চাকরিপ্রার্থী প্রতি ভাড়া

কেন্দ্র পেতে গুনতে হয় লাখ টাকা তবুও থাকে না ফাঁকা

সরকারি চাকরি মানেই নিশ্চিত ভবিষ্যৎ। পরিশ্রম করলে বেসরকারি চাকরিও মন্দ নয়। এমন ভাবনাই কাজ করে বেশিরভাগ মানুষের মনে। কিন্তু একজন বেকারের কাছে চাকরি পাওয়া কঠিন কাজ, অন্যদিকে চাকরিদাতার কাছে লোকনিয়োগও তেমনি দুরূহ। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে চূড়ান্ত বাছাই পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে বিরাট ঝক্কিঝামেলা মনে করেন প্রতিষ্ঠানপ্রধানরা। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলেই লাখ লাখ আবেদন। এগুলো বাছাই করা সহজ নয়। কোনো মানদণ্ড ধরে বাছাই করতে পারলেও এত লোকের পরীক্ষার হল পাওয়া নিয়ে আরেক দুশ্চিন্তা! বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য তো বটেই, সরকারি প্রতিষ্ঠানও পরীক্ষার জন্য হলের ব্যবস্থা করতে গলদঘর্ম হচ্ছে। হল পেলেও টাকা-পয়সার পরিমাণে মিলছে না। আবার টাকা-পয়সার পরিমাণে মিললেও শিডিউল মিলছে না। সবকিছু মিলে পরীক্ষার কেন্দ্র ব্যবসা বেশ জমজমাট।

নিয়োগ পরীক্ষায় সমন্বয়হীনতার কারণেই যুবকরা সবচেয়ে বেশি হতাশ হচ্ছেন এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন

সাধারণত ঢাকার বিভিন্ন কলেজ ও স্কুলগুলোতে চাকরির পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া হয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিয়োগ পরীক্ষার জন্য কেন্দ্র ভাড়া করতে হয় কমপক্ষে এক মাস আগে। অবশ্য এক মাস পর পাওয়া যাবে এমন নিশ্চয়তা নেই। রাজধানীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উদয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বুয়েটের ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং নিউ মডেল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ঘুরে এমন তথ্য মিলেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চাকরিপ্রার্থী কম থাকলে হল ভাড়া দিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহ দেখায় না। প্রতিষ্ঠান অনুযায়ী আছে তারতম্য। কিন্তু খরচের বেলায় প্রায় সবাই সমান। এক ঘণ্টার পরীক্ষার জন্য চাকরিপ্রার্থী প্রতি দিতে হয় ৬০ টাকা। দেড় বা দুই ঘণ্টার পরীক্ষা হলে এই ফি হয়ে যায় ৮০ থেকে ১০০ টাকা। সাধারণত দেড় হাজারের কম প্রার্থী হলে আগ্রহ দেখায় না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। কমপক্ষে এক থেকে দেড় লাখ টাকার বিল হলে আগ্রহ দেখায় স্কুল-কলেজগুলো। রাজধানীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সকাল-বিকেল দুই শিফট মিলে মাসে গড়ে সাতটি এ ধরনের পরীক্ষা আয়োজন করে থাকে। পরীক্ষাকেন্দ্র ভাড়া, শিক্ষকের পরিদর্শক ফিস এবং প্রধান পরিদর্শক, সহকারী পরিদর্শক, কেন্দ্র সমন্বয়ক ও অফিস সহায়কসহ পরীক্ষা আয়োজনের সব খরচই পায় প্রতিষ্ঠানগুলো। সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক খাতা দেখলে আবার প্রতিটি খাতার জন্য টাকা পায়।

ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক কর্মকর্তা জানান, এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে পরীক্ষা নিতে হলে প্রার্থীর সংখ্যা কমপক্ষে ১ হাজার ২৯২ জন হতে হবে। গত মে মাসের সব শুক্র ও শনিবারই তাদের স্কুলে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। জুন মাসেও একই ধারা। আসছে জুলাই মাসে চাকরির পরীক্ষার শিডিউল আছে কি না, জানতে চাইলে তিনি জানান, জুলাই মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত ইতিমধ্যে শিডিউল বুকিং করা আছে, এরপর বুকিং করতে চাইলে দ্রুত সময়ের মধ্যে আবেদন জমা দিতে হবে। অন্যথায় ফাঁকা পাওয়া যাবে না। উদয়ন স্কুলের একজন শিক্ষক জানান, ঘণ্টায় মাথাপিছু ৬০ টাকা হিসেবে তাদের হলরুম ভাড়া দেওয়া হয়। তবে দেড় হাজার প্রার্থীর কম হলে আগ্রহ দেখানো হয় না। বুয়েটের ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলের চাহিদা আরও বেশি। স্কুলটিতে পরীক্ষা নিতে হলে প্রার্থীর সংখ্যা হতে হবে কমপক্ষে ২ হাজার ৭০০ জন। সেখানেও এক মাসের আগে হলরুম পাওয়া যায় না।

