চুই পো ওয়েই নামে এক চীনা নাগরিকের সঙ্গে নিজের মেয়ে লাভলীর (ছদ্মনাম) বিয়ে দিয়েছিলেন এক নারী। চুয়াডাঙ্গার পরিবারটি বিশ্বাস করেছিল চীনা লোকটি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। তিনি গাজীপুরের একটি কারখানায় কাজ করেন এবং বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থাকবেন। এছাড়াও দারিদ্র্যতা থেকে বেরিয়ে আসার আশা ছিল মায়ের। তবে এ সবই ছিল পাচারকারীদের ফাঁদ।
গত বছরের ১ জুলাই লাভলীর সঙ্গে চীনা লোকটির বিয়ে হয়। আর চলতি বছরের ৩১ মার্চ ঢাকার একটি ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন ওই নারী। মামলায় বলা হয়, বিয়ের ছয় মাস পর তার মেয়ে লাভলীকে চীনে নিয়ে যৌনকাজে বাধ্য করেছে ওই ব্যক্তি। মেয়ে তাকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশি পাচারকারীরা তাকে ওই চীনা লোকের কাছে ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করে দিয়েছে।
লাভলীর মায়ের দায়ের করা মামলায় অভিযুক্তরা হলেন চুই পো ওয়েই, জি ইজিয়ান (যিনি নিজেকে ওয়েইয়ের বোন পরিচয় দিয়েছিলেন), বগুড়ার আব্দুল্লাহ আল মামুন, চুয়াডাঙ্গার ফারুক ও আব্দুল মান্নান, কাশিমপুরের সোলায়মান এবং রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর বিয়ের রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান মোল্লা।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, আসামিরা সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী। তারা অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে লাভলীকে যৌন নির্যাতন এবং জোরপূর্বক যৌনকাজে বাধ্য করার জন্য চীনে পাচার করেছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ মামলাটি তদন্ত করছে। বৃহস্পতিবার (২৭ জুন) ‘চীনে বাংলাদেশি নারী পাচার’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনে লাভলীর এই ঘটনাটি তুলে ধরল দেশের শীর্ষ গণমাধ্যম।
এর আগে এপ্রিলে ‘চীনে বিক্রি হচ্ছে পাহাড়ি তরুণীরা’ শীর্ষক অপর একটি প্রতিবেদন ছাপিয়েছে দেশের একটি পত্রিকা। তাতে বলা হয়, এক সন্তান নীতির মারপ্যাঁচে পড়ে চীনে এখন নারীর চেয়ে পুরুষের সংখ্যা অনেক বেশি। অনেক পুরুষ বিয়ের জন্য নারী পাচ্ছেন না। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে মাঠে সক্রিয় পাচারকারী চক্র।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে চীনাদের চেহারার মিল আছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে চক্রের সদস্যরা উন্নত জীবনযাপনের লোভ দেখিয়ে পাহাড়ি পরিবারগুলোকে রাজি করাচ্ছে। এ কাজে সুবিধার জন্য অনেক সময় এ দেশেই চীনাদের সঙ্গে বিয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বা বিয়ের জাল কাগজ তৈরি করা হচ্ছে।
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী সে সময় বলেছিলেন, ‘ভারত ও পাকিস্তানে নারী পাচারকারীদের অনেকটা আটকানো গেছে। এখন চীনে পাচার শুরু হয়েছে। সরকারের উচিত বিদেশিদের বিয়ে করার বিষয়ে আইনে আরও কড়াকড়ি আরোপ করা। তাহলেই এ ধরনের পাচার বন্ধ হবে। পাশাপাশি পাহাড়িদের সচেতন করতে হবে। এই দায়িত্বটা সরকারকেই নিতে হবে।’
২০১৮ সালে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে ক্ষুদ্র নৃ গোষ্টীর তিন নারীকে চীন থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। বাংলাদেশের চীনা দূতাবাসও বলেছে, চীন সরকার নারী ও শিশুদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করে। মানবপাচারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়। এছাড়া দূতাবাস বাংলাদেশে চীনা নাগরিকদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও উল্লেখ করেছে।