কয়েক দিন আগে স্ত্রীর অনুরোধে তার সঙ্গে একটি নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (এনবিএফআই) যেতে হয়েছিল। উদ্দেশ্য প্রায় বছর সাতেক আগে শ্রীমতী সেখানে যে একটা ডাবল বেনিফিট স্কিমে এফডিআর করেছিলেন, সেটা অবমুক্ত করা। ইতিমধ্যে হিসাবটির পূর্ণতাপ্রাপ্তি ঘটেছে, আবার প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানাও পরিবর্তিত হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে এই জাতীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে এর মধ্যে অনেক নেতিবাচক সংবাদ গণমাধ্যমে চলে এসেছে। এখন হিসাবটি ম্যাচিউর হওয়ার পর তার সেলফোনে নিয়মমাফিক কোনো বার্তার আগমন না ঘটায় আমার জরুর মনে কিছুটা অভিশঙ্কা জেঁকে বসেছিল। সেই কারণে আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া। এ বয়সে ভার্যার আদেশ ভঙ্গ করার বিপদ অনেক। ফ্রান্সিস বেকন বলেছেন Wives are young men’s mistresses; companions for middle age; and old men’s nurses Wives are young men’s mistresses; companions for middle age; and old men’s nurses. বেকন প্রথমোক্ত দুটি কাজের পরিসমাপ্তি যেভাবেই ঘটুক, শেষোক্ত দায়িত্বটা তো আদায়ের চেষ্টা করতেই হবে। কাজেই জায়ার অনুগামী হয়ে গেলাম সেখানে।
ডকুমেন্টটা সেখানে উপস্থাপনের পর তারা বেশ সম্মানের সঙ্গে বসতে বললেন, সবুজ চা খাওয়ালেন। বেসরকারি পর্যায়ের প্রীতিপূর্ণ মক্কেল সেবায় মনটাও ভরে গেল। কিন্তু মেজাজ বিষিয়ে উঠতে বেশি সময় লাগল না; ডেস্কের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বললেন, টাকা উত্তোলনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র ও কর পরিশোধ সনদ লাগবে। ওইগুলো তো হিসাব খোলার সময় জমা দেওয়া আছে; কাজেই আমার জানানা তো আর সেগুলো নিয়ে আসেননি। তারা আরও জানালেন যে, শুধু সর্বশেষ কর পরিশোধ সনদ নিয়ে আসলে হবে না; আনতে হবে পুরো সাত বছরের কর পরিশোধ সনদ।
এই সাত বছরের কথা শুনে আমার প্রচণ্ড সহ্য শক্তিসম্পন্না পত্নীদেবীও কিছুটা বিরক্ত হলেন। আমি তো রীতিমতো অগ্নিশর্মা। চাকরিতে ঢুকেই পেনশনের টাকা তোলা নিয়ে মানুষের বেশুমার ভোগান্তির কেচ্ছা-কাহিনি শুনেছি। তখন পেনশনারকে প্রতি মাসে ডাক্তারের কাছ থেকে সারভাইভাল রিপোর্ট নিয়ে এজি অফিসে হাজিরা দিতে হতো। একবার এক পেনশনার নাকি তিন মাস রোগ ভোগার পর চতুর্থ মাসে সারভাইভাল রিপোর্ট নিয়ে এজি অফিসে হাজির হয়েছিলেন। তখন সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষকের বক্তব্য, ‘মহাশয়, আপনি শেষ মাসের রিপোর্ট এনেছেন, কাজেই ওই এক মাসের পেনশনই পারেন। বাকি দুমাসের পেনশন পেতে ওই দুমাসও যে আপনি বেঁচেছিলেন, সে সনদ দাখিল করতে হবে।’ মুসলিম চৌধুরীর কল্যাণে এজি অফিস এখন অনেক স্মার্ট হয়ে গেছে; মাসের প্রথম দিবসেই ব্যাংক হিসাবে পেনশনের টাকা জমা হয়, আবার লাইভ ভেরিফিকেশনও নিজে নিজে করা যায়; এর জন্য কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। অথচ স্মার্ট বাংলাদেশে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বকেয়া সারভাইভাল রিপোর্ট দরকার হচ্ছে!
