গরিবদের জন্য উন্নয়ন ধনীদের জন্য প্রাইভেসি

সম্প্রতি এক ছাগলকান্ডে দেশ জুড়ে হইচই। পনের লাখ টাকার ছাগলের সঙ্গে ছবি দিয়ে আলোচিত হন এক তরুণ, পরে জানা যায় তিনি এক কর কর্মকর্তার সন্তান, যার সামাজিক স্বীকৃতি নেই। সামাজিক মাধ্যম এবং সাংবাদিকদের তদন্তে বের হয়ে আসে, ঐ কর কর্মকর্তার দুই সংসারে বিত্তের ছড়াছড়ি। প্রথম স্ত্রীর সন্তানরা বিদেশে বিলাসব্যসনের জীবন কাটান আর দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান অগণিত টাকা খরচ করেন পশুপাখি কেনা-সহ নানা রকম শখে।

এরপরে, বাংলাদেশে যা হয় আরকি। প্রথমেই ওই কর্মকর্তা জানান, ছাগলের সঙ্গে ছবি তোলা তরুণ তার কেউ নন, উনি খুবই সৎ একজন অফিসার এবং যারা উনার ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করছেন তাদের দেখে নেবেন, আইনি উপায়ে যাবেন, ইত্যাদি। তাতে অবশ্য অনেককে দমানো যায়নি, সামাজিক মাধ্যমে নানা প্রমাণ নিয়ে হাজির হন নেটিজেনরা। শেষতক, সংবাদমাধ্যমও চেপে বসে। কর্র্তৃপক্ষও এমন ভান করে যেন তারা জানতেনই না ঐ কর্মকর্তা বছরের পর বছর দুর্নীতিতে লিপ্ত ছিলেন। নিন্দা জানান উনার সহকর্মীরা। এতে অবশ্য অভিযুক্ত ঐ কর্মকর্তা বেশ অবাক হন, কারণ যাদের সঙ্গে মিলেমিশে দেশের ও জনগণের সম্পদ লুটেপুটে নিলেন তারাই বিপদের দিনে পিঠটান দিলেন। অথচ কিছুদিন আগে এক পুলিশের বড়কর্তার সম্পদের বিবরণ সংবাদপত্রে আসতে থাকা মাত্রই পুলিশের পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমকে বেশ সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল।

তবে, সেই কর্মকর্তা সমর্থন যে একেবারে পাননি তা কিন্তু নয়। সামাজিক মাধ্যমে কিছু মানুষ তীব্রভাবে প্রতিবাদ করলেন উনার এবং বিশেষত উনার পরিবারের হেনস্তায়। সামাজিক মাধ্যমে উনার সন্তানদের দামি গাড়ি, আলিশান বাড়ি ও সম্পদের ছবি ও বিবরণ ফাঁস হওয়ায় এসব সচেতন মানুষ ‘প্রাইভেসি’ লঙ্ঘনের বিষয়ে খুব খেপে গেলেন। সিটিজেন জার্নালিজমের নামে ব্যক্তির গোপনীয়তা এভাবে ফাঁস হওয়াটা খুবই নিন্দনীয় বলে মতামত দিলেন।

গোটা ছবিটা না দেখে, কেবল প্রাইভেসি লঙ্ঘনের এই খ-চিত্র দেখলে, এই আচরণ খুবই নিন্দনীয়। বিশেষত ইউরোপীয় দর্শন এবং নবউদারতাবাদের দৃষ্টিতে তো বটেই। এমনকি এই প্রশ্ন ওঠাটাও স্বাভাবিক যে, পিতার অপরাধের দায় কেন সন্তানরা নেবে? কেন তাদের সামাজিকভাবে হেয় করা হবে? অ্যাকাডেমিয়ার ভাষায় কেউ কেউ প্রশ্ন তুললেন, আমাদের কাজ কাঠামোকে প্রশ্ন করা, সংস্কার করা, কোনোভাবেই ব্যক্তি আক্রমণ কাক্সিক্ষত নয়।

