ক্রিকেট-ফুটবল টুর্নামেন্ট এলেই অনলাইনে চাঙ্গা হয় জুয়া

চলছে আইসিসি পুরুষ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের নবম আসর। ক্রিকেট ধামাকার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে কোপা আমেরিকা ও জার্মানিতে চলছে ইউরোপ শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। এই তিন আন্তর্জাতিক আসরকে ঘিরে মত্ত খেলাপ্রেমীরা। তবে খেলাপ্রেমীদের পাশাপাশি ‘অনলাইন জুয়ায়’ বাজার এখন চাঙ্গা। ঘরে বসেই বিভিন্ন জুয়ার সাইটে সক্রিয় বিভিন্ন পেশা ও বয়সের মানুষ। 

বিশেষ করে তরুণরা এই খেলায় বেশি জড়িয়ে পড়ছেন। অনলাইন সম্পর্কে ধারণা থাকায় শহর কিংবা গ্রামাঞ্চলের তরুণরা একে অন্যের দেখে ‘অনলাইন জুয়ায়’ আসক্ত হচ্ছেন। এছাড়াও ফেসবুকে বিভিন্ন পেজে ক্রিকেটসহ ফুটবল খেলা সরাসরি দেখানো হয়। এই পেজগুলো খেলা দেখানোর সময় অনলাইন জুয়া খেলার জন্য বিভিন্ন হোয়াটঅ্যাপ নাম্বার দিয়ে থাকেন। সেই নাম্বারগুলো থেকেও গ্রামের অল্পশিক্ষিত তরুণরা উৎসাহিত হচ্ছেন। এমনকি জুয়া খেলতে গিয়ে সর্বস্ব হারানোর ঘটনাও ঘটছে। তরুণদের পাশাপাশি এই অন্ধকার জুয়ার জড়িয়ে পড়েছেন নিম্নআয়ের মানুষরাও। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার রুমমেট ফুটবলের বিভিন্ন লিগের খেলায় অনলাইনে জুয়া খেলতেন। আমি দেখতাম ওই  বড়ভাই মাত্র ৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকায় বিভিন্ন গোপন অ্যাপে টাকা ধরতেন। মূলত দুর্বল দলের বিপক্ষে কম টাকা ধরেও বেশি টাকা জেতা সম্ভব। অনেক সময় ১০০ টাকা দিয়ে এক হাজার টাকা জেতাও যায়। এই দেখে আমিও এই অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে পড়ি।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘শুরুর দিকে অল্প টাকা লাগিয়ে কয়েকবার বেশি টাকা জিতেছি। পরে লোভে পড়ে যাই। পর্যায়ক্রমে আমি এই অনলাইন জুয়ায় পুরোপুরি আসক্ত হয়ে যাই। পড়ালেখা, ক্লাস-পরীক্ষা বাদ দিয়ে রাত জেগে খেলা দেখতাম আর জুয়া খেলতাম। এক সময়ে বাড়ি থেকে খাওয়ার জন্য যে টাকা নিতাম তা জুয়া খেলতেই শেষ হয়ে যেত। পরে খাওয়ার টাকায় থাকতো না। আমার মতো অনেককেই এই নেশায় আসক্ত থাকতে দেখেছি। পরে এর ভয়াবহতা বুঝতে পেরে অনলাইন জুয়া থেকে সরে এসেছি। কিন্তু ছাড়তে অনেক কষ্ট হয়েছে।’

এই শিক্ষার্থীর মতো বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থী এখন অনলাইন জুয়ায় আসক্ত। এছাড়াও গ্রামাঞ্চলের অল্পশিক্ষিত তরুণ ও নিম্নআয়ের মানুষরাও এই নেশায় জড়িয়ে পড়ছেন।

দিনাজপুরের পাবর্তীপুরের হৃদয়। অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চলে তার। তিনি আজ আফগানিস্তান ও বাংলাদেশের ম্যাচে বাংলাদেশের হয়ে বাজি ধরেন। বাংলাদেশ ১২ ওভারের মধ্যেই জিতবে এই মর্মে পাঁচ হাজার টাকা বাজি ধরেন। খেলা শুরুর দিকে সেদিকেই এগুচ্ছিলো বাংলাদেশ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হেরেছে বাংলাদেশ।

