পরিবারের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে উইনস্টন চার্চিল বলেছেন ‘কোনো সন্দেহ নেই, পরিবার ও আপন ঘরের মাঝেই সব গুণাবলি, মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ গুণগুলো শক্তিশালী হয় এবং টিকে থাকে। পরিবার সম্পর্কে বলতে গিয়ে জে. কে. রাউলিং বলেন, পরিবার হলো জীবনের ঝড়ো সমুদ্রের মাঝে একটি লাইফজ্যাকেট। অন্যভাবে বলতে গেলে, পরিবার হচ্ছে গাছের ডালের মতো। আমরা বিভিন্ন দিকে বেড়ে ওঠি, তবুও শিকড় এক জায়গাতেই। পরিবার একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যেখানে মায়া-মমতা, আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখসহ জীবনের সব বিষয় কিংবা অনুভূতিগুলোকে ভাগ করে নেওয়া যায়। আগে গ্রামীণ জনপদের পরিবার ছিল মূলত যৌথ পরিবার। যেখানে মা-বাবা, ভাই-বোন, নানা-নানি, দাদা-দাদু সবাই একসঙ্গে বসবাস করত। সবাই মিলেমিশে সব কাজে একে অপরকে সাহায্য-সহযোগিতা করত।
দিন বদলেছে। মানুষ শিক্ষাগত দিক থেকে উন্নতি সাধন করেছে। অর্থনৈতিকভাবে অনেকেই সাবলম্বী হতে পেরেছে। আমাদের চিন্তাধারায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। একটা সময় ছিল, যখন মানুষ আশপাশের মানুষের কথা ভাবত। সব মানুষের উপকারের কথা চিন্তা করত। বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়াত। কিন্তু আমরা এককেন্দ্রিক চিন্তার ফলে সে অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে এসেছি। কিন্তু সেখানেও বিভিন্ন সমস্যা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পিতা-মাতার বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তারা আর্থিক উপার্জনে অক্ষম হয়ে পড়ে। এমনকি তারা তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি হারানোর ফলে আগের মতো পরিবার নিয়ন্ত্রণ করতে সমর্থ হয় না। অন্যদিকে সন্তানরা আর্থিক সচ্ছলতা লাভ করে। আগের মতো পিতা-মাতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে না। তারা এক ধরনের পারিবারিক স্বাধীনতা গ্রহণ করতে চায়। যৌথ পরিবার ভাঙার এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। পরবর্তী সময় মানুষ সব আত্মীয়স্বজন, পরিবার, পরিজন সবকিছু বাদ দিয়ে পুরোপুরি এককেন্দ্রিক অর্থাৎ একক পরিবার গড়তে আগ্রহী হয়ে ওঠে। যার প্রেক্ষিতে দেখা যায়, যৌথ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্য সবাইকে ছেড়ে শুধু স্বামী-স্ত্রী আলাদা হয়ে বসবাস করার ইচ্ছা পোষণ করে। যৌথ পরিবার ভাঙার ক্ষেত্রে এটিই কি বড় কারণ?
