এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ির সুবিধা বাতিল করা গেল না

প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্যদের (এমপি) শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা বাতিলের প্রস্তাব করেছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। তবে শেষ পর্যন্ত তা বহাল রাখতে পারেননি। এমপিদের চাপে শুল্কমুক্ত গাড়ির সুবিধা বহাল রেখেই জাতীয় সংসদে অর্থবিল-২০২৪ পাস হয়েছে। এ ছাড়া সম্পদশালীদের কোম্পানির কাজে ব্যবহৃত গাড়ির পরিবেশ সারচার্জ মওকুফ করা হয়েছে।

গতকাল শনিবার স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী অর্থবিল পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। আজ রবিবার সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট পাস হবে। বিলের বিরোধিতা করেন বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্র সদস্যরা। তারা সরকারের সমালোচনার পাশাপাশি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

গত ৬ জুন বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বিদেশ থেকে গাড়ি আমদানি করা হলে এর ওপর আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ, মূসক ১৫, আরডি ৩, আগাম কর ৫ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ৪০০ থেকে ৫০০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ আছে। এ অবস্থায় সংসদ সদস্যদের শুল্ক-কর অব্যাহতির সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার ক্ষেত্রে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনের অংশ হিসেবে কর অব্যাহতি সুবিধা কিছুটা কমিয়ে আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করে অন্যান্য সব শুল্ক-কর অব্যাহতি সুবিধা বহাল রাখা যেতে পারে।’

তবে এরপর একাধিক সংসদ সদস্য এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে সংসদে বক্তব্য দিয়েছেন। গতকাল বিলটি পাসের আগে বিলের ওপর সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুযোগ বহাল রাখা হয়েছে। এ ছাড়া মাত্র ১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগও রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের গাড়িকে বিলাসবহুল পণ্য হিসেবে গণ্য করে এর ওপর সিসিভেদে সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি আরোপ করা হয়। অন্যান্য ডিউটি, ট্যাক্সসহ এটি কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রায় ৮০০ শতাংশ পর্যন্ত হয়, যা সাধারণ গাড়ি ব্যবহারকারীদের পরিশোধ করতে হয়। অন্যদিকে সংসদ সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে এটি আমদানিতে কোনো ধরনের শুল্ক-কর দিতে হচ্ছে না। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনেক সংসদ সদস্য নতুন নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। তাদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এমপিদের গাড়ি আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়েছে।

তবে পুঁজিবাজার পরিস্থিতি খারাপ হলেও মূলধনি মুনাফায় করারোপের প্রস্তাব বহাল রাখা হয়েছে। খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসি ও পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডাররা মূলধনি মুনাফায় করারোপের বিরোধিতা করলেও শেষ পর্যন্ত তা বহাল রাখা হয়েছে। অবশ্য পুঁজিবাজারে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত মূলধনি মুনাফা করমুক্ত থাকছে। তবে মূলধনি মুনাফা ৫০ লাখ টাকা অতিক্রম করলে কর দিতে হবে। অতিরিক্ত মুনাফা ব্যক্তির আয়করের সঙ্গে যুক্ত হবে।

যদিও অর্থনৈতিক অঞ্চল, হাইটেক পার্কে মূলধনি যন্ত্র আমদানি শুল্কমুক্তই থাকছে। অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছরের বাজেটে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে ১ শতাংশ শুল্কারোপের প্রস্তাব করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। পরে ব্যবসায়ীরা তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তারা বলছিলেন, কর অবকাশ সুবিধার কথা জেনেই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ এসেছে। এই ১ শতাংশ শুল্কারোপ সেই বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা। বিরোধী দলগুলোও এই শুল্ক প্রস্তাবের সমালোচনা করে আসছিল। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দাবির মুখে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে মূলধনি যন্ত্রপাতির ওপর ১ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব থেকে সরে এসেছে সরকার।

রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর চেষ্টার অংশ হিসেবে সরকার দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে, যেগুলোয় বিনিয়োগে কর অবকাশ সুবিধার কথা জানিয়েছিল সরকার। এদিকে গত ২৯ মে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এনবিআর বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগকারীদের কর অবকাশসহ ৮টি কর সুবিধা প্রত্যাহার করে নেয়। ১০ বছর মেয়াদি কর অবকাশ সুবিধা তুলে নেওয়ার ফলে শিল্পভেদে কোম্পানিগুলোর আয়ের ওপর করহার ২০-২৭.৫ শতাংশ বা এরও বেশি প্রযোজ্য হওয়ার কথা। তবে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের চাপে বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলের কর অবকাশ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে সরকার। অর্থাৎ বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগকারীরা আগের মতোই কর অবকাশ সুবিধা পাবেন।

