বিশ হাজার টাকা জামানত তলব

প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। ছিলেন বাংলাদেশ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন আর্ট গ্যালারি ‘শিল্পাঙ্গন’। প্রগতিশীল পাঠাগার ‘সমাজতান্ত্রিক পাঠাগার’-এর প্রতিষ্ঠাতা। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রথম প্রধান সম্পাদক অকৃতদার এই কবি ও ছড়াকার মারা যান ২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ ঘটাতে চিন্তা পাতায় ছাপা হলো তার লেখা উপসম্পাদকীয়

ড. আবু মাহমুদকে হত্যার কোনো সুনির্দিষ্ট ষড়যন্ত্র ছিল কিনা, সে সম্পর্কে নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে শাসকচক্রের পৃষ্ঠপোষকতায় গুলিস্তান রেস্তোরাঁয় সন্ধ্যাযাপনকারী প্রাইভেট বাহিনী সেদিন দিবালোকে তাকে যেভাবে আক্রমণ করেছিল, তাতে তার অকাল মৃত্যুর আশঙ্কাই ছিল স্বাভাবিক। তিন মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর এখনো তিনি বেঁচে আছেন। বাঙালি বিদ্বেষ্টা প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান শাসনের জন্য যাকে উপযুক্ত মনে করেছিলেন, সেই গভর্নর মোনায়েম খাঁর আমলের কথা। শাসকদের স্বার্থরক্ষার প্রয়োজনে সুগঠিত প্রাইভেট বাহিনী পরিকল্পিত উপায়ে লালন-পালনের অনুশীলন প্রকৃতপক্ষে তখন থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতি ক্ষেত্রে শুরু হয়। পরবর্তীকালে দুটো রেজিমের প্রাইভেট বাহিনীর দৌরাত্ম্যের কাহিনী এ ক্ষেত্রে আলোচ্য বিষয় নয়। সে সময় ষাটের দশকের মাঝামাঝি দুঃশাসনের কালে, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান ড. মাহমুদকে প্রকাশ্যে শিক্ষাঙ্গনের আবাসিক এলাকায় আক্রমণের খবর শুনে দেশবাসী আতঙ্কিত হয়েছিলেন; কিন্তু অনেকে এই নিন্দনীয় ঘটনাকে অস্বাভাবিক বলে মনে করেননি।

অর্থনীতিবিদ ড. মাহমুদ ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও শাসন এবং একচেটিয়া পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। রাজনৈতিক অরাজকতা ও অর্থনৈতিক শোষণের সমালোচনা করে তিনি শাসকগোষ্ঠীর সমর্থকদের কাছে অবাঞ্ছিত ব্যক্তিরূপেই চিহ্নিত হন। চৌষট্টি সালে ঢাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানোর উদ্দেশ্যে মাথায় রঙিন রুমাল জড়ানো এক বিশেষ দলের কয়েকশ লোক যখন উসকানিমূলক স্লোগান দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় গেটে উপস্থিত হয়, এই ড. মাহমুদই তখন দাঙ্গা-সমর্থক ক্ষিপ্ত ছাত্রদের বাধা দিয়ে চিৎকার করে বলেছিলেন : আমার লাশের ওপর দিয়েই কেবল দাঙ্গার উদ্দেশ্যে তোমরা শহরে বের হতে পারবে! এ ধরনের একজন সরকার সমালোচক ও ‘এগ্রেসিভ’ অধ্যাপককে বিশ্ববিদ্যালয়ে আর রাখা যায় না। এমন একজন অধ্যাপককে নিয়োগ করতে হবে, যিনি অন্তত ড. মাহমুদের মতো সোচ্চার ব্যক্তি নন। সরকারের চেষ্টায় অতিরিক্ত বেতনে রিডার হিসেবে ড. কে. টি. হোসেনকে তার স্থলে অর্থনীতি বিভাগের প্রধান করা হয় এবং ড. মাহমুদকে বিভাগীয় প্রধানের কার্যভার বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ আসে। গভর্নর মোনায়েম খাঁর একান্ত প্রিয় ড. এম.ও. গনি সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ড. মাহমুদ শেষ পর্যন্ত সুবিচারের আশায় হাইকোর্টে মামলা দায়ের করতে বাধ্য হন। মাননীয় হাইকোর্টের মামলায় ড. মাহমুদ জয়লাভ করেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বা সরকার কোনোক্রমেই ড. মাহমুদকে বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রহণ করতে রাজি নন। এই পরিস্থিতিতে কে বা কারা প্রাইভেট বাহিনী নিয়োগ করেন। হাইকোর্টের রায় বের হওয়ার দিন সকাল থেকেই এই মামলাটি বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ আলোচ্য বিষয় ছিল। সেদিন হাইকোর্ট বিচারকের কক্ষ ও করিডোর ছাত্র, শিক্ষক ও রাজনৈতিক কর্মীদের দল পরিপূর্ণ করে রেখেছিল।

