প্রক্সি পরীক্ষা

ঝুঁকিপূর্ণ হলেও পেশা হিসেবে নিচ্ছেন কেউ কেউ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় মাঝেমধ্যেই ধরাও পড়ছেন প্রক্সি পরীক্ষার্থী। অর্থের বিনিময়ে অন্যের হয়ে পরীক্ষা দিতে এসে ধরা পড়ছেন তারা। কেউ কেউ একে পেশা হিসেবেও বেছে নিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই এই প্রক্সি পরীক্ষার্থীকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হয়। আবার এ ঘটনায় মামলাও করে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এসব মামলার পরিণতি কী তা জানা যায় না। মূলত কর্তৃপক্ষের অবহেলা প্রক্সিদাতারা পার পেয়ে যান।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড আর প্রক্সি দিলে দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান রেখে গত বছর জানুয়ারি মাসে ‘বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন আইন ২০২৩ বিল’ সংসদে পাস হয়েছে। কিন্তু এরপরও থেমে থাকেনি প্রক্সি পরীক্ষা।

গত ২৩ জুন ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি দেওয়ার অভিযোগে ১০ জনকে আটক করা হয়। আটক পরীক্ষার্থীরা লিখিত পরীক্ষায় বেশ ভালো নম্বর পেয়েছিলেন। মৌখিক পরীক্ষায় তাদের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন করা হলে উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। পরে হাতের লেখা পরীক্ষা করে মিল পাওয়া যায়নি। তখনই আটক শিক্ষার্থীদের পুলিশে দেওয়া হয়েছে।

গত ৩ মে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের স্বাস্থ্য সহকারী পদে ‘পরিচিত’ প্রার্থীর হয়ে পরীক্ষা দিতে বসে গ্রেপ্তার হন এক যুবক। পরে তাকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয় জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। জুয়েল মল্লিক নামের একজন প্রার্থীর হয়ে পরীক্ষায় বসেছিলেন আবদুর রউফ। তিনি স্বীকার করেন, পরিচিত জুয়েল মল্লিকের হয়ে পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। তবে টাকাপয়সার বিনিময়ে না।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের কলা ও মানবিকী অনুষদভুক্ত ‘সি’ ইউনিটের পরীক্ষায় প্রক্সি দিতে আসা এক শিক্ষার্থী ধরা পড়েন। প্রক্সি দিতে আসা ওই শিক্ষার্থীর নাম সাগর হোসেন রোহান। তিনি ঢাকা কলেজের ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিস সূত্রে জানা যায়, টাকার বিনিময়ে এই পরীক্ষায় অংশ নিতে এসেছিলেন রোহান।

২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ইউনিটে ভর্তির আবেদন করেছিলেন রূপম নামের এক শিক্ষার্থী। পরীক্ষাও চলছিল যথারীতি। কিন্তু বিপত্তি বাধল যখন পরিদর্শক পরিচয়পত্র দেখেশুনে সই করছিলেন। সন্দেহ হলে যাচাই করার একপর্যায়ে পরিদর্শক নিশ্চিত হলেন, যিনি পরীক্ষা দিচ্ছেন, তিনি আসলে রূপম নন। তার নাম হানিফ। পরে হানিফের বিরুদ্ধে মামলা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। মতিহার থানায় করা মামলার এজাহার ঘেঁটে জানা যায়, ভর্তিচ্ছু রূপম সরকার তার হয়ে প্রক্সি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য হানিফের সঙ্গে ৭০ হাজার টাকার চুক্তি করেন। এই চুক্তি করিয়ে দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েরই মো. রাকিব নামের এক শিক্ষার্থী। হানিফকে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়ে পরীক্ষার হলে পাঠানো হয়।

এ ঘটনার ব্যাপারে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক রেজিস্ট্রার প্রফেসর মো. আবদুস সালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরীক্ষার প্রবেশপত্রের ছবির সঙ্গে পরীক্ষার্থীর চেহারার মিল না পাওয়ায় একজনকে আটক করা হয়েছে। তাৎক্ষণিক বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানের পর আমরা নিশ্চিত হই, পরীক্ষা দিতে আসা হানিফ নামের ছেলেটি মূলত রূপম সরকারের প্রক্সি দিতে এসেছেন। ওই সময় আমরা মতিহার থানায় মামলা করি।’

জানতে চাইলে মামলার আইও পুলিশ পরিদর্শক তৌহিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে প্রক্সি পরীক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে এবং তা বিচারাধীন রয়েছে। কিন্তু বাদীপক্ষের অনাগ্রহে মামলার কার্যক্রম বিলম্বিত হওয়ায় বিচার ও রায় পেতে অনেক দেরি হচ্ছে।

তা ছাড়া মামলায় উল্লিখিত বাদীপক্ষের মোবাইল নম্বরে কল করে কিংবা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

তেমনি আরেকজন আসামি মো. রবিউল ইসলাম। ২০২২ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ পরীক্ষায় প্রক্সি দিতে এলে প্রবেশপত্রের সঙ্গে ছবির মিল না হওয়ায় ধরা পড়েন। জিজ্ঞাসাবাদে প্রক্সি দেওয়ার বিষয়টি বেরিয়ে আসে। তখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে রাজধানীর কোতোয়ালি থানায় একটা মামলা করেন। কিন্তু এ মামলাটির ক্ষেত্রেও বাদীপক্ষের অনাগ্রহের বিষয়টি দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে উঠে আসে।

