দাপুটে স্পেন না স্বাগতিক জার্মানি- ফয়সালা আজ রাতেই

২৮ বছর হয়ে গেছে জার্মানি ইউরোপ সেরার মুকুট পরেনি। শেষটা সেই ১৯৯৬ সালে। স্পেনের ক্ষেত্রে এই আক্ষেপ অবশ্য এক যুগের। ২০১২-এর পর হওয়া ইউরোর দুই আসরে তারা ফাইনালের দর্শক। তারপরও চলতি আসরে দুদলকে রাখা হয়েছিল ফেভারিটের তালিকায়। অভিযান শুরুর আগেই জানা হয়ে গিয়েছিল ফাইনালের আগেই দেখা হয়ে যেতে পারে দুই ফেভারিটের। গ্রুপ পর্ব আর দ্বিতীয় পর্বের সমীকরণ মিলিয়ে হয়েছে সেটাই। শুক্রবার বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় দুই জায়ান্টের দেখা হয়ে যাচ্ছে কোয়ার্টার ফাইনালে। যার মানে শুক্রবার স্টুটগার্ট এরেনায় এক ফেভারিটকে বরণ করতে হবে বিদায়ের পরিণতি। সেই দলটা যদি হয় স্বাগতিক জার্মানি, তবে আসরের দ্যুতি কমে যাবে অনেকটাই। দলের পাশাপাশি যে জার্মানরা হারাবে তাদের সময়ের অন্যতম সেরা তারকা টনি ক্রুসকেও। এই প্লে-মেকার গত মে মাসেই দিয়ে রেখেছিলেন অবসরের ঘোষণা। 

রোমাঞ্চকর ৯০ মিনিট ছাপিয়ে আলোচনার টেবিলে উঠে এসেছে দুই ‘চৌত্রিশের’ কথার লড়াই। ৩৪ বছরের টনি ক্রুসকে শুক্রবার অবসরে পাঠানোর হুমকি দিয়েছেন সমবয়সী জোসেলু। স্প্যানিশ ফরোয়ার্ডের এই হুমকিতে অবশ্য টলছেন না জার্মান প্লে-মেকার। নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে রিয়াল মাদ্রিদ সতীর্থ জোসেলুর স্বপ্ন ভেস্তে দিতে চান ক্রুস।

জোসেলুর জন্য শুক্রবারের ম্যাচটা অনেক স্মৃতি নিয়ে ফিরেছে। এই স্টুটগার্টেই ১৯৯০ সালে স্প্যানিশ দম্পতির কোল আলো করে জন্মেছিলেন ২০২৩ সালে স্পেনের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে জাতীয় দলে অভিষিক্ত জোসেলু। এই শহরে কেটেছে শৈশবের বড় সময়। এখানেই তার শিক্ষা আর ফুটবল জীবনের হাতেখড়ি। পরে অবশ্য মায়ের সঙ্গী হয়ে ফিরে যান স্পেনে। ধীরে ধীরে ফুটবল প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটতে থাকে। একটা সময় সুযোগ হয় স্পেনের বয়সভিত্তিক দলগুলোতে। তবে ৩৩ বছর বয়সে এসে প্রথম ডাক পান সিনিয়র দলে। ইউরোপের নানা ক্লাব ঘুরে চলতি বছর জায়গা হয় রিয়াল মাদ্রিদে। সেখানেই টনি ক্রুসের সঙ্গে খেলার সুযোগ, হয়ে যায় বন্ধুত্বও। তবে শুক্রবার সেই বন্ধুতার লেশমাত্র থাকবে না।

ক্রুসকে বিদায় দেওয়ার সব প্রস্তুতি নিয়ে নামার কথা জানিয়ে দেন জোসেলু, ‘আমি টনিকে ভালোবাসি, তার প্রতি যথেষ্ট যতœশীলও। তবে আমার বিশ্বাস শুক্রবার হতে যাচ্ছে টনির শেষ ম্যাচ। এটা ঠিক জার্মানি এই আসরে অন্যতম ফেভারিট তবে আমরা টনিকে বিদায় জানাতে তৈরি। আমরা তার সামর্থ্য সম্পর্কে জানি, যখনই তার পায়ে বল যায়, জার্মানি খেলার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তাই তার দিকে আমাদের বাড়তি দৃষ্টি থাকবে, তাতে জার্মানি তাদের খেলাটা উপভোগ করতে পারবে না।’ জোসেলু এরপর প্রশংসায় ভাসালেন ক্রুসকে, ‘তার সঙ্গে খেলা খেলতে পারা গৌরবের। সে দারুণ একজন টিমমেট, একজন ভালো বন্ধু, যে কি না আমাকে অনেক পরামর্শ দেয়। আমাদের মধ্যে কথাও হয় অনেক। এটা কষ্টের যে তাকে আমরা বিদায় দিতে চাচ্ছি। চাচ্ছি তার শেষ ম্যাচে আমরা জিতে যাই। এই চাওয়াটা কেবলমাত্র আমার দলের জন্য।’