পিনপতন নীরবতার মধ্যে হাইকোর্টের মাননীয় বিচারপতি ড. মাহমুদের পক্ষে রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত শ্রোতাদের এক অংশ উত্তেজিত হয়ে ওঠে। ড. মাহমুদ দ্রুতগতিতে হাইকোর্ট কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসেন এবং উত্তেজনা সৃষ্টিকারী একদল যুবকের সম্মুখ দিয়েই একটি ক্ষুদ্র গাড়িতে করে অধ্যাপকদের আবাসিক এলাকার দিকে যাত্রা করেন। নিজ ফ্ল্যাটের সম্মুখেই অদৃশ্য হস্তের ইঙ্গিতে সেই প্রাইভেট বাহিনীর যুবকরা তাড়া করে ড. মাহমুদকে আকস্মিক আক্রমণ করে। এই লেলিয়ে দেওয়া গুন্ডাদের হাত থেকে তাকে রক্ষা করা যায়নি। প্রকাশ্যে বহু মহিলা-পুরুষের সম্মুখেই তাকে প্রহার করা হয় ড. মাহমুদের একমাত্র অপরাধ (!) ছিল, তিনি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বিচার চেয়েছিলেন এবং হাইকোর্ট তার পক্ষে আইনসম্মত রায় দেন। ড. মাহমুদ যখন হাসপাতালে, সে সময় কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কোর্টে উক্ত মামলা উত্থাপন করেন এবং অর্থনীতি বিভাগ প্রধানের কক্ষের তালা ভেঙে নবনিযুক্ত প্রধানকে উক্ত বিভাগের দায়িত্ব তুলে দেন। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হামুদুর রহমান সর্বদাই সরকারের জন্য একজন চোখা ও উজ্জ্বল মাননীয় বিচারপতি। তিনি ‘টেকনিক্যাল কারণে’ হাইকোর্টের রায় গ্রহণ না করে নিম্ন আদালত থেকে উক্ত মামলা শুরু করার অভিমত ব্যক্ত করেন। ফলে প্রকৃতপক্ষে কর্তৃপক্ষের বিজয় হিসেবেই সেই বক্তব্য বা রায় চিহ্নিত হলো। ঢাকার পত্রিকাগুলো সমস্ত ঘটনাই বিশ্বস্ততার সঙ্গে প্রকাশ করে চলছিল। ড. আবু মাহমুদ সঠিক নাম উল্লেখ করে থানায় একটি মামলা দায়ের করেছিলেন। আইনানুগভাবে ডায়েরিতে উল্লিখিত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা তখন পুলিশের কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। কোনো কোনো পত্রিকায় কেন আক্রমণকারীদের গ্রেপ্তার করার ব্যাপারে বিলম্ব করা হচ্ছিল, সে সম্পর্কেও মন্তব্য বের হয়। কিন্তু পুলিশ সমগ্র ঘটনাটি সম্পর্কে কোনো ভূমিকা অবলম্বন করতে সাহস পাচ্ছিল না। দুষ্কৃতকারীদের সন্ধান সম্ভব হয়ে উঠছে না বলেই তারা পত্রিকার রিপোর্টারদের কাছে নিয়মিত বলে যাচ্ছেন। অপরদিকে ড. মাহমুদের আক্রমণকারী বলে চিহ্নিত ব্যক্তিরা শহরের বুকে ‘গুলিস্তান’ রেস্টুরেন্টে সন্ধ্যায় পানাহার করে এবং সবার চোখের সম্মুখেই একটি বিশেষ জিপ নিয়ে সর্বত্র ঘুরে বেড়ায়। রাজনৈতিক পার্টিগুলো এই পরিস্থিতিতে এগিয়ে আসে। পুলিশে মামলা করার চৌদ্দ দিন পর আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান তোপখানা রোডে (বর্তমান মর্নিং পোস্ট পত্রিকার অফিস) একটি জরুরি সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেন। পূর্ণকক্ষ এই সংবাদ সম্মেলনে শহীদুল হক (পরবর্তীকালে বাংলাদেশ টাইমস পত্রিকার সম্পাদক এবং বর্তমানে দিল্লিতে কূটনৈতিক পদে নিযুক্ত) থেকে শুরু করে অধিকাংশ সিনিয়র রিপোর্টার উপস্থিত ছিলেন। শেখ সাহেব জোরের সঙ্গে বলেন যে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বর্তমানে এমন এক অবস্থায় নিক্ষিপ্ত হয়েছে যে, শাসন কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত দুষ্কৃতকারীদের আশ্রয় দিয়ে পুলিশের হাত থেকে রক্ষা করছেন। ড. মাহমুদের ওপর আক্রমণ ও পরবর্তী ঘটনা তারই জ¦লন্ত দৃষ্টান্ত। তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করেন যে, দুষ্কৃতকারীদের লাট ভবনে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে, যাতে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করতে সাহস না পায়। এ সমস্ত সমাজদ্রোহী ব্যক্তি প্রকাশ্য দিবালোকে রাজধানীর বুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সমগ্র পরিস্থিতির জন্য সরাসরি সরকারকে দায়ী করে তিনি ইঙ্গিত করেন, প্রতাপশালী গভর্নর মোনায়েম খাঁ-ই