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নাকি নির্দেশ জারি করা হয়েছে যে, বকেয়াসহ হালনাগাদ কর সনদ দাখিল না করা হলে যে কোনো মেয়াদি আমানতের সুদ থেকে ১০ শতাংশের স্থলে ১৫ শতাংশ কর কর্তন বাধ্যতামূলক। মনে পড়ে বিগত বছর বাড়িতে কোরবানির পশু কেনা বাবদ এক লাখ টাকা পাঠাতে অগ্রণী ব্যাংকের এক শাখায় যাই। ডিপোজিট স্লিপে সংশ্লিষ্ট কলামে জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর লিখলেও ব্যাংক ওই টাকা জমা নিতে অস্বীকার করে; তাদের কথা শুধু নম্বর থাকলে চলবে না, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপিও দাখিল করতে হবে। অগত্যা বাসা থেকে সেই কার্ড নিয়ে গিয়ে ফটোকপি করে টাকা জমাদান সম্পন্ন করি। এটাও নাকি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা।
শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংককে দোষ দিয়ে লাভ নেই; ব্যাংক বরং সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান থেকে ডিজিটালাইজেশনে এগিয়ে আছে; এটা হলো দেশের সামগ্রিক কর্মপরিবেশ ও দক্ষতার প্রতিফলন। নমুনা হিসেবে আমার মতো এক চুনোপুঁটির কর পরিশোধের ঝামেলাটাকে এখানে তুলে ধরছি। আমার আয়ের হিসাব খুবই সহজ; পেনশন, ক্রয়কৃত কিছু সঞ্চয়পত্র ও এফডিআরের সুদ এবং পুঁজিবাজার থেকে কেনা কিছু শেয়ার থেকে প্রাপ্ত ডিভিডেন্ড। এই উৎসগুলো থেকে উৎসারিত সব আয় ব্যাংক হিসাবে জমা হয়। কাজেই নির্দিষ্ট কর বছরের ব্যাংক বিবরণী কর অফিসে জমা দিলেই আয়ের উৎস ও প্রমাণক নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকার কথা নয়। শুধু ক্যাপিটাল গেইনের (যদি থাকে) একটা আলাদা সনদ দরকার হতে পারে। কর অফিসের হিসাবের সুবিধার জন্য আমি ব্যাংক বিবরণী যাচাই করে উৎসভিত্তিক একটা হিসাব প্রস্তুত করি। এই উৎসভিত্তিক আয়ের হিসাব ও সংযোজনী হিসেবে শুধু ব্যাংক বিবরণী কর মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু কর অফিসের কর্মকর্তারা তা মানেন কেন; তারা চান পেনশনার স্কিমের সুদের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সনদ, সঞ্চয়পত্রের সুদের বিপরীতে জাতীয় সঞ্চয় ব্যুরোর সনদ, এফডিআরের সুদের জন্য ব্যাংকের সনদ, ডিভিডেন্ডের জন্য ডিভিডেন্ড ওয়ারেন্ট প্রভৃতি কাগুজে দলিল। আসলে এর সবকিছু ব্যাংক বিবরণীতে লিপিবদ্ধ থাকায় আলাদা রেকর্ড পত্র দাখিল করা বাহুল্য মাত্র। অথচ এর জন্য আমাকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে শুরু করে অনেক অফিসে বছর শেষে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। আমি অবসরপ্রাপ্ত নিষ্কর্মা মানুষ, আমার পণ্ডশ্রম ও সময়ক্ষেপণ গুরুত্বহীন। কিন্তু একজন বিনিয়োগকারীর কী রকম ভোগান্তি হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
দেশ বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক পরিমণ্ডল থেকে বহু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী মুদ্রাস্ফীতি, বেকার সমস্যা, বৈদেশিক বাণিজ্য ও লেনদেনে ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রার ক্ষয়িষ্ণু স্থিতি, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে স্থবিরতা, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগে কমতি, সম্পদ সংগ্রহে অক্ষমতা, মন্দ ঋণের উল্লম্ফন, ঋণের স্থিতি ও ঋণ পরিষেবার ক্রমবৃদ্ধি, অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশের ঘাটতি, পরিচালন ব্যয় ও ভর্তুকি বৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্য প্রভৃতি অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবও দেশের জন্য কম হুমকি নয়। এর ওপর ২০২৬ সালের পর দেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে বেরিয়ে আসবে, তখন রপ্তানির ক্ষেত্রে উন্নত ও উন্নয়নশীল সব দেশের সঙ্গে কঠিন প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে তাকে স্থান করে নিতে হবে। তখন রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এদিকে আরেক উদ্বেগজনক পরিস্থিতি হলো সামগ্রিকভাবে দেশের ৪০.৬৭ শতাংশ মানুষ নিট ক্যাটাগরিতে (NEET) অবস্থান করছে, যার মধ্যে মহিলাদের অংশ ৬১.৭১ শতাংশ। নিট (NEET, Not in Education, Employment, or Training) হলো ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী একটা জনগোষ্ঠী, যাদের কোনো শিক্ষা, কর্ম বা প্রশিক্ষণে নেই (The Daily Star, February 22, 2024)। ফলে আমাদের জনমিতিক লভ্যাংশ কর্পূরের মতো উবে যাচ্ছে।
