ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার সংকুচিত, বেড়েছে ক্ষুধা

বিশ্বব্যাপীই দেখা যাচ্ছে ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার সুযোগটা সংকুচিত হয়ে আসছে। করোনার আক্রমণ ধর্মের উপযোগিতাকে ক্ষুন্ন করে দিয়েছে। মহামারীর হাত থেকে ত্রাণ লাভের জন্য মানুষ উপাসনালয়ে গিয়ে যে যৌথভাবে প্রার্থনা করবে, এমনটা ঘটেনি। উপাসনালয়গুলোর দরজাতেই বরং তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল, পাছে লোকসমাগমে সংক্রমণ বাড়ে। বার্ষিক ধর্মীয় সমাবেশ অনেক ক্ষেত্রেই বাদ পড়েছে, যেখানে বাদ পড়েনি সেখানে তা সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণ হয়েছে। করোনার এই আক্রমণ মানুষের জীবন বাঁচানোই প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, অধিকাংশ মানুষের জন্যই এসেছিল জীবিকার কঠিন সমস্যা; এ দুটির পরে স্থান অন্যান্য বিষয়ের, যাদের মধ্যে ধর্ম একটি।

পুঁজিবাদী দেশগুলোতে ধর্মের মূল্য ইতিমধ্যে কমেছে। সেখানে বরং বর্ণবাদ দেখা দিয়েছে। আগেও ছিল, এখন বেড়েছে। লোকে অস্থিরতা ও অসচ্ছলতার মধ্যে আছে; তারা শত্রু খোঁজে এবং গাত্র বর্ণের ভিত্তিতে শত্রুকে চিহ্নিত করে ফেলে। খেলার মাঠেও সেটা আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। যেমন ফুটবলে ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপের খেলাতে। জার্মানি ও ইংল্যান্ডের ফাইনাল খেলা চলছিল, খেলাতে কেউ গোল করতে পারেনি, সে জন্য দু’দলকেই তিনটি করে পেনাল্টি শটের সুযোগ দেওয়া হয়। তাতেও ইংল্যান্ড কোনো গোল করতে পারল না, ফলে এক গোলে জয়ী হয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ হস্তগত করে নিল জার্মানি। ইংল্যান্ডের দলে অশ্বেতাঙ্গ খেলোয়াড়রা ছিলেন; ঘটনাক্রমে যে তিনজনকে পেনাল্টি শট করতে দেওয়া হয়েছিল তারা সবাই ছিলেন অশ্বেতাঙ্গ। শ্বেতাঙ্গ হলেও তারা নিন্দার পাত্র হতেন, কিন্তু অশ্বেতাঙ্গ হওয়ার দরুন তাদের ওপর যে পরিমাণ ধিক্কার ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ কটূক্তি ইত্যাদির ইস্টক বর্ষিত হয়েছিল তা ছিল সব হিসাবের বাইরে। ব্যাখ্যা ওই একটাই, ভেতরে বর্ণবিদ্বেষ। জার্মানিতে তো এই বিদ্বেষ এক সময়ে মনুষ্যত্ববিনাশী হিংস্র বর্বরতার রূপ নিয়েছিল; এখনো যে তা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এমন নয়, থেকে থেকেই মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, বিশেষ করে বেকার যুবকদের মধ্যে।

জার্মান প্রবাসী আমাদের এক বন্ধু জানালেন সেখানে বর্ণবাদের চেয়েও অধিক দৃশ্যমান এখন ধর্মে অনীহা। গির্জায় প্রবীণরা তবু কিছু কিছু যান, কিন্তু তরুণদের পছন্দ বরং গির্জার সামনের মাঠে দলবেঁধে ফুটবল খেলা। রক্ষণাবেক্ষণের খরচ ওঠে না দেখে কোথাও কোথাও গির্জা বিক্রি হয়ে গেছে ও যাচ্ছে এবং ব্যবহৃত হচ্ছে কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে। ইতিহাসের গতি ওই মুখোই।