এ ছাড়া অর্থবিলে কালো টাকা সাদা করার বিশেষ সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে। ১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা এবং বর্গমিটারপ্রতি নির্দিষ্ট হারে কর দিয়ে প্লট-ফ্ল্যাট রিটার্নে প্রদর্শনের সুযোগ থাকছে।

গতকাল অর্থবিলের ওপর জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও হামিদুল হক খন্দকার এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য পংকজ নাথ। তবে তাদের সেই প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়। বিলের ওপর সরকারদলীয় সংসদ সদস্য খান আহমেদ শুভ ও আবুল কালাম মো. আহসানুল হক চৌধুরী সংশোধনী আনেন এবং তা গৃহীত হয়।

বিলের ওপর জনমত বাছাইয়ের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনাকালে জাতীয় পার্টির হামিদুল হক খন্দকার বলেন, বিলে সরকারের দ্বিমুখী অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে। একদিকে বলছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। অন্যদিকে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ প্রদান। যেখানে বৈধ আয়ের জন্য ৩০ শতাংশ কর দিতে হয়। সেখানে অবৈধ আয়ের জন্য ১৫ শতাংশ কর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অথচ এই সুযোগ নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী কালো টাকা সাদা করেছেন। সরকারকে এই অনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রত্যাহর করতে হবে।

তামাকজাত পণ্যের ওপর সারচার্জ বাড়ানোর দাবি জানান স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য পংকজ নাথ। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে তামাকমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন। অথচ এখনো তামাকের কারণে দেশে প্রতিদিন ৪৪১ জন মারা যায়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সারচার্জ বাড়াতে হবে। তিনি যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধার্থে বরিশাল-ভোলা-নোয়াখালী সেতু নির্মাণের দাবি জানান।

সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, দ্রব্যমূল্যের দাম কমাতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকসুদের হার বাজারভিত্তিক ও নীতি সুদহার প্রবর্তন করা হয়েছে। ডলারের দাম স্বাভাবিক রাখতে ক্রলিংপেগ পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। নতুন অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে নিয়ে আসা হবে। তিনি বলেন, এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সব সক্ষমতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত ১১টি পদক্ষেপ পূরণে বাজেটে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলা ও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ হলে ২০৪১ সালের মধ্যে মাথাপিছু আয় হবে ১২ হাজার ৫০০ ডলার। দারিদ্র্য শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। খাদ্য নিরাপত্তায় টিসিবির মাধ্যমে কোটি পরিবারকে খাদ্য সহায়তা, ওএমস কার্যক্রম চালু রাখা ও সামাজিক সুরক্ষার আওতায় খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে।

সংসদে পাস হওয়া বিলে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে শুরু অর্থবছরের জন্য আর্থিক বিধান, বিদ্যমান কতিপয় আইন সংশোধনীসহ কর প্রস্তাবসমূহ অনুমোদন করা হয়েছে। এ ছাড়া রিটার্নে আগের বছরের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি আয় দেখানো হলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ট্যাক্স ফাইল অডিটে ফেলবে না। সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আওতায় পেনশন বাবদ আয়কে করের আওতার বাইরে রাখার বিধান যুক্ত করা হয়েছে আয়কর আইনে। হয়রানি কমিয়ে আনতে অডিটের শর্ত শিথিল করা হবে। এজন্য অর্থবিলের মাধ্যমে আয়কর আইন সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী ও অর্থ প্রতিমন্ত্রী। নতুন নিয়মে আগের বছরের চেয়ে রিটার্নে ১৫ শতাংশ আয় বেশি দেখালে ট্যাক্স ফাইল অডিটে ফেলা হবে না। সংশোধিত রিটার্নের ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য থাকবে। শুধু ব্যক্তি শ্রেণির করদাতারা এ সুযোগ পাবেন। প্রস্তাবিত বাজেটে স্থাবর সম্পত্তি যেমন জমি-প্লট-ফ্ল্যাট দান বা হেবা দলিলের ওপর উৎসে কর আরোপ করা হয়েছিল বিধায় সাধারণ বেচাকেনার মতো হেবা দলিলে সম্পত্তি হস্তান্তরের সময় এলাকা, জমির শ্রেণি অনুযায়ী হস্তান্তরকারীকে নির্দিষ্ট হারে আয়কর দিতে হতো। সমালোচনার মুখে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে সরকার। অর্থাৎ আগের নিয়মেই উৎসে কর পরিশোধ ছাড়াই আপন ভাইবোন, পিতা-মাতা, ছেলেমেয়ে, স্বামী-স্ত্রী, দাদা-দাদি, নানা-নানি ও নাতি-নাতনির সম্পর্কের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তরে হেবা দলিল করা যাবে। বর্তমানে হেবা দলিলে ২ হাজার ৫১০ টাকা কর দিতে হয়। কোম্পানির মতো তহবিল ও ট্রাস্টের মূলধনি আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ গেইন ট্যাক্স বসানো হচ্ছে।