এ রকম একটা কঠিন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। তবে জরুরি ভিত্তিতে যেটা আগে করা দরকার, সেটা হলো সরকারি ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির সঙ্গে সরকারের রাজস্ব নীতিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। আর সহজে ব্যবসা করার পরিবেশ সৃজন করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ, বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা। এতে একাধারে মুদ্রাস্ফীতি কমবে, কর্মসংস্থান বাড়বে ও বৃদ্ধি পাবে বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতি। বেসরকারি খাত অনুকূল পরিবেশ পেলে প্রতিযোগিতার জন্য দক্ষ হয়ে উঠতে পারবে এবং প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন হিসেবে অগ্রসর ভূমিকা পালন করতে পারবে।
জর্জ ম্যাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যে দেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ এবং নিয়মকানুন যত সহজ, সে দেশে আয় সমতার মাত্রা তত বেশি। এই গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে বিশ্বব্যাংক ২০০৩ সাল থেকে সহজে ব্যবসা করার সূচক প্রবর্তন করে। এটা মূলত একটা দেশে ব্যবসা করার খরচের পরিমাপ নির্দেশ করত। এই সূচকে ২০২০ সালে বিশে^র ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৬৮। তার আগের বছর এটা ছিল ১৭৬। প্রতি বছর এই সূচক প্রকাশের সময় দেশের বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে বেশ কথাবার্তা হতো এবং তার মানোন্নয়নের তাগিদ লক্ষ করা যেত। কিন্তু কিছু অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ২০২১ সাল থেকে বিশ্বব্যাংক এই সূচক প্রকাশ বন্ধ করে দেয়। তারপর থেকে মনে হচ্ছে যে, এ দেশেও এই সূচকের মানোন্নয়ন প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলেছে। বিশ্বব্যাংক যাই করুক না কেন, আমাদের বাঁচার ও উন্নয়নের জন্যই এই সূচকের মানোন্নয়ন অপরিহার্য। এ জন্য দেশের বেসরকারি পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের নিয়োজিত করে এই কাজটা চালু রাখা প্রয়োজন ছিল, প্রয়োজন ছিল উত্তরোত্তর পরিবেশের মানোন্নয়ন ও জনশক্তি উন্নয়নের। এখন তো বোঝাও যাচ্ছে না যে, আমরা কোথায় আছি! তবে পরিস্থিতির যে উন্নতি হচ্ছে না, আঙ্কেল শ্যাম প্রকাশিত ‘2024 National Trade Estimate Report’ থেকে তার কিছুটা আভাস পাওয়া যায় (The Financial Express, March 31, 2024)। এতে ঘুষ-দুর্নীতি, লাল-ফিতার দৌরাত্ম্য, দরপত্র জালিয়াতি, বিনির্দেশ কারসাজি, স্থানীয় অংশীদারদের প্রভাব, সেকেলে সংগ্রহ পোর্টাল প্রভৃতি নিয়ে অভিযোগ তোলা হয়।
আশার কথা এই যে, ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাংক এর পরিবর্তে অধিকতর স্বচ্ছ ও ভারসাম্যপূর্ণ একটা নতুন সূচক প্রবর্তনের লক্ষ্যে ‘বিজনেস রেডি প্রজেক্ট’ চালু করেছে। লক্ষ্য বিশ্বের ১৮০টি দেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ পর্যালোচনা করে ২০২৪ সালের মধ্যে ৫৪টি, ২০২৫ সালের মধ্যে ১২০টি ও ২০২৬ সালের মধ্যে ১৮০টি দেশের সূচক প্রকাশ করা। বাংলাদেশের উচিত উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে প্রথম সুযোগেই যাতে এই প্রকল্পে তার অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হয়, তার জন্য কাজ করা। তবে এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্তিই মূল কথা নয়, আসল কথা হলো আমরা নানা সংকটের মধ্যে আছি, সেখান থেকে বের হয়ে আসতে হবে; আমাদের যে উন্নয়ন আকাক্সক্ষা রয়েছে, সেটা অর্জন করতে হবে। এ কাজ ফলপ্রসূ করতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় আনতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এই আস্থা সঞ্চার করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী লী কুয়ান ইউর উপদেষ্টা ডাচ অর্থনীতিবিদ আলবার্ট উইন্সেমিয়াসের প্রথম উপদেশ ছিল যে, সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা Sir Stamford Raffles-এর ভাস্কর্য সমাজতান্ত্রিক বাতাবরণের মধ্যেও সেখানে অক্ষুন্ন রাখতে হবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য এর প্রতীকী বার্তা ছিল এই যে, সিঙ্গাপুর সমাজতন্ত্রী চীন ও ইন্দোনেশিয়ার কোলের মধ্যে থাকলেও উদার নৈতিক অর্থনীতির (Laissez Faire) ধারক-বাহক; পুঁজির হন্তারক নয়। সিঙ্গাপুরের উত্থান এই পটভূমিতেই।
আমাদেরও আছে সিঙ্গাপুরের চেয়েও বেশি জনমানুষ, সেই সঙ্গে আছে আরও কিছু বেশি সম্পদ। এই জনসমষ্টিকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে পারলে আর নীতি-কৌশল, অবকাঠামো, আস্থা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা গেলে আমাদেরও পেছনে তাকানোর প্রয়োজন হবে না। আবারও ফ্রাসিস বেকনের আর একটি কথা দিয়ে শেষ করছি, ‘Prosperity doth best discover vice; but adversity doth best discover virtue.’ আমাদের বিগত কিছু দিনের স্বল্পকালীন সমৃদ্ধির কিছু কলঙ্ক তো এখন আমরা আবিষ্কার করতে শুরু করেছি; এখন দুরবস্থার মধ্যে হয়তো সুকৃতির দর্শন মিলবে সে প্রত্যাশায় রইলাম।
লেখক: খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও কলামিস্ট
rulhanpasha@gmail.com