খেলা শেষে হৃদয় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রায় প্রতিটি খেলায় বাজি ধরি। অনেক সময় বলে বলে বাজি খেলি। নিজের কাছে টাকা না থাকলেও ধার করি। মাঝেমধ্যে জিতলেও আজ হেরেছি। পরিচিত অনেক ভাই আছেন, যারা অ্যাপে টাকা ঢুকিয়ে দেন। অ্যাপে অ্যাকাউন্ট খুলতে ৮৫ টাকা লাগে। এরপর ইচ্ছামতো টাকা ঢুকিয়ে জুয়া খেলা যায়।’   

এদিকে সংসদে অনলাইন জুয়া বন্ধের দাবি তুলেন যশোর-৬ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য আজিজুল ইসলাম । বক্তব্যে তিনি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, ‘সরকার টাকা পাচার, হুন্ডি বন্ধ করে দিতে পারলে তিন মাসের মধ্যে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। হুন্ডির সঙ্গে যোগ হয়েছে অনলাইন জুয়া। কয়েক বছর আগে অভিযানে ঢাকার ক্যাসিনো বন্ধ হলেও অনলাইনে অসংখ্য বেটিং সাইট চালু হয়েছে। ঘাম ঝরিয়ে আয় করা টাকা এসব জুয়ার সাইটে বিনিয়োগ করে সর্বস্বান্ত হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষ। অনেক পরিবার ভেঙে যাওয়া, আত্মহত্যা, অর্থনীতির ভগ্নদশার জন্য এই অনলাইন জুয়া দায়ী। সব দেখেও আমরা চুপ থাকছি। হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে এই অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে।’

এই সংসদ সদস্যের বক্তব্যের জেরে গতকাল ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দেশের প্রায় অর্ধকোটি মানুষ অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত এসব জুয়ার সাইট বন্ধ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত আমরা ২ হাজার ৬০০টির মতো জুয়ার সাইট বন্ধ করেছি। মোবাইল অ্যাপগুলোও প্রতিনিয়ত বন্ধ করা হচ্ছে। এটি নিয়মিত কার্যক্রম। মোবাইল ফোনসহ ইলেকট্রনিক ডিভাইসে অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে অভিযান পরিচালনা করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনলাইন জুয়ায় গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে আমাদের বিভিন্ন বয়সের ছেলেমেয়েরা যুক্ত রয়েছে। এমনকি অনেক বয়স্ক এবং অবসরপ্রাপ্তরা জড়িত। আমরা অবৈধ জুয়ার সাইটগুলোকে বন্ধ করার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি সচেতনতা তৈরি করব। যাতে সাধারণ মানুষ এ ধরনের কোনো প্রলোভনে পড়ে প্রতারিত না হন, আমাদের দেশের মুদ্রা যাতে বিদেশে পাচার না হয়।’ 

এ প্রসঙ্গে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘চরম উদ্বেগের সঙ্গে আমরা লক্ষ্য করছি, দেশে অনলাইন জুয়ার বিজ্ঞাপনের মহোৎসব চলছে। আইনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে শুধু মুনাফার লোভে দেশকে চরম বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া কোনোমতেই দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে না। ইদানীং শহরের বিভিন্ন বিলবোর্ডেও অনলাইন জুয়ার সাইটের বিজ্ঞাপন প্রচারিত হতে দেখা যাচ্ছে। গত বছর উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশন, বিশেষ করে স্পোর্টস চ্যানেলসহ ডিজিটাল ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বাজি ও জুয়ার বিজ্ঞাপনের রমরমা প্রচার চলছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সংবিধানের ১৮(২) অনুচ্ছেদ ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী, যে কোনো ধরনের জুয়া প্রতিরোধ করতে সরকারের ওপর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে দেশে এখনো জুয়া প্রতিরোধে ব্যবহার হচ্ছে ১৫৭ বছরের পুরোনো আইন। সরকার জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৩ প্রণয়নের উদ্যোগ নিলেও এখনো তা খসড়া পর্যায়েই রয়ে গেছে। অথচ বর্তমান প্রেক্ষাপটে জুয়া প্রতিরোধে কঠোর ও যুগোপযোগী আইন আরও আগেই প্রণীত ও প্রয়োগ হওয়া প্রয়োজন ছিল।’ 

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, ‘অনলাইনে জুয়া খেলাটা সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে সর্বত্র যুবসমাজসহ সবার মধ্যে এই ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে। এ থেকে উত্তরণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি। এ ছাড়া সরকারের সাইবার ইউনিটের নজরদারি বাড়াতে হবে। জোরদার করতে হবে আইনের যথাযথ প্রয়োগ।’