কিন্তু তবু ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার ফ্যাসিবাদী চেষ্টা তো চলবেই। ধর্মীয় উত্তেজনায় মানুষকে বিভ্রান্ত করার মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলে রাখার জন্য যে তৎপরতা তার অবসান অত সহজে ঘটবে না। ইসরায়েল তো সেটা করে চলেছেই, ভারতে রামরাজ্য-ওয়ালারাও তা করছে এবং করতে থাকবে। মানুষের চেয়ে গাভীর মূল্য তারা অধিক ধার্য করেছে। চারশ বছরের পুরনো মসজিদ ভেঙে ফেলে ভুয়া ও অনৈতিহাসিক তথ্য প্রচার করে তার ওপরে রামমন্দির বানিয়েছে। ‘আমরাই সবার আগে’, এই তত্ত্ব দাঁড় করাতে থাকবে। বলবে আধুনিক সার্জারি উদ্ভাবনের শত শত বছর আগে ভারতীয়রা এমন অত্যাশ্চর্য বিদ্যা অর্জন করে ফেলেছিল, যার সাহায্যে তারা হাতির মাথা মানুষের দেহে বসিয়ে দিতে পারত। প্রমাণ? কেন সিদ্ধিদাতা দেবতা গণেশ! ভারতীয়রা উড়োজাহাজ আবিষ্কার অনেক আগেই করেছিল। প্রমাণ হচ্ছে আকাশ রথ। পরাধীন ভারতে স্বাধীনতার জন্য মোপলা বিদ্রোহের স্থান একটি ইতিহাস-স্বীকৃত সত্য। মোদিপন্থিরা বলছে ওদের নাম মুছে ফেলতে হবে, কারণ ওরা ছিল মুসলমান, তার মানে সাম্প্রদায়িক। তালেবান ও রাম-রাজ্যওয়ালারা পরস্পরের শত্রুপক্ষ; কিন্তু মিল আছে মূল জায়গাতে, সেটা ধর্মরাজ্য কায়েমের অভীপ্সা। আইএস-ওয়ালারাও একই পথের পথিক। আফগানিস্তানে আইএস ঢোকার চেষ্টা করবে; ইরাক-সিরিয়া থেকে তারা বিতাড়িত, তাদের নতুন ঘাঁটি চাই। ইতিমধ্যে তারা যে কাজ শুরুও করেনি, বলি কীভাবে!

কিন্তু ধর্মরাজ্য কায়েম করা ও তাকে রক্ষা করাটা আজকের পৃথিবীতে আর সম্ভব নয়। করতে গেলে তা কেবল অবাস্তব ও ভয়ংকরই নয়, হাস্যকরও হয়ে দাঁড়াবে। ইসরায়েল ধর্মরাজ্য এখন এক নম্বর সন্ত্রাসী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তার প্রধানমন্ত্রী যখন দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হন এখন তো বোঝাই যায় সেখানকার কায়কারবার কোন ধরনের। সৌদি আরব পুরনো পথ ছেড়ে এখন আধুনিক হওয়ার চেষ্টা করছে। মেয়েদের গাড়ি চালাতে এবং খেলার মাঠে দর্শক হিসেবে উপস্থিত হতে দিচ্ছে। এমনকি হজের আগে আগে নাইটক্লাবও খুলে দিয়েছে, একযুগ আগে এসব অকল্পনীয় ছিল। আর ধর্মচর্চা পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যে সর্বত্র অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারছেন তাও নয়। রোমান ক্যাথলিক ধর্মব্যবস্থাপনায় পোপের পরেই স্থান যে কার্ডিনালদের সম্প্রতি তাদেরই একজন অভিযুক্ত হয়েছেন দুর্নীতির দায়ে। ওদিকে যাজকদের বিরুদ্ধে শিশুদের ওপর যৌন অত্যাচার চালানোর অভিযোগ তো বেশ পুরনোই। হিন্দু পুরোহিতরাও কম যাচ্ছেন না। দিল্লির উপকণ্ঠে শ্মশানের কাছে একজন পুরোহিত তার তিনজন সহযোগীর সঙ্গে একযোগে নয় বছর বয়স্ক একটি বালিকাকে ধর্ষণ করেই নির্বৃত্ত হননি তাকে পুড়িয়েও মেরেছেন। সাক্ষী রাখবেন না। ঠিক ওই সময়েই ঢাকার উপকণ্ঠে দক্ষিণখানের মসজিদের এক ইমাম যা করেছেন তাও কম রোমহর্ষ নয়। ইনি কোরান শিক্ষা দেওয়ার জন্য এক বাড়িতে যেতেন। নিজে বিবাহিত, সন্তানাদি রয়েছে, কিন্তু সুযোগ হাতছাড়া করেননি। বাড়ির গৃহিণীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়েছেন এবং পথের কাঁটা স্বামীটিকে মসজিদে ডেকে এনে প্রথমে ঘুমের ওষুধ মেশানো পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করেছেন, তারপর ধারালো অস্ত্রের সাহায্যে কেটে ছয় টুকরা করে নর্দমায় ফেলে দিয়েছেন। ধরা পড়েছেন, কিন্তু ধরা পড়ার ভয়ে মোটেই কম্পিত ছিলেন না।