অর্থনৈতিক উন্নতির ফলে দেশ ও বিদেশে নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করতে হয়। এটিও যৌথ পরিবার ভাঙার আরেকটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ গ্রামীণ অর্থনীতি বিকাশের চেয়ে শহরের অর্থনৈতিক বিকাশ দ্রুত ঘটার ফলে মানুষ শহরকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শহরকেন্দ্রিক শিল্প-কলকারখানা গড়ে ওঠার ফলে তারা তাদের বাসস্থান ত্যাগ করে নতুন কর্মস্থলে বসবাসের সুযোগ লাভ করে। ফলে গ্রামীণ জনপদের যৌথ পরিবারগুলো আগের মতো আর যৌথ পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারে রূপ লাভ করছে। গ্রামীণ জনপদের যৌথ পরিবার সম্পর্কে বলতে গেলে তা কিছুটা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও, সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে আনন্দে বসবাস করা, সবকিছুতে সবার একটি অংশীদার নিশ্চিত হওয়া, সবাই মিলে সবার সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়া, সবার বিপদে-আপদে পাশে থেকে খোঁজখবর নেওয়া, সবার ভালো-মন্দে সবার মতামত গ্রহণ কিংবা যৌথ সিদ্ধান্তে পরিচালিত হওয়া এসব ছিল যৌথ পরিবারের মাধুর্য। আর শহরের জীবন হচ্ছে কোলাহলপূর্ণ, কর্মব্যস্ততা, আর্থিক উৎকর্ষ সাধনে সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত রাখা। তবে মানুষ যখন তার প্রয়োজন কিংবা চাহিদা অনুযায়ী স্বার্থকেন্দ্রিক হয়ে নানা কারণে যৌথ পরিবার ভেঙে এককেন্দ্রিক হয়ে একক পরিবারের দিকে ঝুঁকছে কিংবা বসবাস করছে সেখানেও ঘটছে নানা বিপত্তি আর সমস্যা।
একক পরিবারে বেড়ে ওঠা স্কুল, কলেজ পড়ুয়া তরুণ-তরুণীরা জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে। যৌথ পরিবারের পরিবর্তে একক পরিবার হয়ে উঠছে আরও বড় সমস্যার কারণ। ফলে ঘটছে প্রতিনিয়ত ডিভোর্সের মতো ঘটনা কিংবা পরকীয়া। যা পারিবারিক সুখ-শান্তিকে ক্রমান্বয়ে বিনষ্ট করছে। বিশ বছর আগে যেখানে পরকীয়া কিংবা ডিভোর্সের মতো সমস্যা ছিল অতি সামান্য, সেখানে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারে গিয়ে সেটা হরহামেশাই ঘটছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২১ সালের ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৫ বছর ধরে তালাকের হার ঊর্ধ্বমুখী। বিশেষ করে খোদ রাজধানীতে প্রতিদিন গড়ে বিবাহ বিচ্ছেদ হচ্ছে ৩৭টি। তাহলে আমরা একক পরিবারকে কীভাবে দেখছি? মূলত একক পরিবার হচ্ছে একক চিন্তা। যা কখনো কখনো নিজ স্বার্থে পরিবারের অন্য সবাইকে বাদ দিয়ে কেবল প্রবলভাবে নিজের জন্য কাজ করে যাওয়া। সুখের জন্য যেখানে মানুষ যুগের পর যুগ পরিবারের মধ্যেই সংগঠিত থেকেছে, সেখানে একক পরিবার কি পারছে মানুষের সুখ-শান্তি কিংবা আশা-আকাক্সক্ষাগুলোকে পূরণ করতে?
যৌথ পরিবারে হয়তো কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবু একক পরিবারে যে সমস্যাগুলো প্রতিনিয়ত আমরা দেখতে পাচ্ছি, যৌথ পরিবারে সেগুলোর মাত্রা কিছুটা হলেও কম পরিলক্ষিত হতো। তাহলে কি এককেন্দ্রিক পরিবারে অবাধ স্বাধীনতা থাকলেও মানুষ নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে? অন্যদিকে যৌথ পরিবারগুলোতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবাধ স্বাধীনতা না থাকলেও তা পারস্পরিক সম্পর্কগুলোর মধ্যে সুন্দর সেতুবন্ধন রচনা করতে সক্ষম হয়? আমরা বলতে পারি, যৌথ পরিবারও হতে পারে সুখের স্বর্গরাজ্য। তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, মানুষের নিজস্ব উন্নতির জন্য যে কোনো পরিবারই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু একক পরিবারেও যদি কাক্সিক্ষত শান্তি না আসে, তারপর! কোথায় শান্তি পাব? নাকি আবার ফিরে আসতে হবে যৌথ পরিবারেই!
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক
reshalat@gmail.com