এজাহার সূত্রে জানা যায়, মামলার ৩ নম্বর আসামি রাব্বির সহযোগিতায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার চুক্তিতে ২ নম্বর আসামি সিজান মাহফুজের (২০) পরীক্ষা দিতে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার হওয়া আসামি রবিউল ইসলাম।

মামলার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রক্সিবিরোধী এসব মামলায় বাদীপক্ষের অনাগ্রহের কারণে মামলাগুলোর কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে। এদিকে আসামিরা জামিন নিয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম করছেন। ফলে প্রক্সিবিরোধী মামলাগুলো আর আলোর মুখ দেখে না।

এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে মামলাকারী ও সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. রইছ উদ্দীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি যখন দায়িত্বে ছিলাম, তখন মাঝে মাঝে আয়ু ও ওসিকে জিজ্ঞাসা করতাম। যেহেতু ঘটনাটি খুবই সেনসিটিভ, তাই আমি নিজেই খোঁজ নিতাম। দায়িত্ব ছাড়ার পর আমি আর খোঁজ নিইনি। এটা প্রশাসন দেখবে। শুনেছি প্রক্সিদাতার জামিন হয়েছিল। এরপর আর কী হয়েছে জানি না।’

এদিকে ড. রইছ উদ্দীনের স্থলাভিষিক্ত অধ্যাপক ড. হোসনে আরা জলি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কার্যত যিনি মামলা করেন, এটি তার দেখার কথা। সে অনুযায়ী ২০২২ সালে যিনি বাদী হয়ে মামলা করেছেন, তিনি এ মামলার বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন। আমি দায়িত্ব নিয়েছি মাত্র ছয় মাস হয়েছে। তাই তৎকালীন মামলার বিষয় সম্পর্কে অবগত নই। তা ছাড়া, এ মামলার বিষয়ে আমার কোনো কিছুই জানা নেই।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজের অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ের অনেক পরীক্ষায় এ রকম প্রক্সির ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়। তেমনি একজন প্রক্সিম্যান বা ভাড়াটে পরীক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘পড়াশোনা শেষ করেছি বেশ কয়েক বছর হয়েছে। এর মধ্যে অনেকগুলো সরকারি চাকরির পরীক্ষা ও ভাইভাও দিয়েছি। কিন্তু চাকরি না হওয়ায় এবং চাকরির বয়স প্রায় শেষ হতে যাওয়ায় শেষমেশ এমন পথ বেছে নিয়েছি।’

অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতি বিষয়ে প্রক্সি পরীক্ষার জন্য সাড়ে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। তবে কাজটা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। প্রথমে মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে চুক্তি করতে হয়। পরে কয়েকটি জটিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রবেশপত্রে আসল পরীক্ষার্থীর ছবি মুছে আমার ছবি যুক্ত করা। শুধু এটা করলেই নিরাপদ হওয়া যায় না। পরিদর্শকদের কাছে থাকা শিক্ষার্থীর পরিচয়পত্রে যে ছবি থাকে, সেই ছবিও পরিবর্তন করতে পারলে মোটামুটি নিরাপদ হওয়া যায়। নইলে যেকোনো সময় ধরা পড়ার ভয় থাকে।’

এক ধরনের পেশা হিসেবে নেওয়া এই প্রক্সি পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে আরও জানা যায়, ছবি পরিবর্তনের এই জটিল কাজগুলো সাধারণত বিশেষ ইলেকট্রনিকস ডিভাইসের মাধ্যমেই করা হয়। এর জন্য আলাদা এক্সপার্টও ভাড়া করতে হয়।

এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মলয় কুমার ভৌমিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার মান নিয়ে অনেক কিছুই বলা যায়। তবে প্রক্সি পরীক্ষার মাধ্যমে যে জাল-জালিয়াতি চলছে, তা ব্যাপক মাত্রায় না হলেও যতটুকু চলছে, সেটাও আমার কাছে গ্রহণযোগ্য না। পরীক্ষা-জালিয়াতি করতে এসে অনেকেই হয়তো ধরা পড়ছেন; কিন্তু যারা ধরা পড়ছেন না, পার পেয়ে যাচ্ছেন এবং মূল অযোগ্য প্রার্থী পাস করে যাচ্ছেন; এ ক্ষেত্রে কিন্তু তার এই জালিয়াতির কারণে একজন মেধাবী প্রার্থী সুযোগ হারাচ্ছেন।’

শিক্ষাবিদ, সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে যে বাস্তবতা আমরা দেখি, তাতে প্রমাণ হয়, আমাদের দেশে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতার ভিত্তি অনেকটা দুর্বল। বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অপরাধ দমনে আরও বেশি ভূমিকা পালনে আগ্রহী হতে হবে। অনৈতিক উপায় অবলম্বন করে যারা ভর্তি কিংবা চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে এবং বিচার ও সাজা না হলে তারা মনে করবেন, এ দেশে যেকোনো অপরাধ-অনিয়ম করে পার পাওয়া যাবে। তারা অনৈতিকতায় আরও বেশি উৎসাহিত হবেন এবং এভাবে চলতে থাকলে একসময় দেশে অপরাধ-অনিয়ম ঠেকানো আর কোনোভাবে সম্ভব হবে না।’