সমস্যা হচ্ছে তাত্ত্বিকভাবে আলাপগুলো চমৎকার হলেও, বাস্তবতা ভিন্ন। একটা সময় ব্যক্তির জবাবদিহির জায়গা সমাজ হলেও সেই জায়গাটা নিয়ে নিয়েছে রাষ্ট্র। সমাজের নিরাপত্তার চাদরকে বাতিল করে রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের অলিখিত চুক্তি হয়েছে নিরাপত্তা ও অধিকার প্রদানের। বিনিময়ে রাষ্ট্র পেয়েছে অসীম ক্ষমতা। অন্যদিকে, সমাজ ব্যক্তিকে তার সমস্ত রকম চাহিদা পূরণ করার যে ভূমিকা পালন করত তা চলে গেল বাজারের কাছে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাজারই সমস্ত চাহিদার একমাত্র জোগানদাতা। আর সমাজের মতো বাজার টাকার উৎস, নৈতিকতা এসবের যাচাই-বাছাই করে না। সামাজিক ন্যায়বিচার বা সামাজিক কাঠামো রক্ষার দায় তার নেই একেবারেই।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, যেই রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নেই, সেই রাষ্ট্রও একই রকম ভাবে অন্ধ হয়ে ওঠে। ক্ষেত্রবিশেষে শোষকের পক্ষে শোষিতের ওপর নিপীড়ন চালায়। কর কর্মকর্তার দুর্নীতিবাজ হয়ে ওঠা একটা বিশেষ উদাহরণ। রাষ্ট্রের অর্থের অন্যতম উৎস কর। ফলত দেখা যায়, অন্য অনেক অন্যায়কে সহ্য করলেও রাষ্ট্র করের ব্যাপারে কোনো রকম ছাড় দেয় না। পৃথিবীর বড় বড় মাফিয়া গোষ্ঠীরা পর্যন্ত এই করের ব্যাপারে সচেতন থাকেন। পশ্চিমা দেশে বড় বড় অপরাধীরা প্রায় সময়েই ধরা পড়েন কর ফাঁকি সংশ্লিষ্ট মামলায়। কর রাষ্ট্রের আর্থিক মেরুদ-। সেই কর থেকে যদি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কারণে রাষ্ট্র বঞ্চিত হয় তবে রাষ্ট্রের ভিত্তি ভেঙে পড়ে। অথচ, দিনের পর দিন তাই হচ্ছে। এ থেকে বোঝা যায় রাষ্ট্রের অবস্থা কতটা ভঙ্গুর। রাষ্ট্রের আরেক ভিত্তি আইনকেও দিনের পর দিন বুড়ো আঙুল দেখান ক্ষমতাসীন কর্মকর্তারা। আইন ভেঙে পড়ায় ক্ষতিগ্রস্তদের আর কোনো আশ্রয় থাকে না, রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের মূল চুক্তিই অকার্যকর হয়ে যায়।

এই অবস্থায়, শোষিত নাগরিক কী করবে? এথিকস আর এটিকেট মেনে দুর্নীতিবাজদের রাষ্ট্রীয় বিচারের অপেক্ষায় থাকবে? যেখানে রাষ্ট্রের মেরুদ- এই দুর্নীতিবাজরা নিয়ন্ত্রণ করে। এটিকেটের বেড়া ভেঙে, তাদের হাতেনাতে ধরিয়ে না দিলে যেখানে কর্র্তৃপক্ষের ঘুম ভাঙে না বা বলা ভালো ঘুম ভাঙতে বাধ্য হয় না, সেখানে নাগরিকের কাঠামো সংস্কারের অপেক্ষায় থাকার কি খুব সুযোগ আছে?

প্রাইভেসি সুরক্ষার এত আলাপ অথচ দেখা যায় এসব গবেষক দরিদ্রদের বেলায় তার থোরাই কেয়ার করেন। তারা দরিদ্রদের হাঁড়ির খবর বের করে আনেন। গরিব মানুষ কীভাবে ভাত খায়, কয়বেলা খায়, তাদের আয় উপার্জন কত, তারা একঘরে কয়জন থাকেন এসব থেকে শুরু করে তারা বাতকর্ম কিংবা যৌনক্রিয়া কীভাবে করেন তা পর্যন্ত বাদ যায় না। অথচ, দারিদ্র্য বিমোচনই যদি শেষ কথা হতো তবে কেবল দারিদ্র্য নয়, উল্টোপিঠ তথা ধনীদের নিয়েও একই রকম গবেষণা হতো। কারণ, যত যুক্তিই দেওয়া হোক, সমাজে একজন অতিধনীর সম্পদই কয়েক সহস্র মানুষকে গরিব বানায়।

দারিদ্র্য বিমোচন গবেষক বা এনজিওদের ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সত্যসত্যই দেশে দরিদ্র না থাকলে উনাদের নিজেদেরই না খেয়ে থাকতে হবে। একই রকম ব্যাপার দেখা যায় দেশের বামপন্থি কিছু নেতার বেলাতেও। বেচারা কার্ল মার্ক্স যেখানে দারিদ্র্যকে ঘৃণা করতেন, চাইতেন ধনের পুনর্বণ্টন, সেখানে উনারা দারিদ্র্যকে মহান বানিয়ে দারিদ্র্যের বণ্টনের ভয় দেখান।

এতে সন্দেহ নেই যে, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া, রাষ্ট্রকে জবাবদিহিমূলক করা ছাড়া সমস্যার সমাধান হবে না। কিন্তু, ডুবন্ত মানুষের সামনে সাঁতার শেখার নিয়মাবলির বই ছুড়ে দেওয়া কোনো কাজের কথা না। গরিবের জন্য উন্নয়নের বটিকা আর ধনীর জন্য প্রাইভেসির সুরক্ষা নৈতিকভাবেই অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ এবং রীতিমতো বাস্তবতা বিবর্জিত। 

লেখক : সাংবাদিক ও অনুবাদক

faizbsu002@gmail.com