আলোচিত ‘হলি আর্টিসান ট্র্যাজেডি’ মামলার বিচারের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে। আট মাস আগে হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ এ মামলায় নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সাতজনের মৃত্যুদন্ডের সাজা রহিত করে আমৃত্যু কারাদন্ডাদেশ দেয়।
সাজাপ্রাপ্তরা হলেন মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, মো. আসলাম হোসেন সরদার ওরফে মোহন, মো. আব্দুস সবুর খান হাসান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, রাফিউল ইসলাম, মো. হাদিসুর রহমান, মো. শফিকুল ইসলাম খালেদ এবং মামুনুর রশীদ রিপন। আমৃত্যু কারাবাসের রায়ের ব্যাখ্যায় হাইকোর্ট বলে, ‘আলোচ্য মামলায় দেশি-বিদেশি ২০ নাগরিকসহ দুজন পুলিশ কর্মকর্তাকে যে নিষ্ঠুর ও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, তাতে বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তা ছাড়া বর্ণিত নিষ্ঠুরতম হত্যাকান্ডটি জনসাধারণের মনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টিসহ জননিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করেছে। আপিলকারীদের আমৃত্যু কারাদন্ডে দন্ডিত করা হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।’ ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির একটি অংশ আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে হলি আর্টিসান বেকারিতে হামলা চালায়। এ সময় দেশি-বিদেশি ২০ নাগরিককে হত্যা করে সশস্ত্র জঙ্গিরা। এ ছাড়া জঙ্গিদের ছোড়া গ্রেনেডে দুই ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা মারা যান। একপর্যায়ে যৌথবাহিনীর ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ নামে কমান্ডো অভিযানে পাঁচ জঙ্গি নিহত হন। এ ছাড়া ওই ঘটনার সময় রেস্তোরাঁর একজন শেফ মারা যান।
ঘটনার তিন বছর চার মাস পর অভিযোগপত্র এবং বিচার শুরুর আদেশের এক বছর পর বিচারিক আদালতে এ মামলার রায় আসে। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর বিচারিক আদালতে আলোচিত এ মামলাটির রায় হয়। রায়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইন-২০০৯-এর ধারায় এই সাত আসামিকে মৃত্যুদন্ড দেয় আদালত। পাশাপাশি একই আইনের ৭ ধারায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ছয়জনকে (মামুনুর রশিদ রিপন ছাড়া) ১০ বছর সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়। ঘটনার নির্মমতা ও মর্মস্পর্শীর বিষয়টি বিচারিক আদালতের রায়ের পর্যবেক্ষণেও উঠে আসে। আদালত বলে, ‘বাংলাদেশে তথাকথিত জিহাদ কায়েমের উদ্দেশ্যে, আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চরিত্র হননের চেষ্টা হিসেবে এই নারকীয় হত্যাকান্ড ঘটানো হয়। সাজা প্রদানের ক্ষেত্রে আসামিরা কোনো ধরনের অনুকম্পা বা সহানুভূতি পেতে পারেন না।’
রায়ের এক সপ্তাহ পর সর্বোচ্চ সাজাপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদন্ড অনুমোদনের নথি) হাইকোর্টে আসে। ২০২০ সালের ১৭ আগস্ট এ মামলায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পেপারবুক (মামলার রায়সহ যাবতীয় নথি) প্রস্তুতের কথা জানান সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের কর্মকর্তারা। এরপর বিচারিক আদালতের রায়ের পর আসামি আসলাম সরদার, হাদিসুর, শফিকুল ইসলাম খালেদ ও মামুনুর রশীদ রিপন সাজা থেকে খালাস চেয়ে হাইকোর্টে নিয়মিত আপিল করেন। অন্য তিন আসামি জাহাঙ্গীর, রিগ্যান ও আব্দুস সবুরের পক্ষে জেল আপিল হয়। ডেথ রেফারেন্স, সাজার বিরুদ্ধে আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি নিয়ে গত বছরের ৩০ অক্টোবর হাইকোর্ট তার রায় দেয়।
আইনি বিধান মতে, হাইকোর্টের সাজার বিরুদ্ধে আসামিপক্ষের আপিলের সুযোগ রয়েছে। তেমনি আসামিদের সর্বোচ্চ সাজার আরজি জানিয়ে আপিল করতে পারবে রাষ্ট্রপক্ষ। এজন্য হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। গতকাল রবিবার অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন সুপ্রিম কোর্টে তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, হাইকোর্টের রায়ের অনুলিপি পেলে তারা পর্যালোচনা করে আপিল করা হবে কি না সেই প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেবেন।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী মো. আরিফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা এ মামলায় ন্যায়বিচার পাইনি। এই আসামিদের কেউ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। এখন হাইকোর্টের রায়ের অনুলিপি পেলে এবং আসামিরা চাইলে খালাস চেয়ে আপিল করা হবে।’