দুষ্কৃতকারীদের আশ্রয় ও প্রশ্রয়দাতা। এই গুরুতর অভিযোগ নিয়ে রিপোর্টাররাই প্রথমে বিপাকে পড়লেন। সবকিছু জানা থাকা সত্ত্বেও তারা এত দিন সরকারি হুমকির মুখে কিছুই প্রকাশ করতে পারেননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক পার্টিপ্রধান সংবাদ সম্মেলনে গভর্নরের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করে দুষ্কৃতকারীদের গ্রেপ্তার না করার রহস্য যখন প্রকাশ করলেন, তখন সাংবাদিকরা যেন গভীর সমুদ্র ও হাঙ্গরের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছেন। একদিকে সরকারি খড়গ, অপরদিকে সত্য প্রকাশের চাপ। শেখ মুজিব দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন : আপনারা আমার দায়িত্বে ও বরাতে লিখে নিন লাটভবনে ড. মাহমুদকে আক্রমণকারী ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। তিনি দু-তিনবার উল্লেখ করে কথাগুলো লিখে নিতে বললেন।

রাতের বেলা ঢাকার সমস্ত দৈনিক পত্রিকার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো অলিখিতভাবে টেলিফোনে ও মৌখিক। এখনো এই জাতীয় অব্যাহত নিষেধাজ্ঞা বা সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে সাংবাদিক মহল, সাংবাদিক ইউনিয়ন ও সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষ প্রতিবাদ করে চলছেন। আজাদ পত্রিকা সে সময় সরকারবিরোধী বা বিরোধীদলীয় ভূমিকা অবলম্বন করছিল। গভর্নর মোনায়েম খাঁ পত্রিকাটির সমস্ত বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিয়েছিলেন এবং পত্রিকার কর্তৃপক্ষ গভর্নরের কোনো চিত্র দীর্ঘ প্রায় ছ’বছর প্রকাশ করেননি। আমি আজাদ-এর প্রতিনিধি হিসেবে ওই সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলাম। তখন রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে ও পত্রিকার তৎকালীন ভূমিকার দৃষ্টিকোণ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো যে, শেখ মুজিবের অভিযোগপূর্ণ বক্তব্য প্রকাশ করা অযৌক্তিক হবে না। কর্তৃপক্ষ বা ম্যানেজিং ডিরেক্টর কামরুল আনাম খাঁ এই সিদ্ধান্ত সমর্থনই শুধু করেননি, ফলাও করে প্রকাশের পক্ষে মত দেন। আজাদ-এর প্রথম পৃষ্ঠায় দু’কলামের শিরোনামে সংবাদটি ছাপা হয় ড. মাহমুদকে প্রহারকারী ছাত্ররা লাটভবনে আশ্রয় নিয়েছে  শেখ মুজিব। পরদিন সকাল এগারোটার দিকে আমাদের আশঙ্কা সত্য বলে প্রমাণিত হলো সচিবালয় থেকে ফোন এলো। ফোনটা কবি-বন্ধু ওবায়দুল্লাহ খানের (বর্তমানে কৃষিমন্ত্রী)। তিনি তখন প্রাদেশিক সরকারের বয়ঃকনিষ্ঠ সচিব এবং তথ্য দপ্তরের দায়িত্বে নিয়োজিত। এই দপ্তরের দায়িত্ব নেওয়ার পর তাকে নিজস্ব উদ্যোগে কোনো দিনই সংবাদ প্রকাশ বা প্রকাশ না করার জন্য গায়েবি নির্দেশ জারি করতে দেখিনি। তিনি বললেন : কী ছেপেছেন! কিছুক্ষণের মধ্যেই সরকারি হুকুমনামা এসে হাজির। সে