সাইবার উদাসীনতা

বিপুল জনঘনত্বের বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ক্রমেই বাড়ছে। সরকারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, দেশের আনাচে-কানাচে ইন্টারনেট ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে কৃতিত্ব নেয় এবং বাংলাদেশের সামনের দিকে এগিয়ে চলার পথে এই অর্জনকে গুরুত্বপূর্ণভাবে। কিন্তু, ইন্টারনেট ব্যবহারের পাশাপাশি বাড়ছে সাইবার অপরাধের হার। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা হুমকির মুখে পড়ছে। সামাজিক ও আর্থিকভাবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অথচ, সাইবার অপরাধের শিকার হওয়াদের অতি অল্পসংখ্যকই আইনি সুরক্ষা বা অপরাধের বিচার পান। সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের (সিক্যাফ) উদ্যোগে পরিচালিত এক জরিপে জানা গেছে, সাইবার অপরাধ বা হেনস্তার শিকারদের মধ্যে প্রতি ১০০ জনে মাত্র ১২ জন আইনি সহায়তা চান। বাকি ৮৮ শতাংশ ভুক্তভোগী কোনো আইনি পদক্ষেপে যান না। যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেন, তাদের ৮৭ দশমিক ৫০ শতাংশই আবার কোনো সুফল পান না। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, সাইবার অপরাধের শিকার হওয়াদের ২ শতাংশও আইনি প্রতিকার থেকে বঞ্চিত। এ ধরনের পরিসংখ্যান ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণার প্রতি বিরাট এক হুমকিস্বরূপ।

তরুণদের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার বেশি। তারাই সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি। সিক্যাফের প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ৭৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ সাইবার অপরাধের শিকার হয়েছেন ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সের মানুষ। আর ১৮ বছরের কম অর্থাৎ শিশুদের আক্রান্তের হার ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ। বাকি ৭ শতাংশ ভুক্তভোগী ৩১ বছর ও এর চেয়ে বেশি বয়সের। মোট আক্রান্তদের মধ্যে ৫৯ শতাংশই নারী। অপরাধের ধরনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং। এ হ্যাকিংয়ের শিকার হয়েছেন ২১ দশমিক ৬৫ শতাংশ। পর্নোগ্রাফি অপরাধপ্রবণতাও আশঙ্কাজনক। এ ধরনের অপরাধের হার ১১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। সাইবার অপরাধের শিকার হওয়া ভুক্তভোগীদের প্রায় অর্ধেকই সামাজিক মর্যাদাহানির কথা বলেছেন। ৪৭ দশমিক ৭২ শতাংশ ভুক্তভোগী বলেছেন, তারা সাইবার ক্রাইমের শিকার হয়ে সামাজিক যে মর্যাদা ছিল সেটি হারিয়েছেন। এ ছাড়া ৪০ দশমিক ১৫ শতাংশ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এ অপরাধের শিকার সবাই মানসিকভাবে কাতর ও চরম অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এসব বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্তরা অনেক ক্ষেত্রে নিজেরাই লাঞ্ছনার শিকার হয়ে থাকেন। এসব কারণে অপরাধের শিকার হলেও তারা অনেক সময় চেপে যান। অন্যদিকে সাইবার অপরাধে আক্রান্তদের অধিকাংশই শিক্ষিত হলেও আইনের আশ্রয় নেওয়ার হার খুবই কম। মাত্র ১২ শতাংশ ভুক্তভোগী আইনগত পদক্ষেপ নিয়েছেন। তাদের মধ্যে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন ৮১ দশমিক ২৫ শতাংশ, আর লিখিত অভিযোগ করেছেন ১৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এর চেয়েও আশঙ্কাজনক ব্যাপার হচ্ছে এসব ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদাসীনতা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেও কোনো ধরনের সুফল পাননি ৮৭ দশমিক ৫০ শতাংশ ভুক্তভোগী। বাকি ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ ভুক্তভোগী বিচার বা সুফল পাওয়া নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাদের মধ্যে অনেকের বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান।

দিনকে দিন ইন্টারনেটের প্রতি আমাদের নির্ভরশীলতা বেড়েই চলছে। নীতিনির্ধারক পর্যায়েও ক্যাশলেস অর্থনীতির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পড়াশোনা, ব্যবসা-বাণিজ্য এসবও ডিজিটাল হয়ে উঠছে বাকি দুনিয়ার সঙ্গে সঙ্গে। ফলে, সাইবার অপরাধ আমাদের দৈনন্দিন ও জাতীয় জীবনের ভিত্তিমূলে আঘাত করছে। স্মরণ করা যেতে পারে, বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েক বছর আগে এক সাইবার হ্যাকিংয়ের শিকার হয়ে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার খুইয়েছে, হ্যাকারদের সামান্য ভুল না হলে এর পরিমাণ এক বিলিয়ন ডলার হতে পারত। সাইবার অপরাধ বিষয়ে সমাজে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যেও অস্পষ্টতা এবং অজ্ঞানতা কাজ করে বলেই প্রতীয়মান। কিন্তু এসব অপরাধ বড় বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। ফলে সাইবার অপরাধ ঠেকাতে জিরো টলারেন্স এবং সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়াটা বাঞ্ছনীয়। এ লক্ষ্যে প্রযুক্তির উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে, সরকারি পর্যায়ে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা দেওয়া দরকার। উৎকর্ষ অর্জনে পারস্পরিক সহযোগিতা করতে হবে। আমদানিনির্ভর হওয়ার পরিবর্তে সাইবার সুরক্ষায় ব্যবহৃত সফটওয়্যার ও অ্যাপ্লিকেশন তৈরিতে মনোযোগী হতে হবে।