গত বিশ বছরে বাংলাদেশের পরিবেশ ও পরিস্থিতিও অনেকটা বদলে গেছে। মৌলবাদীদের সাংগঠনিক শক্তি মোটামুটি ভেঙে পড়েছে। সর্বোপরি এরা যে জনসমর্থন পাবে এমন সম্ভাবনা নেই। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মমনস্ক এটা ঠিক, কিন্তু তারা ধর্ম ও রাজনীতিকে একসঙ্গে মেশাতে চায় না। সে জন্য দেখা যায় ধর্মভিত্তিক দলগুলো নির্বাচনে সুবিধা করতে পারে না। জামায়াতে ইসলামী একাত্তরে যে ‘বীরত্ব’টা দেখিয়েছে তার পেছনে ছিল হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর সশস্ত্র সমর্থন। জামায়াতিরা পরে রাজনীতিতে যে জায়গা করে নিতে পেরেছে তাও বড় বুর্জোয়া রাজনৈতিক দল দুটির পিছু পিছু ফেউয়ের মতো ঘোরাঘুরি করে। জঙ্গিদের জন্য সংগ্রহ-ক্ষেত্র ছিল মাদ্রাসায় শিক্ষিতরা। মাদ্রাসার ছাত্র ও মাদ্রাসায় শিক্ষিতদের বড় অংশটিকে এখন নিয়ে নিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। প্রথম দিকে হেফাজতের নেতাদের চোখ খেলাফত প্রতিষ্ঠার চেয়ে জাগতিক সুবিধা আদায়ের প্রতিই অধিক নিবিষ্ট ছিল বলে মনে হয়। ভেতরে অবশ্য কট্টরপন্থিরাও ছিল, যাদের কারণে ১৩ দফা দাবিনামা দাঁড় করানো হয়েছিল, যাতে শরিয়া আইন ও ধর্মদ্রোহিতা আইন ইত্যাদি প্রবর্তনের দাবি ছিল। কিন্তু নেতৃত্ব ছিল আহমদ শফীর কাছে, যিনি কিছুটা আপসপন্থি ছিলেন। আপসপন্থায় সুফলও তাদের জন্য এসেছিল। তার মৃত্যুর পর জুনায়েদ বাবুনগরী নেতৃত্বে আসেন; তিনি কট্টরপন্থি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তিনিও মৃত্যুবরণ করেছেন এবং নেতৃত্ব নিয়ে দলের ভেতর বিরোধ দেখা দিয়েছে। তরুণ নেতা মামুনুল হককে মনে হচ্ছিল খেলাফত প্রতিষ্ঠায় ভালো রকমেরই অঙ্গীকার রাখেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি বেশ ভোগলিপ্সুও ছিলেন, যে জন্য দাঁড়াতে পারলেন না। তিনি কারাগারে চলে গেলেন। হেফাজতের পক্ষে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিকশিত হওয়া সম্ভব হলেও, শক্তিশালী হওয়া কঠিন হবে বলেই আমাদের ধারণা।

