। সাতটি আইন হচ্ছে দ্য পেনশনস অ্যাক্ট-১৮৭১, দ্য টোলস অ্যাক্ট-১৮৫১, দ্য অ্যালুভিয়ন (অ্যামেন্ডমেন্ড) অ্যাক্ট-১৮৬৮, দ্য সরাইস অ্যাক্ট-১৮৬৭, দ্য ক্যানালস অ্যাক্ট-১৮৬৪, দ্য অ্যাক্টিং জাজেস অ্যাক্ট-১৮৬৭ ও দ্য পাবলিক সার্ভেন্টস (ইনকোয়ারিস) অ্যাক্ট-১৮৫০। কমিশনের অভিমত ছিল, বর্তমানে এ আইনগুলোর কার্যকারিতা ও উপযোগিতা নেই। ইতিমধ্যে এসবের বিকল্প আইন হয়েছে। কিন্তু এ সাত আইন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল হয়নি।
আইন কমিশনের দায়িত্বরতরা জানান, অচল ও অপ্রয়োজনীয় আইন বাতিলে সরকারের নির্দেশনা থাকলে তারা উদ্যোগ নেন। সুপারিশ প্রক্রিয়ার কার্যপ্রণালি জটিল এবং ব্যয় ও সময়সাপেক্ষ। অবসরপ্রাপ্ত বিচারক বা প্রশাসনের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তির মাধ্যমে নিয়োগ ও সম্মানী দিয়ে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়। তারাই আইন বাতিল করা উচিত বা সমীচীন কি না, তা কমিশনকে লিখিতভাবে জানান। এরপর কমিশন প্রতিবেদন প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। আইন কমিশনের সদস্য (হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি) এটিএম ফজলে কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ প্রক্রিয়া নিয়ে সরকারের আলাদা বাজেট নেই। তাগিদও নেই। কমিশনের কাজ সুপারিশ করা। সরকারের নির্দেশনা পেলে আরও কিছু পুরনো আইন বাতিলে কাজ করার সুযোগ ছিল। কিন্তু হয়নি। ফলে অচল এ আইনগুলো এখনো কাগজে-কলমে-সংখ্যায় রয়ে গেছে।’
লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিব ড. হাফিজ আহমেদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কমিশন সুপারিশ করলেই যে আইন বাতিল করতে হবে এমনটি নয়। আইন প্রণয়নে যেমন কিছু প্রক্রিয়া থাকে তেমনি বাতিলেও কিছু প্রক্রিয়া থাকে। এটি সময়সাপেক্ষ। সরকার বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় প্রয়োজন মনে করলে ব্যবস্থা নেবে।’
অতি গুরুত্বপূর্ণ আইন নেই : জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলছেন, দেশে প্রচলিত অনেক আইন এ যুগে অচল ও অপ্রয়োজনীয়। আবার অতি গুরুত্বপূর্ণ আইন যেমন, উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগ, সাক্ষী ও সংখ্যালঘু সুরক্ষা এবং বৈষম্য-বিরোধ রোধের আইন এখনো হয়নি। আইন ও বিচারবিষয়ক বিশ্লেষকরা মনে করেন, উচ্চ আদালতে বিচারপতির মতো সাংবিধানিক পদধারীদের নিয়োগের মানদন্ডবিষয়ক আইন থাকা দরকার। গত ১৫ বছরে সরকারের একাধিক প্রতিশ্রুতি, সুপ্রিম কোর্টের সুপারিশ ও প্রায় এক দশক আগে আইন কমিশনের সুপারিশের পরও তা হয়নি। অন্যদিকে মামলার দ্রুত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতে সাক্ষীদের ভূমিকা প্রধান হলেও তাদের সুরক্ষাবিষয়ক আইন নেই। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর প্রতিনিয়ত নির্যাতন, নিপীড়ন, হামলা, দখলের ঘটনা ঘটলেও ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন’ তৈরিতে সরকারের বিশেষ নজর নেই। সংবিধানের আলোকে সব ধরনের বৈষম্য-বিরোধ রোধে দুই বছরের বেশি সময় আগে জাতীয় সংসদে ‘বৈষম্য বিরোধী বিল-২০২২’ উত্থাপন করা হলেও সেটি এখনো আইন হয়নি।
মোবাইল ফোনের কলে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হকের সাড়া পাওয়া যায়নি। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও ব্লাস্টের ট্রাস্টি অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। আইন বেশি হওয়ার চেয়েও বড় প্রশ্ন জনগণের কল্যাণে এসব আইন হয়েছে কি না? এসব আইনের বেশিরভাগই কল্যাণকর নয়। সুরক্ষার আইন সুরক্ষার কোনো কাজে লাগে না। ব্রিটিশরা আইন করত শোষণ, শাসন, কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য আর সাজা দেওয়ার জন্য। তাদের চিন্তাভাবনাই আমরা ধারণ ও বহন করে চলেছি। সে মানসিকতা থেকে আমরা বেরোতে পারিনি।’