গুরুপাপে লঘুদন্ড

বাংলাদেশে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দুর্নীতি সর্বজনবিদিত। রাষ্ট্রের গুরুদায়িত্বে নিয়োজিত এবং জনগণের কল্যাণ ও সেবায় শপথ করা কর্মচারীদের দুর্নীতি কেবল রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকারক না, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গেরও শামিল। ফলে, সাধারণ ধারণাতেই এই কথা ভাবা সংগত যে, অন্য দুর্নীতিবাজদের চেয়ে সরকারি চাকুরেদের দুর্নীতির সাজার মাত্রা বেশি হওয়া দরকার। অথচ, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায় যে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেশিরভাগ সময়েই লঘু সাজায় পার পেয়ে যান। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় এসব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে নানা মহলে। দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, দুর্নীতির অভিযোগে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বদলি, বরখাস্ত, বাধ্যতামূলক অবসরসহ কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থাই যথেষ্ট নয়, ক্ষেত্রবিশেষে তা দুর্নীতিকে উৎসাহ দেয় বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। অন্য সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইনি প্রক্রিয়ায় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদেরও বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

গণমাধ্যমের বিভিন্ন সময়ের নানা তথ্যে দেখা যায়, দুর্নীতির অভিযোগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও পুলিশের কোনো কোনো কর্মকর্তাকে বদলি বা বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। প্রাথমিক বিভাগীয় পদক্ষেপ হিসেবে এই ধরনের পদক্ষেপ আশাব্যঞ্জক হলেও, দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হচ্ছে, এর পরে আর তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। এর ফলে, প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেই তাকে বদলি করা, বরখাস্ত বা বাধ্যতামূলক অবসর প্রদানের মতো বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখাকেই স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। দুর্নীতির জন্য কার্যকর জবাবদিহি ও প্রতিরোধের সম্ভাবনার মানদণ্ডে, যা একেবারেই যথেষ্ট নয়। দুর্নীতির মতো অপরাধ বদলির মাধ্যমে বড়জোর স্থানান্তরিত ও আরও বেশি প্রসারিত এবং অন্যান্য কর্মচারীর মধ্যে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনাও সৃষ্টি করে। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী দুর্নীতি করলে দেশের প্রচলিত আইনে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় না এমন ধারণা প্রসারের মাধ্যমে তা দুর্নীতিকে অধিকতর উৎসাহ দেয়।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই রক্ষাকবচ সংবিধানেরও পরিপন্থী। ভিন্ন সময়ে সংশোধনের মাধ্যমে বিদ্যমান সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা শিথিল করে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের প্রকারান্তরে এক ধরনের সুরক্ষা কবচ দেওয়া হয় বলে মনে করেন টিআইবির পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭ অনুযায়ী, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের শাস্তি শুধু বদলি, বরখাস্ত ও অবসর প্রদানে সীমাবদ্ধ রাখার মাধ্যমে অন্য সব শ্রেণি-পেশার জনগণের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের পরিচায়ক ও সরকারি খাতের পাশাপাশি অন্যান্য খাতেও যোগসাজশের মাধ্যমে দুর্নীতির বিকাশের অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে। দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেলায়ও অন্য সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য দেশের প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় তদন্ত ও বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

এইসব দুর্নীতির সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কও বেশ গভীর। রাজনৈতিক নেতারা, বিশেষত ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের যোগসাজশেই বেশিরভাগ দুর্নীতি সংঘটিত হয়। উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও যোগসাজশ ছাড়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ঘাটতির অন্যতম কারণ যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব, তার দায়ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। দুর্নীতির ব্যাপারগুলো এভাবে প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে এবং দুর্নীতিবাজরা জানেন, তারা মোটামুটি সুরক্ষিত। তবুও যখন এসব দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হয় তখন কর্র্তৃপক্ষ অবাক হওয়ার ভান করে এবং রাজনীতিবিদরা এসবের সঙ্গে তাদের যেকোনো সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেন। তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিজেদের কঠোর অবস্থান এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আলাপ দেন, কিন্তু জনমানসে তাদের এসব কথা ফাঁকা বুলি হিসেবেই প্রতীয়মান হয়। শপথ নিয়ে যারা রাষ্ট্রের রক্ষকের দায়িত্ব নেন, তাদেরই ভক্ষক হয়ে ওঠা চরম দুর্ভাগ্য। আর তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়াটা এই চর্চা চালিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করে।