সময়ে সরকারবিরোধী পত্রিকা আজাদ-এর যেন ফাঁসির হুকুম হয়েছে- বিশ হাজার টাকা জামানত তলব। কোনো বিকল্প দেওয়া হয়নি; টাকা রাজকোষে জমা দিতে হবে, নইলে কাগজ বন্ধের হুমকি! মোনায়েম খাঁর সরকার ভেবেছিল, এবার আজাদকে কাবু করা যাবে। কিন্তু আজাদ কর্তৃপক্ষ দুটো সিদ্ধান্ত নিলেন। হাইকোর্টে সরকারের এই সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধকারী হুকুম বা হুমকি চ্যালেঞ্জ করা এবং সেদিনই বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের মাধ্যমে বাকস্বাধীনতা হরণের সরকারি অপচেষ্টার ফলাও প্রচার করা। সমস্যা দাঁড়াল, সংবাদ সম্মেলনের এই গুরুতর বক্তব্য শেখ মুজিবুর রহমান যদি অস্বীকার করে বসেন? কারণ, একমাত্র আজাদই এই সংবাদ প্রকাশ করেছিল। আর সব পত্রিকা সরকারের চাপে সেই বিশেষ অভিযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশটুকু বাদ দিয়ে গেছে। শেখ সাহেবকে ফোন করে তার বাসায় গেলাম। তিনি সরকারি হুকুমনামার কথা শুনেই রেগে উঠলেন এবং মেয়ের খাতা থেকে নেওয়া একখন্ড কাগজে লিখে দিলেন : আমার সংবাদ সম্মেলনের যে বক্তব্য বা সরকার এই বক্তব্যের চ্যালেঞ্জ করতে চাইলে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতে পারেন পত্রিকা বা রিপোর্টারের বিরুদ্ধে নয়। বিকেলের মধ্যে আমাদের বিশেষ সংখ্যায় কলামব্যাপী ডবল হেডিং-এ খবর বের হলো ড. লাটভবনে আশ্রয় নিয়েছে এই হেডিং-এর জন্য কাঠের সুবৃহৎ টাইপে ড. মাহমুদকে প্রহারকারী ছাত্ররা ‘আজাদের বিশ হাজার টাকা জামানত তলব।’

সরকার কখনোই ভাবতে পারেনি যে, আজাদ বিশ হাজার টাকা জামানত তলবের হুকুমনামার এমন ভয়াবহ সদ্ব্যবহার করবে। পরের দিন সকালে নিয়মিত সংখ্যায়ও ওই হুকুমনামার ফলাও প্রচার করা হলো। সরকারি নির্দেশকে প্রচারের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে দেখে জবরদস্ত কর্তৃপক্ষ স্বাভাবিকভাবেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। সংবাদ সম্মেলন সংক্রান্ত শেখ মুজিবের সেই লিখিত বক্তব্য সম্বল করে আজাদকে সরকারের বিরুদ্ধে মামলার লড়াই করতে হয়। শেষ পর্যন্ত সরকার পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশে নীরব ভূমিকা পালন করে। তবে এই ঘটনা থেকে সরকার একটি নতুন পন্থা বের করে, যাতে ভবিষ্যতে এই জাতীয় কণ্ঠরোধকারী সরকারি নির্দেশ যেন কোনো পত্রিকা প্রকাশ করতে না পারে। পরবর্তীকালের এ ধরনের নির্দেশের শেষে লিখে দেওয়ার রেওয়াজ হলো, ‘সরকারি নির্দেশ বা হুকুমনামার অত্র আদেশও প্রকাশ করা যাবে না।’ এযাবৎ জারিকৃত সরকারি অনুরূপ নির্দেশের এখনো কোনো কর্তৃপক্ষ বা সংবাদপত্র চ্যালেঞ্জ করেননি। রাজনৈতিক নেতারা এত সূক্ষ্ম ব্যাপারে হাত দিতে অনিচ্ছুক বলে মনে হয় ক্ষমতায় তো কোনো না কোনো দিন তাদেরও আসতে হতে পারে, হয়তো সে কারণে। (ঈষৎ সংক্ষেপিত)