বালুতে ভরছে হালদা নদী খননের উদ্যোগ নেই

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র জোয়ার-ভাটার নদী, বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ চট্টগ্রামের হালদা নদী। প্রতি বছর এ নদীতে একটি বিশেষ মুহূর্তে ও বিশেষ পরিবেশে রুই, কাতল, মৃগেল ও কালবাউশ তথা কার্প জাতীয় মা মাছ ডিম ছাড়ে। এ ছাড়া হালদা নদীকে চট্টগ্রামের ‘লাইফ লাইন’ বলা হয়। কারণ চট্টগ্রাম শহরের পানির চাহিদা মেটাতে ওয়াসা প্রতিদিন ১৮ কোটি লিটার পানি সংগ্রহ করে এই নদী থেকে। কিন্তু বালু ভরাটের কারণে নাব্য হারাচ্ছে হালদা নদী। খননের কোনো উদ্যোগ না নিলে অচিরেই হারিয়ে যাবে হালদার প্রাকৃতিক পরিবেশ।

সরেজমিনে হালদা পাড়ের বাসিন্দা, ডিম সংগ্রহকারী ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদীর অনেক স্থানে হাঁটুপানি কোথাও কোমরপানি। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে নাব্য হারানোর সত্যতা ফুটে ওঠে। আগে ডিম সংগ্রহের মৌসুমে যেখানে ৯০ থেকে ১২০ ফুট গভীরে নৌকার নোঙর ফেলা হতো, সেখানে থেমেছে ৩০ ফুটে। স্বাভাবিক জোয়ারের পানি কখনো এলাকায় প্রবেশ করেনি। এখন জোয়ার সঙ্গে বৈরী আবহাওয়া হলেই এলাকার রাস্তাঘাট বাড়ির উঠোন তলিয়ে যায় পানিতে। হালদার পানি প্রবেশ করায় এর পাড়ে ক্ষেত-খামার প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে মিষ্টি মরিচের চাষ। হালদাপাড়ের বাসিন্দা ও ডিম সংগ্রহকারী মো. লোকমান (৬৯), মো. জাফর (৭০), আবু তৈয়্যব (৫৫), মো. শফি (৪৬) বলেন, যারা হালদার প্রতিনিয়ত খবর রাখেন তাদের কাছে এ বিষয়টি অবগত না হওয়ার কোনো কারণ নেই। যদি হালদা খননে ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, বর্তমানে হাতেগোনা মা মাছের ডিম ছাড়ার যে কয়টি কুম (কুয়া) রয়েছে তাও ভরাট হয়ে বিলীন হয়ে যাবে। আর কুম বিলীন হলে কার্প জাতীয় মা মাছ কখনো ডিম ছাড়বে না।

প্রাকৃতিকভাবেই একসময় হালদায় আগমন তাদের বন্ধ হয়ে যাবে।

হালদাপাড়ের বাসিন্দা ও গড়দুয়ারা ইউপি চেয়ারম্যান সরোয়ার মোর্শেদ তালুকদার বলেন, যেহেতু হালদার উৎপত্তিস্থল পাহাড়, সেহেতু প্রতিনিয়ত পাহাড়ের বালুকণা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. ফারুক ময়েদুজ্জামান বলেন, যেহেতু বৃষ্টি হলেই হালদা নদীতে পাহাড়ি উজানের ঘোলা পানি অর্থাৎ পাহাড়ি বালুকণা নেমে প্রবল স্রোতের সৃষ্টি হয় এবং এ নদী লম্বা ও সরু হওয়ায় পাহাড় থেকে নেমে আসা বালুকণা মিশ্রিত পানিতে হালদা ধীরে ধীরে ভরাট হয় এবং হচ্ছে সেহেতু ম্যানুয়ালি তথা ডুবুরি দিয়ে যদি বালু উত্তোলন করা হয় তাহলে হালদা নদীর তেমন ক্ষতি হবে না। ইতিমধ্যে অনেক জায়গায় চর লক্ষ করা গেছে। সেখানেও যদি এ পদ্ধতি ব্যবহার করে বালু তোলা হয়, তবে হালদার ক্ষতি নয় বরং উপকার হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ২০০৭-০৮ সালের দিকে কর্ণফুলী নদীতেও এমন বার্তা ছিল বালু উত্তোলন করলে ক্ষতি হবে, কিন্তু পরে যখন দেখতে পেল ভরাট হয়ে বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে তখন কর্তৃপক্ষ বালুমহালই ঘোষণা করে, যা এখনো পর্যন্ত জারি আছে। একসময় হালদার অবস্থাও সেই রকম হবে। সময় থাকতে হালদা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম মশিউজ্জামান বলেন, ম্যানুয়ালি বালু উত্তোলন অনেক জায়গায় চলছে। তবে তা প্রশাসনের আওতামুক্ত। যদি পরিকল্পনা করে সরকারিভাবে করা হয় তাহলে হালদা তার গভীরতা ফিরে পাবে। সম্প্রতি মৎস্য অধিদপ্তরের আয়োজনে রাউজান উপজেলায় একটি হালদাবিষয়ক কর্মশালায় এ বিষয়সহ অনেক বিষয় তুলে ধরেছেন হালদার সঙ্গে জড়িত অনেকে।

হালদা গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া ম্যানুয়ালি বালু উত্তোলনকে সমর্থন করে বলেন, এ পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনে যেমন হালদার গভীরতা ফিরে আসবে তেমন বালুর চাহিদা পূরণ হবে। পাশাপাশি যদি হালদার শাখা খালগুলোর প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে দেওয়া হয় তাহলে শাখা খালের স্বাভাবিক স্রোতে হালদায় পাহাড়ের জমানো পলি মাটি এমনিতে সরে যাবে। তিনি বলেন, ম্যানুয়ালি বালু উত্তোলনের নির্দেশনা অনেক আগে থেকেই দেওয়া আছে কিন্তু বাস্তবায়ন নেই। নির্দেশনা যথাযথ বাস্তবায়ন হলে হালদার নাব্য রক্ষা পাবে।