কখন হঠাৎই আমি তানভীর মোকাম্মেলের প্রামাণ্যচিত্রের এক চরিত্র হয়ে গেছি তা বুঝতে বুঝতে ইমিগ্রেশন ও আনুষঙ্গিক কাজকম্ম সেরে বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে গেছি। দেশভাগের পরে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের এপারে চলে আসা জীবন নিয়ে ছবির শুরুতেই আমরা দেখি, বেশ কয়েকজন মধ্যবয়সের মহিলা ট্রেনে করে চলেছেন, নিজের নিজের ফেলে আসা ভিটের খোঁজে।
একই কারণে আমিও চলেছি এবার। ফলে কখনো কখনো মনে হচ্ছে, আমিও যেন ছবির এক চরিত্র। যার চোখ দিয়ে অতীতের স্মৃতি রোমন্থন, যা সততই সুখের নয়। তবে একটু ভুল আগেই শুধরে দেওয়া ভালো, আমি না, নিজেদের ভিটে দেখতে একযুগের বেশি সময় পরে বাংলাদেশে যাওয়া আমার দুই বন্ধু, অভিজিত মজুমদার ও জ্যোতির্ময় বকশীর। একজন আমার স্কুলের। অপরজন ভ্রাতৃসম। বহুবার বাংলাদেশে গেছি। হয়তো আবারও যাব। কিন্তু এবার গাইড হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা কখনো ভুলব না।
ষাটোর্ধ্ব অভিজিত বাংলাদেশে ঢুকতে না ঢুকতেই কেমন গম্ভীর হয়ে গেল। এমনিতেই ও চুপচাপ। জীবনে বিরাট এক বিপর্যয়ের পর আরও বিষন্ন হয়ে গেছে। তবে এবার যে গাম্ভীর্য তা বোধহয় ফেলে আসা ভিটে দেখতে যাওয়ার টেনশনে। গাড়ি চলেছে মসৃণ রাস্তা দিয়ে। সঙ্গী, তরুণ সাংবাদিক লিটন। ও নেমে যাবে দর্শনা সদরে। আমরা যাব সেখান থেকে আরও বেশ কয়েক কিলোমিটার দূরে কুষ্টিয়া শহরে। রাস্তায় অল্প জ্যাম। ঈদের হাটে কোরবানির গরু কেনাবেচা জোর কদমে চলছে। ফলে কখনো কখনো মেইন রাস্তা ছেড়ে সার্ভিস রোড ধরতে হচ্ছে। এখানেও জ্যাম। রাস্তার দুদিকে সোনাপট্টি। অধিকাংশ দোকান হিন্দুদের। অন্তত শীল, দত্ত, মালাকার বা দাশ পদবি দেখে তাই মনে হচ্ছে। বড় রাস্তায় পড়তে গাড়ির গতি বাড়ল। চারপাশে সবুজ আর সবুজ। অনেকে নাও মানতে পারেন, তবুও বলব, কবির কল্পনার বাংলা দেখতে হলে আপনাকে একবার অন্তত বাংলাদেশে যেতে হবে। অভিজিত বাইরের দিকে তাকিয়ে। আমি ফোনে যোগাযোগ করে চলেছি, অভিজিতের ভিটের খোঁজে চেনাজানা লোকজনকে। মিনিটে মিনিটে ফোন দিচ্ছে হাসান আলী। দেশ রূপান্তরের কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি।
শেষ পর্যন্ত কুষ্টিয়া পৌঁছে সরকারি এক চিনিকলের গেস্ট হাউজে থিতু হলাম। অভিজিৎ খুব একটা নিশ্চিত না ঠিক কোথায় ওর বাড়ি ছিল তা নিয়ে। শুধু বাবার স্কুলের নামটা ঠিকঠাক বলতে পেরেছে। কুমিরা। ও বলছে যে স্কুল ছিল খুলনায়। কিন্তু জানা গেল তা এখন সাতক্ষীরা। কুষ্টিয়া যাব, আর লালন মাজার দেখব না তা তো হয় না। ভবিষ্যতে কেউ কুষ্টিয়া গেলে, বলব, লালন মাজারে নিশ্চয়ই যাবেন। কিন্তু শহরে যে চমৎকার সব একাধিক মন্দির আছে তাও দেখতে ভুলবেন না। সারা বাংলাদেশে ঘুরে বেড়ালে, একটা বিষয় নিশ্চিত হবেন যে, ওপার নিয়ে এপারে অন্ধকারের যে ছবি আঁকা হয়, তা পুরোপুরি সত্য নয়।