বুধবার বিকেলে জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ক্রুস এলেন একরাশ হাসি ছড়িয়ে। সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা ভালো করেই জানেন। আজ নয় তো কাল, আসছে এক-দেড় সপ্তাহের মধ্যেই তাকে আলিঙ্গন করতে হবে হৃদয়ক্ষয়ী মুহ‚র্তটাকে। তবে সেটা যেন এই শুক্রবার না হয়। জার্মান তারকা খুব করে চাচ্ছেন ১৫ জুলাই বার্লিনের অলিম্পিয়াস্টাদিওনের সবুজ গালিচা থেকে বিদায় নিতে এবং সেটা অবশ্যই মাথা উঁচু করে; মর্যাদার শিরোপাটা সঙ্গী করে। তাই তো গেল মৌসুমের ক্লাব সতীর্থ জোসেলুর হুমকি ফুৎকারে উড়িয়ে দিলেন ভীষণ আত্মবিশ্বাসী ক্রুস। পেশাদার ফুটবলার হিসেবে কি এটাই শেষবারের মতো সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হওয়া? এমন প্রশ্নে স্মিত হেসে ক্রুসের জবাব, ‘আমি মোটেই নস্টালজিক হয়ে পড়ছি না। আশা করব না এটাই শেষ ম্যাচ এবং বিশ্বাস করি আবারও আমরা মিলিত হব।’ প্রিয় খেলা ছাড়ার কঠিন সিদ্ধান্তটা দুমাস আগে নিয়ে ফেলার পর নিজেকে ভালোভাবেই সামলে নিয়েছেন দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ছয়টি চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ী তারকা, ‘বাস্তবতাটা আমি বেশ ভালোভাবেই জানি যে ফুটবল আর আমার সামনের জীবনে খুব বড় ভ‚মিকা রাখবে না। তবে এটা নিয়ে আমি মোটেই ভীত নই। কারণ সিদ্ধান্তটা আমিই নিয়েছি। আমার মনে হয়েছে এটাই গুডবাই বলার সঠিক সময়। তবে আমি ভীষণ মিস করব প্রতিটা মুহ‚র্ত। কারণ খেলাটাকে এখনো আমি ভীষণ ভালোবাসি এবং আমার মনে হয় না ফুটবল খেলার চেয়ে ভালো কোনো কাজ আমি ভবিষ্যতে করতে পারব। তবে আমি চেয়েছি নিজের বিদায়ের সময়টা নিজেই নির্ধারণ করতে যাতে অন্য কেউ সেটা নির্ধারণ না করতে পারে।’

এরপরই আসে জোসেলুর হুমকির প্রসঙ্গটা। রিয়াল সতীর্থ, তারচেয়েও ভালো বন্ধুর এই বক্তব্যকে ভুল প্রমাণ করার একটাই উপায় আছে ক্রুসের কাছে, ‘জয়। খুব ছোট্ট করেই বললাম।’ এরপর যোগ করেন, ‘(আমাকে অবসরে পাঠানোর) তার (জোসেলুর) ইচ্ছা যাতে পূরণ না হয়, তার জন্য আমি সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করব।’

দুই চৌত্রিশের তারকা কথার লড়াইয়ে মুখোমুখি অবস্থানে থাকলেও, প্রত্যাশা দুজনেরই অভিন্নÑ নিজ নিজ দলকে সেমিফাইনালে পৌঁছানো। এক্ষেত্রে তাদের যেমন রাখতে হবে বড় ভ‚মিকা, একই সঙ্গে জ্বলে উঠতে হবে দুদলের তরুণ তুর্কিদের। তাতেই বিশ্ব জুড়ে ফুটবলপ্রেমীরা সাক্ষী হবে অসাধারণ এক ম্যাচের। তবে দিন শেষ পরিণতি একটাই, এক ফেভারিট হাসতে হাসতে চলে যাবে সেমিফাইনালের মঞ্চে। আরেক ফেভারিটের বেজে উঠবে বিদায় রাগিনী।