গত ২৬ এপ্রিল হয়েছে ৪৬তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা। একই দিনে হয়েছে নির্বাচন কমিশনসহ অন্তত আরও ছয়টি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষা। একই দিনে পরীক্ষা হওয়ায় অনেক প্রার্থীর পক্ষেই এসব পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সম্ভব হয়নি। তাছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সংস্থার নিয়োগ পরীক্ষা লেগেই থাকে। একাধিক কর্র্তৃপক্ষ হওয়ায় ঢাকার বাইরের প্রার্থীকে চাকরির পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রায় প্রতি সপ্তাহে ঢাকায় আসতে হয়। চাকরিপ্রার্থীরা আবেদন করার সময় বুঝতে পারেন না কবে তাদের নিয়োগ পরীক্ষা হবে। তাই তারা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবেদন করেন। পরে অনেক প্রতিষ্ঠানের চাকরি পরীক্ষা এক দিনে অনুষ্ঠিত হওয়ায় তারা অংশ নিতে পারেন না। এতে বেকার চাকরিপ্রার্থীদের আর্থিক ক্ষতি হয়। পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার প্রবেশপত্র ও প্রস্তুতি থাকার পরও অংশ নিতে না পেরে তারা হতাশ হয়ে পড়েন। এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার জন্য সমন্বিত পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়ার দাবি তুলেছেন চাকরিপ্রার্থীরা।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা হাসিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সকালে একটি আর বিকেলে একটি মিলে মোট দুটি পরীক্ষায় বসতে পারব। অথচ আমি চারটি পরীক্ষার জন্য ফি জমা দিয়ে আবেদন করেছি। আমার মতো এমন বিড়ম্বনার শিকার হাজারো চাকরিপ্রার্থী। তারাও একই দিনে ও একই সময়ে একাধিক পরীক্ষা হওয়ায় অনেক চাকরির পরীক্ষা দেওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।’

আরেক চাকরিপ্রার্থী শিক্ষার্থী বলেন, ‘সমন্বয়হীনতার কারণে একজন পরীক্ষার্থীর একাধিক পরীক্ষা একই দিনে বা একই সময়ে হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উচিত এর একটি সমাধান বের করা, এতে হাজারো শিক্ষার্থীর উপকার হবে আর নিয়োগ প্রক্রিয়া একটি পদ্ধতির মধ্যে চলবে।’

পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) সিদ্ধান্ত নিয়েছে পিএসসির যেকোনো পরীক্ষায় একবার অংশ নিলে পরে তাদের আর রেজিস্ট্রেশন করতে হবে না। একবারের রেজিস্ট্রেশন দিয়েই তারা বারবার চাকরির পরীক্ষায় বসতে পারবেন। ৪৭তম বিসিএস থেকেই এ নিয়ম কার্যকর হবে। চাকরিপ্রার্থীরা বলছেন, পিএসসির বাইরের সংস্থাগুলোরও সমন্বিত পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়া হলে তারা উপকৃত হবেন। এতে তাদের বারবার আবেদন করতে হবে না। চাকরিপ্রার্থীদের অসহায়ত্বের বিষয়টি জনপ্রশাসনের নীতিনির্ধারকদেরও ভাবিয়ে তুলেছে। জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুধু একবার রেজিস্ট্রেশনের পাশাপাশি পুলপ্রথা চালু করলে বেকারদের দুর্ভোগ কমবে। শুধু তাই নয়, এতে সরকারেরও সাশ্রয় হবে। অর্থ ও সময় খরচ করে বারবার পরীক্ষার আয়োজন করতে হবে না। যে সংস্থার জনবল দরকার তারা পুল থেকে চাহিদামতো রিকুইজিশন দিয়ে জনবল নিতে পারবে। এজন্য পিএসসিকেই দায়িত্ব নিতে হবে।

সংবিধান অনুযায়ী সরকারের যেকোনো দপ্তরের চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা পিএসসির অধীনেই হওয়ার কথা। পিএসসি দায়িত্ব নিলে অতিরিক্ত অর্থ খরচ হবে না। যেমন পরীক্ষার্থী নাম নিবন্ধন করলে বা আবেদন করলে সে সংখ্যা হিসেবে প্রশ্ন, খাতা, কেন্দ্র এসব খরচ নির্ধারণ করা হয়। ফলে এই অতিরিক্ত অর্থ খরচ ঠেকানো সম্ভব।

