কর বৃদ্ধি বিলের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী বিক্ষোভ সত্ত্বেও মঙ্গলবার (২৫ জুন) কেনিয়ার সংসদে বিলটি পাস হয়। এর জবাবে বিক্ষোভকারীরা সংসদে প্রবেশ করে ভাঙচুর চালায় এবং সংসদ ভবনের কিছু অংশে আগুন দেয়। এমন প্রেক্ষাপটে কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো সামরিক বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ দিয়ে বলেন যে, দেশে কোনোরকম ‘সহিংসতা ও নৈরাজ্য’ সহ্য করা হবে না।
আর প্রেসিডেন্টের এমন নির্দেশের পরই পুলিশের গুলিতে ২৩ বিক্ষোভকারী নিহত হন। পরে বুধবার স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে ৪টার সময় এক সংবাদ সম্মেলনে ওই বিলটি প্রত্যাহার করে নেন। তিনি সেসময় বিক্ষোভকারীদের দাবি মেনে বলেন, এটি স্পষ্ট হয়ে গেছে যে এই বিলে কেনীয়দের কোনো সম্মতি নেই। আমি বশ্যতা স্বীকার করে নিচ্ছি। পাশাপাশি বিলটিতে সই করে তা আইনে পরিণত করবেন না বলেও জানান তিনি।
তবে কর বৃদ্ধিই কি শুধুমাত্র একটি কারণ যা কেনিয়ার দেশব্যাপী বিক্ষোভকে উসকে দিয়েছে। না, এটি মাত্র একটি কারণ। এর পেছনেও রয়েছে নাগরিকদের জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে অসন্তুষ্টি এবং প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়ার অভিযোগ।
আল জাজিরা ও ডয়চে ভেলের খবরে বলা হয়, আফ্রিকার এই দেশটির জনগণ করোনা মহামারির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, ইউক্রেনের যুদ্ধ, টানা দুই বছরের খরা এবং মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে সৃষ্ট বেশ কয়েকটি অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। তাদের এমন অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেই রাজস্ব আয় বাড়াতে আরও প্রায় ২৭০ কোটি মার্কিন ডলারের করের বোঝা জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
আর এ কারণে রুটোর সমালোচকরা তাকে বাইবেলের জ্যাকায়েসের সাথে তুলনা করেছেন। বাইবেলের এই চরিত্রটি খুব ধনী রাজস্ব আদায়কারী ছিলেন, কারণ তিনি জেরিকো শহরে প্রধান কর আদায়কারীর পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি রোমান সরকারের কাছে তাদের ঋণের পরিসংখ্যান ফুলিয়ে তুলে জনগণের সাথে প্রতারণা করতেন।
কারণ ২০২২ সালে কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণা চালানোর সময়, রুটো তার সমর্থকদের বোঝান যে তিনি একটি অত্যাধুনিক অর্থনৈতিক মডেল বাস্তবায়ন করবেন। এর মাধ্যমে তিনি দেশের জনগণের জীবনযাত্রার খরচ কমিয়ে আনবেন, ক্ষুধা নির্মূল করবেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন এবং এর এসবের মাধ্যমে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ বাড়াবেন।
কিন্তু নির্বাচনের পর রুটোর প্রশাসন বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন এবং উচ্চ মজুরির দাবিতে ধর্মঘটের কারণে বেসামাল হয়ে পড়েছে। তার সমালোচকরা অভিযোগ করেছেন যে, রুটো ভোটারদের কাছে মিথ্যা কথা বলেছেন এবং ট্যাক্স বাড়ানোর ওপর বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। তবে ট্যাক্স বৃদ্ধির মাধ্যমে কেনিয়ার সামান্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছে; তবে তা বেশিরভাগই অনানুষ্ঠানিক খাতে।
রুটো তার বাজেট পরিকল্পনাকে উৎকৃষ্ট দেখাতে সাবেক প্রেসিডেন্ট উহুরু কেনিয়াত্তার সরকারের ওপর দোষ চাপিয়েছেন। তিনি বলেন, আগের সরকারের বাজেট ঘাটতি পূরণ এবং ঋণের দায় টানতে গিয়ে বাজেটে এই অতিরিক্ত কর বাড়ানো হয়েছে।
কেনিয়ার ৪৭টি কাউন্টির মধ্যে অন্তত ৩৫টি কর বৃদ্ধির বিরুদ্ধে বিক্ষোভে নেমেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে লুটপাট ও সম্পত্তি ধ্বংসের খবর পাওয়া গেছে। মঙ্গলবারের বিক্ষোভের সময় রুটো সেনাবাহিনী প্রতি পুলিশকে সমর্থন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে খবর পাওয়া গেছে। বিরোধীদলীয় নেতা রাইলা ওডিঙ্গা এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট কেনিয়াত্তা বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতা বন্ধ করতে এবং "জনগণের কথা শুনতে" সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে মঙ্গলবার কর বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এখন সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। সারাদেশব্যাপী এখন বিক্ষোভকারীরা রুটোর পদত্যাগ দাবি করছে। দেশটির রাজধানী নাইরোবি এখন রুটোর পদত্যাগের দাবিতে মুখর হয়ে উঠেছে। তবে এমন অবস্থায় দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে শান্ত থাকতে দেখা গেছে। তারা বিক্ষোভকারীদের কোনো বাধা দেয়নি বলে জানিয়েছে আল জাজিরা।
এদিকে কেনিয়ার বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। পাশাপাশি তারা এই দুঃখজনক ঘটনা নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছে। তারা জানিয়েছে, আইএমএফের প্রধান লক্ষ্য কেনিয়ার অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে এবং এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও সেদেশের জনগণের জীবনকে উন্নত করতে সহায়তা করা। এছাড়া দেশটির শক্তিশালী, টেকসই এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য কেনিয়ার সাথে কাজ করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
পূর্ব আফ্রিকার এই দেশটিতে ১৯৫৭ সালে প্রথম সরাসরি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বৃটিশরা চেয়েছিল মধ্যপন্থী আফ্রিকানদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে। কিন্তু জুমু কেনিয়াত্তার দল কেনিয়া আফ্রিকান ন্যাশনাল ইউনিয়ন বা কানু ১৯৬৩ সালের ১২ ডিসেম্বর দেশটি স্বাধীন হওয়ার কিছুদিন আগে সরকার গঠন করে। স্বাধীনতার দিনটিতেই তারা দেশটির প্রথম সংবিধান রচনা করে। কেনিয়া স্বাধীন হওয়ার এক বছর পর দ্য রিপাবলিক অব কেনিয়া ঘোষিত হয়। জুমু কেনিয়াত্তা হন দেশটির প্রথম প্রেসিডেন্ট।