অনেক কষ্টে মোটামুটি একটা ধারণা করা গেছে যে, অভিজিতের গ্রাম কোথায়। আমার খুলনার বন্ধু শুভ মারফত পেয়েছি রাজনকে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। সে অনেক খোঁজখবর নিয়ে জানিয়েছে, অভিজিতের সাবেক ভিটে তালা গ্রামের কাছে। তালা থেকেই একদা সাগরদাঁড়ি গ্রামে চলে গিয়ে পাকাপাকিভাবে থিতু হয়েছিলেন মধুসূদন দত্তের পরিবার। তালা একদা, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ঘাঁটি।
খড়ের গাদায় সুচ খোঁজার চেয়েও কঠিন মনে হচ্ছে অভিজিতের বাসা বের করা। দীর্ঘ পথ, কুষ্টিয়া হয়ে যশোর পার হচ্ছি। বিকেল হব হব। অভিজিতের মুখ থমথমে। উদ্বেগ হচ্ছে, এত দূর এসে যদি ভিটে না পাওয়া যায়। রাজন বলেছে, মারুফকে যোগাযোগ করতে। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা। এ জায়গা পাটকেলঘাটা। হাট বসেছে। অসম্ভব ভিড়। আগে যাব কুমিরা। স্কুল দেখতে। যেখানে সিনিয়র অভিজিত পড়তেন। বড় বিল্ডিং। ঈদের ছুটি পড়ে গেছে। ফলে বন্ধ। কিন্তু মারুফ আছে তো। নেতা বলে কথা। বলছি বটে নেতা, কিন্তু রোগা রোগা এক বাচ্চা ছেলে। ধরে আনতে বললে বেঁধে নিয়ে আসে, এমন মুখ করে দারোয়ানকে ধরে আনতে চলল।
অভিজিতের বুকে হাতুড়ি পেটার শব্দ। মারুফ জানিয়েছে যে, বসত বোধহয় বড় কাশীপুর গ্রামে। বাবার স্কুল পাওয়া গেছে। কিন্তু আসল তো ভিটের খোঁজ এখনো পাইনি। যেখান থেকে একদা পশ্চিমবঙ্গে পাড়ি দিয়েছিলেন মজুমদার পরিবার। তার পরের অধ্যায় ওয়ান ডে ক্রিকেটের চেয়েও রোমাঞ্চকর। অনেক কষ্টে মারুফ খুঁজে দিল কৈলাস মজুমদারের তৈরি করা বসত।
ফণীভূষণ মজুমদার ছিলেন অভিজিতের ঠাকুরদা। এখনো কাশীপুর গ্রামে তিনি বিপুল জনপ্রিয়। বিস্তর জমি জায়গা ফেলে তিনি দেশভাগের পর পরই চলে গেছিলেন ওপারে। এত এত বছর বাদে তার উত্তরপুরুষের ভিটে খোঁজার আনন্দে চোখে জল। মিডিয়ার এক প্রতিনিধি কোত্থেকে ঠিক চলে এসেছে ক্যামেরা নিয়ে। কত বছর বাদে যেন বন্ধুকে হাসতে দেখছি। বসতবাড়ি বলতে কিছু নেই। শুধু বিরাট বাগান রয়ে গেছে। তবে এ আখ্যানে কোনো দখলের গল্প নেই। যে জ্ঞাতিদের ফণী মজুমদার জমি দেখভাল করতে দিয়ে গেছিলেন, তাদের বংশধরদের হাতেই এখন ফেলে যাওয়া সম্পত্তি। অভিজিৎ যুদ্ধ জয়ের আনন্দে জ্ঞাতিদের সঙ্গে গল্পে মেতেছে। সন্ধ্যা গভীর হচ্ছে। অপরিচিত মহিলারাও মজুমদার পরিবারের নতুন প্রজন্মের কথা শুনে রাস্তায় নেমে এসেছেন। ভাবটা, যেতে নাহি দেব। কিন্তু যেতে তো হবে। পেছনে থাকল কিছু মায়া ও স্মৃতি।
অভিজিত কলকাতা চলে গেল। আমি আবার গাইডের ভূমিকায়। এবার জ্যোতির্ময়কে নিয়ে যাব তার শিকড়, বরিশালের গৌরনদীর কাছে বার্থী গ্রাম খুঁজতে। শেষ পর্যন্ত সেই গ্রামেও গেলাম। বকশী নিজের অতীতকে দেখতে দেখতে আবেগ বিহ্বল। বিশাল এক তালুকদারির অলিগলি চষছি। আমার নিজের শিকড়, তাও তো বরিশালেই। বানারীপাড়ার গাভা গ্রামে। তবে অতীতচারণা সবসময় ভালো নয়। অতীত অনেক গাল গল্পের জন্ম দেয়। যা ইতিহাসের পথ আগলে রাখে। দেশভাগ নিশ্চিত ইতিহাসের এক বিয়োগান্তক অধ্যায়। তবে তার অর্জনকেও স্বীকার করা দরকার। সে আলোচনা না হয় পরে কখনো বিস্তারে হবে।
লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক
sdastidar27@gmail.com