তবে পৃথিবীব্যাপীই অসুখ চলছে। অসুখটা পুরনো, কিন্তু ক্রমে তা ভয়ংকর হয়ে উঠছে। তপ্ত হচ্ছে ধরিত্রী। জানা যাচ্ছে যখন থেকে তাপমাত্রার হিসাব রাখা হয় তার মধ্যে গত বছর জুলাই মাস ছিল সবচেয়ে তপ্ত মাস। দাবানল আগেও ছিল; এ বছর দাবানলের ভয়াবহতা বেড়েছে। নেভানো কঠিন হচ্ছে। কোথাও কোথাও উড়োজাহাজ থেকে পানি ছিটিয়েও সুবিধা হয়নি। যেসব জায়গায় বন্যা আগে তেমন হতো না সেখানেও এবার বন্যা হয়েছে। জার্মানিতে এমন বন্যা হয়েছে যেমনটা সেই দেশবাসী কখনো দেখেনি। চীন ও আমেরিকা এখন ভীষণভাবে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী; ক্ষিপ্ত বাণিজ্য-যুদ্ধ চলছে, কিন্তু দুদেশেই। করোনা তো বটেই, বন্যার ব্যাপারেও দেখা গেল সমান ব্যথায় ব্যথিত। চীনে বড় রকমের বন্যা হয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে বন্যা হয়েছে আমেরিকাতেও। দুদেশেই মারা গেছে মানুষ এবং হাজার হাজার মানুষকে সরিয়ে নিতে হয়েছে নিরাপদ স্থানে। অতিবৃষ্টিতে নিউ ইয়র্ক শহরে এমন এক আকস্মিক প্লাবন হয়েছে যেটা নিউ ইয়র্কবাসীর অভিজ্ঞতার মধ্যে ছিল না। মৃত্যু ঘটেছে ২৫ জনের। আহত অনেকে। পুরো শহর লন্ডভন্ড। অর্থনৈতিক ক্ষতি বিপুল। টুইন টাওয়ারে আক্রমণ করেছিল তথাকথিত জঙ্গিরা; এখন আক্রমণ আসছে উত্ত্যক্ত প্রকৃতির কাছ থেকে। তাকে শাস্তি দিতে গেলে সে শাস্তি নিজেদের কাছে ফিরে আসবে। আরও ভয়ংকর আকারে।

জাতিসংঘের একটি সংস্থা, ইন্টারন্যাশনাল প্যানেল ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ তাদের সর্বশেষ রিপোর্ট দিয়েছে জুলাই মাসে; তাতে তারা সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে যে, কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে না আনলে শিগগিরই এই গ্রহ এমন এক অবস্থার মুখে পড়বে যেখান থেকে ফিরে আসার কোনো পথ খোলা থাকবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষ এক দেশ থেকে আরেক দেশে যেতে চাইবে। কিন্তু কোথায় যাবে? গোটা বিশ্বই তো বিপদগ্রস্ত। কেবল যে জলবায়ু পরিবর্তন তা তো নয়, বাড়ছে ক্ষুধাও। জরিপ বলছে, প্রতি মিনিটে বিশ্বে এখন ১১ জন মারা যাচ্ছে ক্ষুধায়, যেখানে করোনায় প্রাণ দিচ্ছে ৭ জন। করোনা ভয়াবহ, কিন্তু ক্ষুধা মহামারীর চেয়েও ভয়ংকর।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়