এদিকে বেকার চাকরিপ্রার্থীদের লাভ না হলেও আর্থিক লাভ হয় নিয়োগ কমিটির (ডিপিসি) সদস্যদের। পিএসসির কর্মকর্তারা চাকরি আয়োজনের জন্য কোনো আর্থিক সুবিধা না পেলেও ডিপিসি সদস্য হিসেবে মন্ত্রণালয় বা দপ্তরের কর্মকর্তারা এ সুবিধা পান। কমিটির সদস্যরা প্রতিটি সভায় অংশ নেওয়ার জন্য ৫ হাজার টাকা করে ভাতা বা সম্মানী নেন। দেখা যায় ছোট্ট একটি এজেন্ডা বা পাঁচ মিনিটের সভার জন্য নাশতা, ভোজন ও সম্মানী বাবদ ব্যয় করা হচ্ছে। এভাবে শুধু আর্থিক লাভের জন্য অহেতুক একাধিক সভা করা হয়। ফলে একটা দপ্তরের নিয়োগ কার্যক্রমের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একেকজন সদস্য ন্যূনতম ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা সম্মানী নিয়ে থাকেন। অথচ একই কাজের জন্য পিএসসির কেউই কোনো ভাতা বা সম্মানী ভাতা পান না।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিয়োগের সুপারিশ করা সাংবিধানিকভাবে পিএসসির কাজ। তাই এ কাজের জন্য কোনো ভাতা পিএসসির কেউ পাবেন না। সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী, নিয়োগ কাজ করা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অবশ্য করণীয় ও পালনীয় দায়িত্ব। যে কাজের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এবং অর্থ বিভাগের প্রতিনিধি অর্থ নিয়ে থাকেন, ঠিক একই কাজের জন্য পিএসসিকে ওই দুই মন্ত্রণালয় না করে দিয়েছে! যা নিয়ে পিএসসিতে অসন্তোষ রয়েছে।

অন্যদিকে দপ্তর-সংস্থাগুলো বিক্ষিপ্তভাবে পরীক্ষা নেওয়ার ফলে এসব নিয়োগের কোনো সুনির্দিষ্ট মান নেই। নিয়োগের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তদবির হয়ে যায় প্রধান যোগ্যতা। নিয়োগ নিয়ে নানান ধরনের মামলা প্রমাণ দেয় অস্বচ্ছতার। শুধু আর্থিক অপচয় নয়, নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয়ও বেশ হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের সব নিয়োগ পিএসসিকে দিতে হবে। পিএসসি বেতন গ্রেড নির্বিশেষে কাজের ধরন বা প্রকৃতি অনুযায়ী তিনটি স্তরে ভাগ করবে। এর মধ্যে প্রথমটি হলো সাপোর্টিং স্টাফ অর্থাৎ দপ্তরে যারা অফিস সহায়ক, ড্রাইভার, সাঁট-মুদ্রাক্ষরিক, কম্পিউটার অপারেটর, প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এও), ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) ইত্যাদি পদ। এ পদগুলোর জন্য একটি নির্দিষ্ট শিক্ষা স্তর নির্ধারণ করা ও পরীক্ষা নেবে। ম্যানেজেরিয়াল লেভেল বা ব্যবস্থাপনা স্তরে থাকবে সহকারী পরিচালক থেকে মহাপরিচালক পর্যন্ত পদগুলো। তাদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ এবং সে অনুযায়ী পরীক্ষার আয়োজন করা। আরেকটি হলো পলিসি লেভেল; সাধারণত প্রধান কার্যালয় তথা সচিবালয়ের পদগুলো। এ তিনটি স্তরের জন্য প্রতি বছর তিনটি বাছাই পরীক্ষা আয়োজন করা বেশ সহজ হবে। ফলে কেউই পরীক্ষায় অংশ নেওয়া থেকে বাদ যাবে না। এভাবে উত্তীর্ণরা সরকারের চাহিদা অনুযায়ী মেধার ও পছন্দের ভিত্তিতে নিয়োগের জন্য মনোনয়ন পাবে এবং সরকার নিয়োগ দান করবে। এভাবে একবার উত্তীর্ণ হলে ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত আর পরীক্ষা দেওয়া লাগবে না। তবে নিয়োগের শর্ত পরিবর্তন হলে সে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করতে হবে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিয়োগ পরীক্ষায় সমন্বয়হীনতার কারণেই যুবকরা সবচেয়ে বেশি হতাশ হচ্ছেন এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বেকার যুবকদের জন্য এটি পাহাড়সম চাপ। এ পরীক্ষাগুলো যতটা নিয়মের মধ্যে আনা যাবে ততই ভালো। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উচিত এর একটি সমাধান বের করা, যা হাজারো শিক্ষার্থীর উপকারে আসবে, নিয়োগ প্রক্রিয়া একটি সিস্টেমের (পদ্ধতির) মধ্যে চলবে। তাতে সাধারণ শিক্ষার্থীর উপকার হবে, দেশের উপকার হবে।’